বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৩

জেলা কমিউনিটি পুলিশিংয়ের নূতন নেতৃত্বকে অভিনন্দন

অনলাইন ডেস্ক
জেলা কমিউনিটি পুলিশিংয়ের নূতন নেতৃত্বকে অভিনন্দন

চাঁদপুরের সামাজিক ইতিহাসে কমিউনিটি পুলিশিং একটি অনন্য উদ্যোগের নাম। ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’-এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে ১৯৯৯ সালে যে কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিলো, তা কেবল একটি সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিলো না; বরং পুলিশ ও জনগণের পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধের ওপর দাঁড়ানো একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। চাঁদপুর শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ উদ্যোগ যে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলো, তা পরবর্তীতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং বিস্তারের পথ তৈরি করে। সেই গৌরবময় ঐতিহ্যকে ধারণ করে জেলা কমিউনিটি পুলিশিংয়ের নতুন কার্যকরী কমিটি গঠিত হওয়ায় আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানাই।

নবগঠিত কমিটির সভাপতি দেওয়ান মো. সফিকুজ্জামান এবং সাধারণ সম্পাদক সুফি খায়রুল আলম খোকনের নেতৃত্বে এবার কমিউনিটি পুলিশিং নতুন গতি পাবে-এটাই চাঁদপুরবাসীর প্রত্যাশা। সভাপতি দেওয়ান শফিকুজ্জামানের চাঁদপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে ও একজন রাজনীতিক হিসেবে জনসম্পৃক্ততার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সুফি খোকনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা এ কার্যক্রমকে সামগ্রিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের বিষয়টিও আশাব্যঞ্জক। কারণ কমিউনিটি পুলিশিং কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি নয়; এটি মূলত জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের একটি কাঠামো। তবে শুধু কমিটি গঠন করলেই প্রত্যাশিত ফল আসবে না। বাস্তবতা হলো, একসময় যে কমিউনিটি পুলিশিং চাঁদপুরের গর্বের বিষয় ছিলো, সময়ের ব্যবধানে তার কার্যক্রম অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাংগঠনিক কাঠামোকে সক্রিয় করা এবং কমিউনিটি পুলিশিংকে আবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তোলা। সভা-সেমিনার কিংবা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে পাড়া-মহল্লা, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে।

অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর চেয়ে অপরাধ সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধ করা অধিক কার্যকর। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাদক, কিশোর অপরাধ, ইভটিজিং, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, চুরি-ছিনতাই, সামাজিক বিরোধ এবং গুজবনির্ভর উত্তেজনা-এসব বিষয়ে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে, তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করলে তারা হয়রানি বা ঝুঁকির মুখে পড়বেন না।

পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্কটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল শক্তি হচ্ছে-পুলিশকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে আসা এবং জনগণকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশীদার করা। সেই কারণে নবগঠিত কমিটিকে হতে হবে সেতুবন্ধনের প্রতিষ্ঠান। পুলিশের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব কমানো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করা, সামাজিকভাবে বিরোধ মীমাংসায় সহায়তা করা এবং অপরাধ প্রতিরোধে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো-এসব ক্ষেত্রে কমিটির দৃশ্যমান ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত সহযোগিতাও অপরিহার্য। কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক, পৃষ্ঠপোষক ও প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কমিউনিটি পুলিশিংকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে একটি সর্বজনীন সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে পরিচালনা করাই হবে এর গ্রহণযোগ্যতা ও সাফল্যের প্রধান শর্ত।

চাঁদপুরের কমিউনিটি পুলিশিংয়ের পুরোনো সুনাম রয়েছে। এখানকার কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে বাংলাদেশে অনুকরণীয় মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই সুনাম ও মডেল কেবল স্মৃতিতে ধরে রাখার বিষয় নয়; নতুন বাস্তবতায় তাকে আরও কার্যকর ও আধুনিক রূপ দেওয়া দরকার। প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা, জনসচেতনতামূলক প্রচার, তরুণদের সম্পৃক্তকরণ এবং নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও সময়োপযোগী করা যেতে পারে। প্রতিটি থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় কাঠামো তৈরি হলে জেলা পর্যায়ের উদ্যোগও আরও শক্তিশালী হবে।

আমরা আশা করি, নবগঠিত নেতৃত্ব অতীতের সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে। চাঁদপুর শহরে যে উদ্যোগ একসময় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলো, সেটি আবার পুরো জেলার মানুষের আস্থা ও অংশগ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠুক-এটাই প্রত্যাশা। নতুন নেতৃত্বকে তাই শুধু অভিনন্দন নয়, শুভ কামনাও জানাই। তাদের হাত ধরে চাঁদপুরের কমিউনিটি পুলিশিং আবার জেগে উঠুক; পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক হোক আরও আস্থাশীল, সহযোগিতাপূর্ণ ও মানবিক। অপরাধমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ চাঁদপুর গড়ার পথে নবগঠিত কমিটি তার হারানো গতি ফিরে পাক-এবং একসময়কার সাফল্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাক। এ দায়িত্ব এখন তাঁদের, আর সেই পথচলায় চাঁদপুরবাসীর প্রত্যাশা ও সহযোগিতা থাকবে-এটাই স্বাভাবিক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়