প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৭
বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন: প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রযাত্রা, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
গণমুখী কর্মসূচি, অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গির দাবি

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফিরে আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। ওই দিন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করে।
|আরো খবর
সরকারের প্রথম দিন থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং দুর্নীতি দমনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আলোকে সরকারের অর্জনকে প্রধানত ১০টি ক্ষেত্রে তুলে ধরা যায়।
১. অভূতপূর্ব জনসমর্থন ও গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তন
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। নির্বাচনের পর নতুন সরকার প্রশাসনিক কার্যক্রমকে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়।
সরকারের দাবি, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কারণে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২. ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম আলোচিত কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড। সরকারের ১০০ দিনের তথ্য অনুযায়ী, তখন ৫৩ হাজার ৯৬টি পরিবার ফ্যামিলি কার্ড এবং ২০ হাজার ৭৪৮টি পরিবার কৃষক কার্ড পেয়েছিল। নিম্নআয়ের ৫৫ লাখ পরিবারকে প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে মাসে ৩০ কেজি চাল দেওয়ার কর্মসূচিও চালু রয়েছে।
এ ছাড়া নারী, কৃষক, ক্রীড়াবিদ ও প্রবাসীদের জন্য পৃথক সহায়তা ও পরিচয়ভিত্তিক কার্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৩. নিম্নআয়ের মানুষের সামাজিক সুরক্ষা
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নারী ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ঋণসহায়তা, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের গণপরিবহনে ভাড়া ছাড় এবং খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
সরকারের প্রথম দিকের অন্যতম সিদ্ধান্ত ছিল ১২ লাখ ক্ষুদ্র কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের উদ্যোগ। পাশাপাশি নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
৪. অর্থনৈতিক সংস্কার ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট
১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করা হয়। বাজেটের মূল কৌশল হিসেবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা মোকাবিলায় ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও পুনঃমূলধনীকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকার চলতি অর্থবছরে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধনীকরণে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের কথা জানিয়েছে।
৫. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রপ্তানিতে অগ্রগতি
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাঁচ মাসের হিসাব অনুযায়ী, BPM6 পদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩১ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ফেব্রুয়ারি থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। জুন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এদিকে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার, প্রবাসী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৬. আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি দমন ও সুশাসন
সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় পর্যালোচনা এবং সরকারি অর্থের অপচয় কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অনলাইন জুয়া ও স্পোর্টস বেটিং মোকাবিলায় নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।
৭. শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তরুণদের জন্য নতুন উদ্যোগ
শিক্ষার্থীদের বৃত্তির সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, কারিগরি শিক্ষা ও আনন্দময় শিক্ষাভিত্তিক নতুন পাঠ্যপুস্তক যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রাথমিক গোল্ডকাপ ফুটবল এবং ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্টার্টআপ ও আইডিয়া প্রতিযোগিতার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে হাম টিকাদান কার্যক্রম পুনরায় জোরদার করা হয়েছে এবং বন্যাদুর্গত মানুষের পুনর্বাসনেও সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৮. অবকাঠামো, পরিবেশ ও জ্বালানি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কাজ দ্রুত শেষ করে উদ্বোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় কার্গো রিলিজ ব্যবস্থার উদ্যোগ এবং ঢাকার যানজট কমাতে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মহানগরের বাইরে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পাঁচ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও সরকার জানিয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় নদী দখল ও দূষণকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আমিনবাজারে প্রস্তাবিত ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রকল্পে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
৯. সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে আকাশসীমা নজরদারি রাডার এবং সীমান্তে ড্রোন, অ্যান্টি-ড্রোন ও মাইন শনাক্তকরণ সরঞ্জাম ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা-নারিতা সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু হওয়াও সরকারের পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ কূটনীতির একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
১০. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভিন্নমাত্রিক নেতৃত্ব
সরকারের পাঁচ মাসের মূল্যায়নে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সময়সীমা নির্ধারণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে প্রায় ২০০টি উদ্যোগ ও প্রকল্প নেওয়া বা বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে।
১৮০ দিনে মূল্যায়নের জায়গা কোথায়?
বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় এসে সরকার একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো, অন্যদিকে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে ১৮০ দিনের অর্জন মূল্যায়নে শুধু ঘোষিত কর্মসূচি নয়—সেগুলোর বাস্তবায়ন, জনগণের জীবনযাত্রায় প্রত্যক্ষ প্রভাব, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির বাস্তব ফলাফলও বিবেচনায় নিতে হবে।
সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির যে তথ্য দিয়েছে, তা আগামী দিনগুলোতে কতটা টেকসই ফলাফলে রূপ নেয়—সেটিই হবে বিএনপি সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া নতুন সরকারের ১৮০ দিনের যাত্রায় তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন হলো এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার সুফল কতটা পৌঁছাল। সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে সরকারের প্রথম পর্বের প্রকৃত সাফল্য।








