বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৩

নৃত্যের ছন্দে ‘সপ্তরূপা’র ৩৯ বছরের শিল্পযাত্রায় ৩ দিনব্যাপী নৃত্য প্রতিযোগিতা

সংস্কৃতি অঙ্গন প্রতিবেদক
নৃত্যের ছন্দে ‘সপ্তরূপা’র ৩৯ বছরের শিল্পযাত্রায় ৩ দিনব্যাপী নৃত্য প্রতিযোগিতা

চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে নৃত্যচর্চার দীর্ঘ পথের একটি পরিচিত নাম ‘সপ্তরূপা নৃত্য শিক্ষালয়’। নৃত্যকে শুদ্ধ শিল্পচর্চার মাধ্যম হিসেবে ধারণ করে ৩৯ বছরে পদার্পণ করেছে চাঁদপুরের প্রথম নৃত্য সংগঠনটি। এই দীর্ঘ পথচলার আনন্দকে আরও বর্ণিল করে তুলতে আয়োজন করা হয় তিনদিনব্যাপী নৃত্য প্রতিযোগিতার। নৃত্য প্রতিযোগিতা, শিল্পীদের পরিবেশনা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নৃত্যনাট্য ‘চণ্ডালিকা’র মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই আয়োজন।

গত ১৪ আগস্ট ২০২৬ (শুক্রবার) সন্ধ্যায় চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত সমাপনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তিন দিনের নৃত্য উৎসব। বিভিন্ন বয়স ও বিভাগের নৃত্যশিল্পীদের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতাটি হয়ে ওঠে নৃত্যনির্ভর একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন।

প্রতিযোগিতায় নাচের বিষয় ছিলো উন্মুক্ত। ফলে প্রতিযোগীরা নিজেদের পছন্দ, ভাবনা ও নৃত্যভাষার মধ্য দিয়ে মঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন নানা ধরনের পরিবেশনা। প্রথম দিনের আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় চাঁদপুর প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে। পরবর্তী দুদিন, অর্থাৎ দ্বিতীয় দিন ও সমাপনী দিনের আয়োজন বসে জেলা শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে। তিন দিনের আয়োজনজুড়ে নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশনায় উঠে আসে শৈল্পিক প্রকাশ, ছন্দ, তাল, অভিব্যক্তি ও মঞ্চনৈপুণ্যের নানা দিক।

প্রতিযোগিতার প্রথম দিনে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমির নৃত্য প্রশিক্ষক অভিজিৎ সরকার এবং মৌলভীবাজার শিল্পকলা একাডেমির নৃত্য প্রশিক্ষক দীপ দত্ত আকাশ। দ্বিতীয় ও সমাপনী দিনে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন দীপ দত্ত আকাশ এবং ময়মনসিংহ শিল্পকলা একাডেমির নৃত্য প্রশিক্ষক মানস তালুকদার। বিভিন্ন জেলা শিল্পকলা একাডেমির অভিজ্ঞ নৃত্য প্রশিক্ষকদের বিচারক হিসেবে সম্পৃক্ততা প্রতিযোগিতাটিকে দিয়েছে আন্তঃজেলা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটি মাত্রা।

তিনদিনের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সমাপনী আয়োজনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শিল্পপর্ব ছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যের পরিবেশনা। সপ্তরূপার শিল্পীদের পরিবেশনায় ‘চণ্ডালিকা’ হয়ে ওঠে আয়োজনের শিল্পিত পরিণতি। রবীন্দ্রনাথের এই নৃত্যনাট্যে নৃত্য, সংগীত, অভিনয় ও ভাবপ্রকাশের যে সমন্বয়, তা শিল্পীদের পরিবেশনায় মঞ্চে নতুন করে প্রাণ পায়। ‘চণ্ডালিকা’ বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়েও সপ্তরূপার নৃত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে। নৃত্যের মাধ্যমে সাহিত্য, দর্শন, মানবিকতা ও সামাজিক চেতনার বিষয়গুলো নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস রয়েছে এই ধরনের পরিবেশনায়। বিশেষ করে রবীন্দ্রনৃত্যনাট্যের মতো কঠিন ও বহুমাত্রিক শিল্পকর্ম মঞ্চে উপস্থাপন করতে নৃত্যের পাশাপাশি অভিনয়, সংগীত, অভিব্যক্তি ও দলগত সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।

৩৯ বছরের পথচলায় সপ্তরূপা নৃত্য শিক্ষালয় চাঁদপুরের নৃত্যচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক ধারায় এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে চলেছে। সংগঠনটির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিশু-কিশোর ও তরুণ শিল্পীরা নৃত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাদের অনেকেই মঞ্চপরিবেশনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজেদের শিল্পীসত্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন। ফলে সপ্তরূপার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক প্রজন্মের নৃত্যশিল্পীর বেড়ে ওঠার গল্প।

সমাপনী পর্বে তিন দিনের প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন বিভাগে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কার পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি নতুন শিল্পীদের জন্যে এমন প্রতিযোগিতা হয়ে ওঠে নিজেদের নৃত্যদক্ষতা যাচাই ও মঞ্চভীতি কাটিয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

সপ্তরূপার ৩৯ বছরের পথচলায় চাঁদপুরে নৃত্যশিল্পের চর্চা কতোটা বিস্তৃত হয়েছে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে নৃত্যের প্রতি আগ্রহ কতোটা তৈরি হচ্ছে এবং শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার ধারাটি কীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এগিয়ে যাচ্ছে—তিনদিনের এই আয়োজন তারই একটি দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

নৃত্যের ছন্দে, রবীন্দ্রনাথের ‘চণ্ডালিকা’র শিল্পিত আবেদনে এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মঞ্চউপস্থিতিতে সপ্তরূপার ৩৯ বছরের উদ্যাপন শেষ হলেও চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে তাদের নৃত্যচর্চার এই যাত্রা অব্যাহত থাকার প্রত্যাশাই রইলো।

তিনদিনের এই নৃত্য প্রতিযোগিতার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন সংগঠনের সভাপতি ও সাংবাদিক কাদের পলাশ এবং সপ্তরূপা নৃত্য শিক্ষালয়ের সাধারণ সম্পাদিকা ও অধ্যক্ষ অনিমা সেন চৌধুরী। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন প্রান্ত সেন চৌধুরী।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়