প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৯
কবি নজরুল সড়কে কবি নজরুল পার্ক ও মিলনায়তন
সাহিত্য একাডেমির নতুন ভবনে হোক কবি নজরুল পাঠাগার

বিদ্রোহী কবি ও বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২১ সালের ৮ জুলাই চাঁদপুরে এসেছিলেন। কোনো সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নয়, বরং যাত্রাপথে অর্থসংকটের কারণে তাঁকে চাঁদপুরে যাত্রাবিরতি করতে হয়েছিল। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহমদ। কবির এই সাময়িক অবস্থানই চাঁদপুরের সংস্কৃতির ইতিহাসে যুক্ত করেছে এক অনন্য স্মৃতিঅধ্যায়।
|আরো খবর
কুমিল্লা থেকে কলকাতা যাওয়ার পথে চাঁদপুরে এসে কবি ও তাঁর বন্ধু শহরের তৎকালীন স্ট্র্যান্ড রোডের ডাকবাংলোয় আশ্রয় নেন। ডাকবাংলোটি ছিল বর্তমান ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের পশ্চিম পাশে অবস্থিত ত্রিতল ভবনের স্থানে এবং লেডী প্রতিমা মিত্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে। ইটের তৈরি লাল রঙের একতলা ভবনটির সামনে ছিল দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান।
চাঁদপুরের কৃতী সন্তান ও উপমহাদেশের প্রখ্যাত নজরুল গবেষক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলামের ‘কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সাহিত্য’ গ্রন্থের ‘দৌলতপুর ও নার্গিস’ অধ্যায়ে কবির চাঁদপুর অবস্থানের এ তথ্য পাওয়া যায়। গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯২১ সালের ৮ জুলাই নজরুল ও মুজফ্ফর আহমদ চাঁদপুর ডাকবাংলোয় ওঠেন। সেখান থেকে কলকাতায় আফজালুল হককে টেলিগ্রাম করে যাত্রাভাড়ার টাকা চাওয়া হয়। আফজালুল হকের অনুরোধে কুমিল্লার আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী চাঁদপুরের কংগ্রেস নেতা হরদয়াল নাগকে টেলিগ্রাম করেন, যাতে তিনি কবি ও তাঁর বন্ধুর যাত্রাভাড়ার ব্যবস্থা করেন। সেই সূত্রে হরদয়াল নাগ তাঁদের কাছে ১২ টাকা পৌঁছে দেন। পরে ওই টাকা নিয়ে নজরুল ও তাঁর বন্ধু স্টিমারযোগে গোয়ালন্দ হয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হন।
কবির এই স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সড়কের ঐতিহাসিক তাৎপর্য জনসমক্ষে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয় অনেক পরে। ২০০৮ সালের ২৫ মে, ১১ জ্যৈষ্ঠ, নজরুলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে চাঁদপুরের প্রসিদ্ধ সংগীত প্রতিষ্ঠান ‘সংগীত নিকেতন’ চাঁদপুর রোটারী ভবনে নজরুল জয়ন্তীর আয়োজন করে। একই দিন বিকেলে ‘সপ্তসুর সংগীত একাডেমী’র অনুরূপ অনুষ্ঠানেও নজরুলকে স্মরণ করা হয়। এসব আয়োজনে ‘চাঁদপুরে কবি নজরুল’-এর ইতিহাস তুলে ধরেন রোটারিয়ান কাজী শাহাদাত। তিনি কবির স্মৃতিধন্য স্ট্র্যান্ড রোডের নাম ‘কবি নজরুল সড়ক’ করার দাবি জানান। পরবর্তী সময়ে চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জীবন কানাই চক্রবর্তীসহ শহরের অন্যান্য সুধীজনও এ দাবির প্রতি সমর্থন জানান। তাঁদের সম্মিলিত উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে চাঁদপুর পৌরসভার তৎকালীন প্রথম মেয়র নাছির উদ্দিন আহমেদ ও তাঁর পৌর পরিষদ স্ট্র্যান্ড রোডের নতুন নামকরণ করেন ‘কবি নজরুল সড়ক’। এ নামকরণের মধ্য দিয়ে চাঁদপুরে কবির অবস্থানের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ সম্পন্ন হয়।
বর্তমানে কবি নজরুল সড়কে চাঁদপুর পৌরসভার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে কবি নজরুল পার্ক ও কবি নজরুল মিলনায়তন। নামকরণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া স্মৃতি সংরক্ষণের প্রয়াস এ দুটি স্থাপনার মাধ্যমে আরও দৃশ্যমান হয়েছে। তবে কবির স্মৃতিকে কেবল সড়কের নাম, পার্ক কিংবা মিলনায়তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নজরুলের সাহিত্য, সংগীত, সাম্যবাদী চেতনা, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পাঠচর্চা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।
এ প্রেক্ষাপটে চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনায় কবি নজরুলের স্মৃতি ও সাহিত্যচর্চাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। সাহিত্য একাডেমির বহুতল ভবন নির্মিত হলে সেখানে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন মিলনায়তনের পাশাপাশি ‘কবি নজরুল পাঠাগার’ ও ‘কবি নজরুল সেমিনার কক্ষ’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছি।
গত ২৩ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার, নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর আয়োজিত নজরুলকে নিবেদিত সাহিত্যসভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে আমি এ দাবি উত্থাপন করেছি। আমার বিশ্বাস, সাহিত্য একাডেমির নতুন ভবনে কবি নজরুল পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হলে তা কেবল কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের নিদর্শন হবে না; একই সঙ্গে নজরুলবিষয়ক অধ্যয়ন, গবেষণা, আলোচনা ও সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার একটি স্থায়ী কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারবে।
পাঠাগারটিতে নজরুলের রচনাবলি, তাঁর জীবন ও সাহিত্যবিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ, পত্রপত্রিকা এবং নজরুল-সম্পর্কিত দুর্লভ প্রকাশনা সংগ্রহ করা যেতে পারে। পাশাপাশি কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী, সাহিত্যসভা, পাঠচক্র, সেমিনার এবং তরুণ লেখক-পাঠকদের অংশগ্রহণে নিয়মিত আয়োজন করা সম্ভব। সেমিনার কক্ষটি নজরুল গবেষক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীদের পারস্পরিক মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
কাজী নজরুল ইসলাম চাঁদপুরে এসেছিলেন একটি আকস্মিক যাত্রাবিরতির কারণে। কিন্তু তাঁর সেই স্বল্পকালীন অবস্থান আজ শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। স্ট্র্যান্ড রোডের নাম পরিবর্তন করে কবি নজরুল সড়ক করা এবং সেখানে কবি নজরুল পার্ক ও মিলনায়তন প্রতিষ্ঠা সেই ঐতিহ্যকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্যোগ। এখন সময় এসেছে এই স্মৃতিকে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার।
চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির নতুন ভবনে কবি নজরুল পাঠাগার ও সেমিনার কক্ষ প্রতিষ্ঠিত হলে কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা আরও অর্থবহ হবে। একই সঙ্গে চাঁদপুরের সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে সৃষ্টি হবে নতুন সম্ভাবনা। কবি নজরুল সড়কের পার্ক ও মিলনায়তন যেমন কবির নামকে ধারণ করছে, তেমনি সাহিত্য একাডেমির পাঠাগার ও সেমিনার কক্ষ তাঁর সাহিত্য, দর্শন ও মানবিক চেতনাকে ধারণ করুক—এটাই প্রত্যাশা।







