মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১১

একজন ‘খালেদা আপা’ এবং আমাদের স্বাস্থ্যনীতির কাঠগড়া!

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
একজন ‘খালেদা আপা’ এবং আমাদের স্বাস্থ্যনীতির কাঠগড়া!
ক্যাপশন :নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা খালেদা আক্তার।

একজন ‘খালেদা আপা’ এবং আমাদের স্বাস্থ্যনীতির কাঠগড়া

সাড়ে ১৩ বছরে প্রায় ২ হাজার ২০০ স্বাভাবিক প্রসব। আটবার উপজেলার সেরা পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার স্বীকৃতি। ঝড়-বৃষ্টি, গভীর রাতের নিস্তব্ধতা কিংবা নিজের শারীরিক অসুস্থতা—কোনো প্রতিকূলতাই প্রসূতি মায়ের পাশে দাঁড়ানোর পথে তাঁর দেয়াল হতে পারেনি।

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা খালেদা আক্তারের এই প্রাপ্তি নিঃশ্বাসে আত্মতৃপ্তি এনে দেয়। তবে তাঁর এই পথচলা কেবল একজন নিবেদিতপ্রাণ স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর প্রশংসার ফুলঝুরি বর্ষণ করে চুকিয়ে ফেলার বিষয় নয়। বরং এই সাফল্য আমাদের গলদঘর্ম স্বাস্থ্যব্যবস্থার মুখে একটি অপ্রিয় অথচ কাঠখোট্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—

সীমিত সরঞ্জামের শৃঙ্খলে থেকেও একজন খালেদা আক্তার যদি ২২ শত মায়ের গর্ভমুক্তির নিরাপদ আশ্রয় হতে পারেন, তবে রাষ্ট্র কেন দেশের প্রতিটি প্রান্তে এমন দক্ষ ও মানবিক মাতৃসেবা উপহার দিতে পারছে না?

প্রশ্নটির গভীরতা বিশাল। কারণ এর সমীকরণের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে একজন মায়ের অস্তিত্ব, নবজাতকের ভবিষ্যৎ, নিম্নবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় চিকিৎসাসেবার ওপর মানুষের ক্ষয়ে যাওয়া আস্থা।

২২ শত: কেবল একটি সংখ্যা নয়, ২২ শতটি জীবনের ইতিহাস

২০১৩ সালের ১৬ এপ্রিল নারায়ণপুরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে খালেদা আক্তার মতলব ও তার আশপাশের চরাঞ্চলের হাজারো নারীর আস্থার ঠিকানা হয়ে উঠেছেন।

সম্প্রতি গভীর রাতে তীব্র প্রসববেদনায় কাতর হাবিবা আক্তার নামের এক নারী যখন কেন্দ্রে আসেন, খালেদা আক্তার তখন নিজেই অসুস্থ। কিন্তু নিজের শারীরিক ক্লান্তি পেছনে ঠেলে, দীর্ঘ এক ঘণ্টার লড়াই শেষে তিনি এক কন্যাসন্তানের ভূমিষ্ঠ হওয়া নিশ্চিত করেন।

এই একটি দৃশ্যপট স্পষ্ট করে—স্বাস্থ্যসেবা কেবল ইটের দেয়াল, ঝকঝকে ওপিডি কিংবা দামি প্রযুক্তির প্রদর্শনী নয়; এটি সংকটের মুখে একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের চূড়ান্ত মানবিক সংবেদনশীলতা

অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান: জীবনরক্ষা নাকি বাণিজ্যিক মনস্তত্ত্ব?

আজকের চিকিৎসা জগতে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা স্পষ্ট—চিকিৎসাগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বহু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসবের বদলে অস্ত্রোপচারকে সহজ বা লাভজনক পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে।

অবশ্যই, সিজারিয়ান কোনো অপরাধ নয়। প্রসূতি বা শিশুর প্রাণসংশয় হলে অস্ত্রোপচারই পরম আশীর্বাদ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের আধিক্য নিয়ে।

খালেদা আক্তারের হাতে নিরাপদে জন্ম নেওয়া এই ২,২০০ শিশুকে যদি অনর্থক অস্ত্রোপচারের টেবিলে নেওয়া হতো, তবে কী ঘটত?

আর্থিক দেউলিয়াত্ব: একটি অসচ্ছল পরিবারের ওপর নামত বিপুল খরচের বোঝা—ওষুধ, হাসপাতাল বিল ও অস্ত্রোপচারের বাড়তি খরচ। • শারীরিক ঝুঁকি: অহেতুক অস্ত্রোপচার ডেকে আনে ইনফেকশন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও অ্যানেস্থেশিয়ার জটিলতা। • দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: পরবর্তী গর্ভধারণে জটিলতা এবং শরীরে বয়ে বেড়ানো স্থায়ী ক্ষত।

দায় কেবল চিকিৎসকদের ওপর চাপানো অন্যায়; সিংহভাগ চিকিৎসকই দিনরাত আত্মত্যাগ করে জীবন বাঁচাচ্ছেন। কিন্তু যেখানে চিকিৎসার চেয়ে বাণিজ্যের হিসাব বড় হয়ে ওঠে, সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও স্বচ্ছ নীতিমালার অভাবই মূল অপরাধী।

সাফল্যের পেছনের ভিত ও রাষ্ট্রের করণীয়

খালেদা আক্তারের এই নিরবচ্ছিন্ন সেবার পেছনে কেবল আবেগ নেই, আছে সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা। ২০০৭ সালে এসএসসি পাসের পর পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি টাঙ্গাইল ট্রেনিং সেন্টার থেকে ১৮ মাসের নিবিড় মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ নেন।

রাষ্ট্রের জন্য মূল বার্তা এখানেই নিহিত:

দক্ষ জনবলের অভাব: প্রতিটি ইউনিয়নে দীর্ঘমেয়াদি ও হালনাগাদ মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ জোরদার করা। • জরুরি সেবায় বিলম্ব: স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা (যেমনটি খালেদা আক্তার থাকেন)। • অবকাঠামোগত ঘাটতি: ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ, পানি, জরুরি ওষুধ ও দ্রুত রেফারেলের জন্য সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা করা। • একক ব্যতিক্রমের ওপর নির্ভরতা: সফল কর্মীদের অভিজ্ঞতাকে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করে মডেল হিসেবে তৈরি করা।

ব্যতিক্রম নয়, অধিকারের রূপরেখা

আমাদের স্লোগান ‘সিজারিয়ান বনাম স্বাভাবিক প্রসব’ হওয়া উচিত নয়; আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত—"প্রয়োজনে সিজারিয়ান, অপ্রয়োজনে নয়।"

খালেদা আক্তার প্রমাণ করেছেন, সরকারি কাঠামোর একজন কর্মীও প্রান্তিক মানুষের কাছে বিশ্বাসের প্রতীক হতে পারেন। কিন্তু একজন ‘খালেদা আপা’কে নিয়ে কেবল রূপকথা লিখলে রাষ্ট্র তার দায় এড়াতে পারবে না।

এখন সময় এসেছে এই একক ব্যতিক্রমকে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অভিন্ন অধিকারে রূপ দেওয়ার। প্রতিটি প্রসূতি মা যেন অহেতুক কাটাকুটির ভয় ভুলে, নিরাপদ ও মানবিক মাতৃত্বের নিশ্চয়তা নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে পারেন—সেই বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক খালেদা আক্তারের অনন্য লড়াইয়ের আসল প্রতিদান।

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়