সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৭

মৃত্যুর ছাই থেকে জন্ম নেওয়া ফিনিক্স: ‘ঘুষ ডট সাইট’ ও তরুণপ্রজন্মের ডিজিটাল গর্জন

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
মৃত্যুর ছাই থেকে জন্ম নেওয়া ফিনিক্স: ‘ঘুষ ডট সাইট’ ও তরুণপ্রজন্মের ডিজিটাল গর্জন
ছবি : প্রতীকী

মৃত্যুর ছাই থেকে জন্ম নেওয়া ফিনিক্স: ‘ঘুষ ডট সাইট’ ও তরুণপ্রজন্মের ডিজিটাল গর্জন

প্রাক-কথন
একজন মা মারা গেলেন। একটি পরিবার হারাল তার শেষ আশ্রয়টুকু। স্বাভাবিক মানবিক নিয়মে এরপর রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল শোকাহত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো, তাদের প্রাপ্য অর্থ বিন্দুমাত্র বিলম্ব ছাড়া বুঝিয়ে দেওয়া। কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, মৃত মানুষের পাওনা অর্থ তুলতেও জীবিত স্বজনদের মুখোমুখি হতে হলো আমলাতান্ত্রিক শোষণের নগ্ন রূপের—ঘুষের।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নির্মম জায়গাটি কেবল অর্থের লেনদেনে নয়; তার চেয়েও ভয়ংকর হলো, অধিকার আদায়ের জন্য উৎকোচ দেওয়াকে যেন এক স্বাভাবিক প্রশাসনিক রীতি হিসেবে মেনে নেওয়ার এক অলিখিত সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছিল।

ময়মনসিংহের ১৭ বছরের তরুণ শাহেদ শরীফ আহমেদের জীবনে এই অভিজ্ঞতা নিছক কোনো পারিবারিক দুর্ঘটনার গল্প হয়ে থাকেনি। মায়ের মৃত্যুশোক, বাবার অসহায়ত্ব, পাসপোর্টের ফাইলের ঝুলন্ত বাস্তবতা এবং সরকারি দপ্তরের টেবিলে টেবিলে উৎকোচের রক্তচক্ষু—সবকিছু মিলিয়ে তার মননে এক তীব্র প্রশ্ন আছড়ে পড়েছিল: “এই বিষাক্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে করা যায় কী?”

উত্তরটি সে কোনো রাজপথের স্লোগানে বা মানববন্ধনে খোঁজেনি; খুঁজেছে কম্পিউটারের কি-বোর্ডে। বন্ধু সাইফ কবিরকে সঙ্গে নিয়ে সে গড়ে তুলেছে ‘ঘুষ ডট সাইট’। এখানেই এক কিশোরের ব্যক্তিগত বেদনা রূপ নিয়েছে এক ঐতিহাসিক নাগরিক প্রতিবাদে। আর সেই প্রতিবাদ আমাদের সামনে এক যুগান্তকারী প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বহুমাত্রিক ধরনটাই বদলে দিতে যাচ্ছে?

ঘুষ: একটি লেনদেন নয়, এক মজ্জাগত সংস্কৃতি
ঘুষকে আমরা সাধারণত টাকার অঙ্ক দিয়ে পরিমাপ করি—কত দেওয়া হলো, কত নেওয়া হলো। কিন্তু ঘুষের প্রকৃত বিষাক্ততা টাকার অঙ্কে লুকিয়ে থাকে না; তার আসল বিভীষিকা হলো এটি যখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও অভ্যাসে পরিণত হয়।

একজন সাধারণ নাগরিক যখন মানসিকভাবে মেনে নেন যে ‘টাকা ছাড়া কাজ হবে না’, তখন দুর্নীতি কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম থাকে না, তা সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নেয়। তখন উৎকোচ গ্রহণকারী জানেন—নাগরিক বাধ্য; ঘুষদাতা জানেন—প্রতিবাদ করলে ফাইল চিরতরে চাপা পড়বে; আর সমাজ জানে—অন্যায় হলেও কেউ এগিয়ে আসবে না। এই অদৃশ্য কুচক্রী ত্রিভুজের ভেতরেই দুর্নীতি অমরত্ব পায়।

অতএব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আসল সংগ্রাম শুধু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পদবীকে ধরার সংগ্রাম নয়; বরং ঘুষকে 'স্বাভাবিক' বলে মেনে নেওয়ার সেই দাসত্বমূলক মানসিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। শাহেদের আঘাতটি ঠিক সেই মজ্জাগত মানসিকতার কেন্দ্রবিন্দুতেই হেনেছে。

মায়ের পাওনা: টাকার চেয়েও বড় এক নৈতিক প্রশ্ন
শাহেদের মা আমিনা খাতুন ছিলেন ময়মনসিংহ সদরের দাপুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ২০২২ সালে তাঁর অকালমৃত্যুর পর পরিবারটি যখন অসীম শূন্যতায় নিমজ্জিত, ঠিক তখনই শুরু হয় প্রভিডেন্ট ও পেনশনের টাকা আদায়ে দপ্তরে দপ্তরে ঘোরার আমলাতান্ত্রিক প্রহসন।

প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ পেতে ট্রেজারি ও শিক্ষা দপ্তরের ধাপে ধাপে ৩৮ হাজার টাকা উৎকোচ প্রদান এবং পরবর্তীতে কল্যাণ তহবিলের পাওনা আদায় করতে আরও ১ লাখ টাকা দাবি করা—এগুলো যদি সত্য হয়, তবে তা কেবল কোনো একক পরিবারের দুর্ভোগের গল্প নয়। এটি রাষ্ট্রের চেহারার ওপর এক পরম কলঙ্ক。

প্রশ্নটি খুবই পরিষ্কার: একজন মৃত সরকারি কর্মচারীর পরিবারকে তাঁর অর্জিত ও বৈধ পাওনা আদায়ে কেন কোনো অনৈতিক অর্থের মুখোমুখি হতে হবে? একজন কর্মচারী জীবনভর রাষ্ট্রকে সেবা দিয়েছেন, তাঁর বেতন থেকে নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে অর্থ কেটে রাখা হয়েছে। মৃত্যুর পর সেই অর্থ দ্রুত স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া প্রশাসনের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। সেখানে যদি ‘ফাইল মুভমেন্ট’, ‘স্বাক্ষর’, ‘ছাড়পত্র’ কিংবা ‘অনুমোদন’—প্রতিটি প্রশাসনিক শব্দের আড়ালে ঘুষ লুকিয়ে থাকে, তবে প্রশ্ন ওঠে: এই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রটি আসলে কার স্বার্থে পরিচালিত? নাগরিকের সেবায়, নাকি মধ্যবর্তী ক্ষমতার অপব্যবহারে?

শাহেদের দ্রোহের বিশেষত্ব কোথায়?
বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভের ইতিহাস নতুন নয়। যুগে যুগে অসংখ্য সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে, গোলটেবিল বৈঠক হয়েছে, সংবাদ সম্মেলন আর মানববন্ধন হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা যায়নি। কারণ দুর্নীতি কেবল নৈতিকতার ঘাটতি নয়; এটি অসম ক্ষমতার সম্পর্কের ফল।

যেখানে একদিকে একজন নিঃসঙ্গ, অসহায় নাগরিক—আর অন্যদিকে সিল, স্বাক্ষর, ফাইল ও ক্ষমতার দুর্ভেদ্য প্রাচীর পরিবেষ্টিত সরকারি অফিস, সেখানে নাগরিকের দর-কষাকষির শক্তি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এই অসম ক্ষমতার ভারসাম্যকে এক লহমায় বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। একজন মানুষের একাকী অভিযোগ আমলাতন্ত্রের গহ্বরে হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু হাজার হাজার মানুষের একই অভিজ্ঞতার তথ্য যখন এক জায়গায় জমা হয়, তখন তা একটি 'প্যাটার্ন' বা প্রবণতা তৈরি করে। আর ডেটা দিয়ে তৈরি এই প্রাতিষ্ঠানিক প্যাটার্নই হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে অপ্রতিরোধ্য প্রমাণভিত্তিক অস্ত্র

‘ঘুষ ডট সাইট’: একটি ওয়েবসাইটের চেয়েও বড় বৈপ্লবিক ধারণা

ডিজিটাল ঠিকানা: ghush.site
প্রথম ৯ দিনে জমা পড়া ক্ষোভ: ৯,৬৬৫টিরও বেশি সরাসরি অভিযোগ
দাবিকৃত সম্ভাব্য ঘুষের পরিমাণ: ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা
প্রাথমিক বিকাশ ও শ্রম: মাত্র ২ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন কোডিং ও ১০০ ডলার খরচ
মূল নিরাপত্তা কৌশল: ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তের নাম শতভাগ গোপন রেখে ডেটা বিশ্লেষণ

এই উদ্যোগকে কেবল একটি ওয়েবসাইট হিসেবে দেখলে এর মূল গভীরতা অনুধাবন করা যাবে না। এটি মূলত একটি দর্শন—নাগরিকের বিচ্ছিন্ন কান্না ও ক্ষোভকে ডেটার সম্মিলিত শক্তিতে রূপান্তর করার কৌশল। প্রযুক্তি হয়তো নিজে দুর্নীতি দূর করতে পারবে না, কিন্তু প্রযুক্তি দুর্নীতির অদৃশ্য দেয়ালগুলোকে সম্পূর্ণ দৃশ্যমান করে তুলতে পারে। আর যা জনসমক্ষে দৃশ্যমান হয়ে যায়, তাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কোনো আমলাতন্ত্রের থাকে না。

তবে এই শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে অপরিসীম দায়িত্বশীলতা। প্ল্যাটফর্মটিকে সবসময় অভিযোগের সুযোগ, তথ্যের সততা এবং অভিযুক্তের ন্যায্যতার ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। তথ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে পারলেই এই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারবে。

নতুন প্রজন্ম রাজনীতি করছে না—তারা রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের প্রশ্ন ছুড়ছে
শাহেদের উদ্যোগ একটি নতুন যুগের জানান দিচ্ছে। তরুণদের প্রতিবাদের ধরণ বদলে গেছে। এককালের মিছিল, স্লোগান কিংবা ব্যানার-পোস্টারের জায়গা দখল করে নিয়েছে কোড, অ্যালগরিদম, ডেটা আর সামাজিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।

এই প্রজন্ম রাষ্ট্রকে মৌলিক প্রশ্ন করতে শিখছে—
• কেন সেবার তথ্য ও ফাইলের গতিপথ অদৃশ্য থাকবে?
• কেন একটি ফাইল সচল করতে অনৈতিক অর্থের লেনদেন লাগবে?
• কেন নাগরিককে একই কাগজ বারবার জমা দিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে?
• কেন দুর্নীতির অভিযোগের বিচার দৃশ্যমান হবে না?

এই প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রবিরোধী নয়, বরং একটি কার্যকর, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে সবচেয়ে বড় সোচ্চার দাবি। কারণ জবাবদিহিতা চাওয়া রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়; বরং জবাবদিহিতাহীন রাষ্ট্রই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি。

একটি ওয়েবসাইট রাষ্ট্রযন্ত্রকে কী শেখাতে পারে?
১. নাগরিক শক্তিকে অবমূল্যায়নের দিন শেষ: নাগরিকের অভিজ্ঞতা এখন আর শুধুই ক্ষোভ নয়, তা বিশ্লেষণযোগ্য তথ্য
২. প্যাটার্নকে উপেক্ষা করা অসম্ভব: বিচ্ছিন্ন একটি অভিযোগ চোখ এড়িয়ে গেলেও হাজার হাজার নাগরিকের তথ্যের প্যাটার্নকে ঢেকে রাখা অসম্ভব।
৩. তরুণরা কেবল ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমান সংস্কারক: নতুন প্রজন্ম শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়; তারা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মূল চালিকাশক্তি।
৪. বিকল্পের উদ্ভব: রাষ্ট্র যদি নিজে থেকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে, নাগরিক নিজেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজস্ব বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলবে。

শাহেদের বয়স ১৭—কিন্তু তার প্রশ্নের বয়স শতাব্দীপ্রাচীন
শাহেদের বয়স হয়তো মাত্র ১৭ বছর, কিন্তু সে যে প্রশ্নটি রাষ্ট্রের সামনে দাঁড় করিয়েছে, তার বয়স বহুকাল পুরনো। এই দেশের কোটি কোটি মানুষ বছরের পর বছর ধরে সেবা নিতে গিয়ে এই অপমানের শিকার হয়েছেন। কত লাখ কোটি টাকা ঘুষের পেটে গেছে, কত মানুষের জীবন থমকে গেছে—তার কোনো সুনির্দিষ্ট ডেটা এতদিন আমাদের কাছে ছিল না。

পুরাণের ফিনিক্স পাখি যেমন ছাইয়ের ভেতর থেকে নতুন জীবন লাভ করে, ঠিক তেমনি শাহেদের মায়ের অকালমৃত্যুর শোক থেকে জন্ম নিয়েছে নাগরিক জাগরণের এক নতুন আলো。

শেষ কথা: সিদ্ধান্ত এখন রাষ্ট্রের
‘ঘুষ ডট সাইট’-কে রাষ্ট্র কীভাবে গ্রহণ করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এটিকে কি একজন কিশোরের আবেগ বলে এড়িয়ে যাওয়া হবে, নাকি নাগরিক সমাজের এক জরুরি সংকেত হিসেবে গ্রহণ করা হবে? এটিকে কি প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি ভাবা হবে, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ফেরানোর এক সোনালী সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো হবে?

সিদ্ধান্ত পুরোপুরি রাষ্ট্রের। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই ডিজিটাল প্রজন্মকে আর নীরব রাখা যাবে না। যে রাষ্ট্র নাগরিকের থেকে কর নেয়, আইন মানার আনুগত্য আশা করে—সেই রাষ্ট্রকে অবশ্যই নাগরিককে সম্মানজনক সেবা দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। ফাইলের গতি টাকার অঙ্কে নির্ধারিত হতে পারে না。

শাহেদের সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো সে নিজে নয়; তার ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নটি—“আমার মৌলিক অধিকার ও প্রাপ্য পেতে আমাকে ঘুষ দিতে হবে কেন?”

যেদিন এই প্রশ্নটি শুধু শাহেদের একার থাকবে না, কোটি কোটি নাগরিকের সমন্বিত কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হবে—সেদিন দুর্নীতির সবচেয়ে বড় স্তম্ভ 'নীরবতা' চুরমার হয়ে ভেঙে পড়বে。

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়