প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৪০
বিএনপির ৪৮ বছর : রক্তঋণ, সত্তার দায় ও আগামীর বাংলাদেশ

আজ ১ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের রক্তঝরা ও ঘটনাবহুল রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য মাইলফলক। ১৯৭৮ সালের এই দিনে কালজয়ী রাষ্ট্রনায়ক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কালের পরিক্রমায় আজ দলটি ৪৮ বছরে পা রাখল। চার দশকের এই দীর্ঘ পথচলা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক যাত্রারেখা নয়; এটি এ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা ও স্বাধিকার রক্ষার এক অবিনাশী ইতিহাস।
|আরো খবর
৪৮ বছরের এই বাঁক কেবল আনুষ্ঠানিকতা উদযাপনের উপলক্ষ নয়; এটি ইতিহাসের আয়নায় দাঁড়িয়ে অতীতে অর্জিত সাফল্য ও ত্যাগের পর্যালোচনার দিন—অতীতের শিক্ষা নিয়ে আগামীর পথরেখা নির্ধারণের এক মাহেন্দ্রক্ষণ।
ইতিহাসের গর্ভ থেকে উদ্ভাসিত দর্শন
১৯৭৮ সালে যখন বিএনপির জন্ম, তখন বাংলাদেশ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সংকট ও নানা ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পথ চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে শহীদ জিয়াউর রহমান উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী রাজনীতি এবং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর দর্শনকে সামনে রেখে রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুনভাবে সংগঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হলো—রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা এবং জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতার মূল উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, তরুণ ও নারীসমাজসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারায় সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে বিএনপি তার সাংগঠনিক ভিত্তি বিস্তৃত করে।
কণ্টকাকীর্ণ পথ ও অগণিত প্রাণের রক্তঋণ
বিএনপির পথচলা কোনোদিনই কণ্টকহীন ছিল না। প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমানের নির্মম শাহাদাত দলটির অস্তিত্ব ও নেতৃত্বের ওপর গভীর আঘাত হানে। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি পুনর্গঠিত ও সুসংগঠিত হয় এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়েও ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার দাবিতে বিএনপি বিভিন্ন সময়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে।
এই দীর্ঘ লড়াইয়ের খেসারত দিতে গিয়ে দলের অসংখ্য নেতাকর্মী কারাবরণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও নানা ধরনের রাজনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন। অনেকে প্রাণও হারিয়েছেন। ইতিহাসের এই বিপুল রক্তঋণ কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা সম্ভব নয়—প্রতিটি ত্যাগের নেপথ্যে জড়িয়ে আছে গণতন্ত্র, অধিকার ও একটি মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশের স্বপ্ন।
বাকসর্বস্বতা নয়, চাই প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা
গণতন্ত্র নিছক ক্ষমতার রদবদলের কোনো হাতিয়ার নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক দর্শন। গণতন্ত্র মানে নাগরিকের ভোটাধিকার, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে এসে বিএনপির ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও অঙ্গীকার হলো—গণতন্ত্রের এই মৌলিক ধারণাগুলোকে কার্যকর রাষ্ট্রাচারের রূপ দেওয়া। জনগণ আজ শুধু গালভরা প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তন চায়। এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, যেখানে নাগরিকের অধিকার তার রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের ওপর নির্ভর করবে না।
৩১ দফা : রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক রূপরেখা
দলের ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা কেবল একটি রাজনৈতিক ইশতেহার নয়; বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী এটি রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার ও পুনর্গঠনের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য এতে তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই একটি কার্যকর ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই রূপরেখা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিএনপি প্রমাণ করতে চায়—শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তনই তাদের লক্ষ্য।
ডিজিটাল প্রজন্ম ও তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি আজ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন এবং উদ্যোক্তাভিত্তিক অর্থনীতির এই সময়ে তরুণদের প্রত্যাশা, কর্মসংস্থানের ধারণা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
তরুণদের কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। মেধার স্বীকৃতি, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলার মাধ্যমে তারুণ্যের সম্ভাবনাকে জাতীয় উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।
মেঘনাপারের রাজনীতি : জনআকাঙ্ক্ষার চাঁদপুরের ছবি
জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি চাঁদপুর জেলা বিএনপির শিকড় ও জনভিত্তিও দীর্ঘদিনের। চাঁদপুরের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সমস্যা ও সম্ভাবনার সঙ্গে রাজনীতিকে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করাই এখন সময়ের দাবি।
মেঘনার নদীভাঙন রোধ, কৃষক ও মৎস্যজীবীদের অধিকার রক্ষা, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসার, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে চাঁদপুরকে একটি সমৃদ্ধ জনপদে রূপান্তরের প্রত্যয় থাকতে হবে। যে রাজনৈতিক দল মানুষের সুখ-দুঃখ ও দুর্দিনে পাশে থাকে, জনগণের আস্থা ও ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ তারই বেশি।
প্রতিশোধের দাফন ও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজনীতিতে প্রতিহিংসা ও শত্রুতার সংস্কৃতির অবসান জরুরি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকবে, ভিন্নমত থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তে আমাদের একটি সুস্থ, নীতিনিষ্ঠ, সহনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
অতীতের ত্যাগ ও সংগ্রামের রাজনীতি তখনই চূড়ান্ত সার্থকতা পাবে, যখন আমরা দেশে স্থায়ী শান্তি, সামাজিক সম্প্রীতি, জাতীয় সংহতি এবং গণতান্ত্রিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারব।
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : অঙ্গীকার যখন জনমুখী
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের মূল বার্তা হওয়া উচিত গভীর আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং ভবিষ্যৎমুখী অঙ্গীকার। এটি কেবল অতীতের স্তুতি গাওয়ার দিন নয়; এটি একটি নতুন, গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার সংকল্পের দিন—
- যে বাংলাদেশে ভোট হবে নাগরিকের চূড়ান্ত ক্ষমতার প্রকাশ;
- যে বাংলাদেশে আইনের শাসন হবে সবার জন্য সমতার প্রতীক;
- যে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম হবে নির্ভীক সত্যের প্রতিধ্বনি;
- এবং যে বাংলাদেশে রাষ্ট্র হবে জনগণের প্রকৃত সেবক।
রক্তের ইতিহাস থেকে আগামীর গণতান্ত্রিক ভোর
রাজনীতিতে ৪৮ বছর একটি পরিণত রাজনৈতিক পথচলার প্রতীক। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে কৌশল, চিন্তা ও কর্মপদ্ধতিকেও আধুনিক ও বাস্তবমুখী করা আজকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অতীতের সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে শহীদ ও সংগ্রামী নেতাকর্মীদের ত্যাগকে শক্তিতে রূপান্তর করেই এগিয়ে যেতে হবে।
জনগণের ভোটাধিকার, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক লড়াইয়ে সফল হওয়াই বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের প্রধান শপথ।
গণতন্ত্র পুনর্জাগরিত হোক। জনগণের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হোক। স্বাবলম্বী হোক প্রিয় বাংলাদেশ।
প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








