সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০০

মসজিদের বিদায়ী খতিবের প্রতি এমন সম্মান প্রশংসাব্যঞ্জক

অনলাইন ডেস্ক
মসজিদের বিদায়ী খতিবের প্রতি এমন সম্মান প্রশংসাব্যঞ্জক

সমাজে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তাঁর পদ-পদবি কিংবা বিত্তবৈভব দিয়ে নয়, বরং কর্ম, ত্যাগ, নিষ্ঠা ও মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার উত্তর নয়াকান্দি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের বিদায়ী খতিব মাওলানা মো. ফজলুর রহমানের প্রতি মুসল্লি ও এলাকাবাসীর ভালোবাসাপূর্ণ বিদায় সংবর্ধনা এরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ ৪৮ বছর খতিবের দায়িত্ব পালনের পর ২৭টি সুসজ্জিত গাড়ির বহরে তাঁকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয়।

একজন খতিব কেবল জুমার নামাজে খুতবা প্রদানকারী ব্যক্তি নন; তিনি সমাজের নৈতিক শিক্ষক, ধর্মীয় পথপ্রদর্শক এবং মানুষের বিপদ-আপদে আস্থার আশ্রয়। তাঁর উপদেশে মানুষ ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে শেখে, তাঁর শিক্ষায় শিশু-কিশোরেরা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে এবং তাঁর মধ্যস্থতায় অনেক পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধের অবসান ঘটে। মাওলানা ফজলুর রহমান দীর্ঘ কর্মজীবনে এমনই বহুমাত্রিক ভূমিকা পালন করেছেন বলে তাঁর বিদায় অনুষ্ঠানে বক্তাদের স্মৃতিচারণ থেকে প্রতীয়মান হয়। কয়েক প্রজন্মের মানুষের শিক্ষা, নৈতিকতা ও চারিত্রিক গঠনে তাঁর অবদান তাঁকে এলাকাবাসীর হৃদয়ে বিশেষ স্থান দিয়েছে। আমাদের সমাজে দায়িত্ব পালন শেষে অনেক গুণী মানুষ যথাযথ মূল্যায়ন পান না। বিশেষ করে মসজিদের ইমাম-খতিব ও ধর্মীয় শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অবদান প্রায়ই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে থেকে যায়। অথচ তাঁদের শ্রমের ফল কেবল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না; মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও জীবনাচরণে তার প্রভাব দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়। সে বিবেচনায় মাওলানা ফজলুর রহমানকে দেওয়া এই সম্মান শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং ধর্মীয় সেবায় নিয়োজিত মানুষের অবদানের প্রতি সামাজিক স্বীকৃতি।

এ ধরনের আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। তা হলো, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার যথাযথ মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। একজন মানুষ যখন দেখেন, দীর্ঘদিন সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে সমাজ তাঁকে ভালোবাসা ও সম্মানে স্মরণ করে, তখন তাঁর মধ্যে জনকল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগের আগ্রহ বাড়ে। একই সঙ্গে মসজিদ পরিচালনা কমিটি, মুসল্লি ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগ সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও মানবিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে। তবে এমন সম্মান যেন কেবল বিদায় অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। দায়িত্ব পালনরত ইমাম-খতিবদের আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, চিকিৎসাসহায়তা এবং অবসরকালীন কল্যাণ নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট কমিটি ও সমাজের দায়িত্ব। যাঁরা সারা জীবন মানুষের কল্যাণ ও নৈতিক উন্নয়নে কাজ করেন, তাঁদের শেষ জীবনে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করা আমাদের মানবিক ও সামাজিক কর্তব্য। মাওলানা ফজলুর রহমানের বিদায় সংবর্ধনা আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁর ৪৮ বছরের খেদমতের প্রতি এলাকাবাসীর এই ভালোবাসা প্রমাণ করে, আন্তরিকতা দিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া যায়। আমরা আশা করি, উত্তর নয়াকান্দি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের এই দৃষ্টান্ত দেশের অন্যান্য মসজিদ ও সমাজের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। মহান আল্লাহ তাআলা মাওলানা ফজলুর রহমানের দীর্ঘদিনের দ্বীনি খেদমত কবুল করুন, তাঁকে সুস্থতা ও নেক হায়াত দান করুন এবং তাঁর কর্মকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়