প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১১
শরণার্থী

হৃদয়হীন আততায়ীর মতো সাবেরাকে ঝাপটে ধরেছে প্রচণ্ড জ্বর। তার সারা শরীরে রক্তপানি করা ব্যথা ছড়িয়ে আছে। মুখ এতটাই তেতো, খাবার গলা দিয়ে নামতে চায় না। উল্টো বমি পায়। অথচ সাবেরা কোথাও থেমে বুক ভরে শ্বাস নেবে এবং দুশ্চিন্তামুক্ত একটি রাত আরামে ঘুমাবে তার উপায় নেই। সবার পেছনেই তাড়া করছে বীভৎস মৃত্যু, তাই চলতে না পারলে বিপদ অনিবার্য। চারদিন হলো সাবেরার জ্বর কমেনি। মেয়ে শরফুন ওকে দেখভাল করে। মাথায় পানি দেয়, হাত-পা মালিশ করে। বুচিডং ছাড়ার পর দু-মাস হলো পথেই তাদের ঘরবাড়ি, জীবন-সংসার। জ্বরের কারণে সাবেরা কুঁজো হয়ে কচ্ছপ গতিতে হাঁটে। সকাল থেকে বারবার মনে হয়েছে— ও হয়ত বাঁচবে না। যেকোনো মুহূর্তেই আত্মা ওড়ে যাবে স্রষ্টার দরবারে। তবু ও নিজের জন্য বিন্দুমাত্র চিন্তা করে না। শরফুনকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিতে পারলে মরেও শান্তি পাবে সে। অথচ বিপদের পথ যেন পুলসিরাত, শেষই হয় না। পথিমধ্যে এক বয়স্ক লোক বলেছেন, শিকদারপাড়া পৌঁছাতে আরও দুদিন লাগবে। এটি মিয়ানমারের শেষ গ্রাম। তারপর বিপদসঙ্কুল নাফ নদী। কোস্টগার্ডকে ফাঁকি দিয়ে সাবেরা-শরফুনকে এ জলসীমা পাড়ি দিতে হবে। তারপরেই ওরা পৌঁছাতে পারবে বাংলাদেশের উখিয়ায়। তাই সাবেরা প্রাণঘাতি জ্বরের তোয়াক্কা করে না। তবে শরফুন আতঙ্কিত বোধ করে। ওর হাত-পা যেন ভেঙে যাচ্ছে। ছোট্ট মেয়েটার এখন স্কুলে যাওয়ার বয়স। অথচ প্রাণ বাঁচাতে স্বদেশ ছেড়ে তাকে ছুটতে হচ্ছে অজানা গন্তব্যে। বাংলাদেশে ওরা কী খাবে, কোথায় থাকবে তারও ঠিক নেই। সাবেরা মনের জোরে হেঁটে চলে। হাঁটতে হাঁটতে পা ভীষণ ফুলে গেছে। পথচলতি কোনো তরুণকে দেখলেই ওর হৃদয় চুরমার হয়ে যায়। রাফিকের কথা ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে। কেমন আছে চির-উদাসীন রাফিক?
সাবেরার বিয়ে ছিল চমকপ্রদ। আনোয়ার তার বহুদিনের চেনা। একই এলাকায় দুজনে বেড়ে উঠেছে। আনোয়ার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে সাবেরার বাবা প্রথমে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বলেছেন, ‘ও বড় ঘাড়ত্যাড়া লোক। তোর সঙ্গে বনবে না।’ শেষ পর্যন্ত সাবেরার দু-রাত অভুক্ত-অনশনের পর বাবা রাজি হয়েছিলেন। প্রথম একবছর সুখে-শান্তিতে কেটেছিল ওদের সংসার। তারপর শান্তির পাখি উড়ে গেছে দূরে। বিয়ের পর অনেকবছর সন্তান হয়নি সাবেরার। পরিবার-পরিজন এ নিয়ে কম কটুকথা শোনায়নি। ও সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিল আনোয়ারের অশ্রাব্য ভাষায়। ভাগ্য ভালো, ততদিন বাবা মাটির উপর ছিলেন না। সাবেরা যখন আশা ছেড়ে দিচ্ছিল, তখনই রাফিক পেটে আসে। তার জন্মের তিনবছর পর পৃথিবীর আলো দেখেছে শরফুন। ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভালোই চলছিল সংসার। ঝগড়াঝাটি বিতাড়িত হয়েছিল ঘর থেকে। ধীরে ধীরে সন্তানেরা বড় হচ্ছিল। আনোয়ারও খুশি। সাবেরার প্রতি স্রষ্টা যেন রহম করেছিলেন।
বুচিডং ছিল স্বপ্নের শহর। ধীরে ধীরে তা পরিণত হয়েছে নরকের দরোজায়। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীর হাতে প্রাণ যায় বারো নিরাপত্তা কর্মীর। সেদিনটির কথা সাবেরার স্পষ্ট মনে আছে। সারাদেশ থমকে গিয়েছিল। তখন থেকেই সরকার ক্লিয়ারেন্স অপারেশন শুরু করে। মিয়ানমান আর্মির থাবায় সাজানো-গোছানো বুচিডং লণ্ডভণ্ড, ক্ষত-বিক্ষত হয়। জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ লোক ছোটে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে। সাবেরার নির্জঞ্জাল সংসার।
তাকেও ঝড়ের মধ্যে পড়তে হবে, সে কখনও ভাবেনি। পুরাতন দিনের কথা ভাবতেই ওর কান্না পায়। শরণার্থী ক্যাম্পে এসে প্রথমদিকে চিৎকার করে কাঁদত সে। শরফুন যেন কিছু দেখে বা শোনে না। পাথরের মতো বোধশূন্য। অন্য কোনো মেয়ে হলে মায়ের সঙ্গে কান্না জুড়ে দিত। কিন্তু শরফুন নির্মম বাস্তবতায় তেরো বছরেই পূর্ণবয়স্ক হয়ে উঠেছে। সে ভাত রান্না করে, ঘরদোর ঝাড় দেয়। তারপর মায়ের আর নিজের জামাকাপড় ধুয়ে রোদে শুকায়। কখনও বড়শি দিয়ে খাল থেকে মাছ ধরে আনে। কিছুতেই মায়ের কান্নায় ব্যাঘাত ঘটাতে চায় না। এ যেন দায়িত্বশীল কন্যার প্রতিজ্ঞা। সাবেরাও জানে, কাঁদার স্বাধীনতাটুকু না পেলে এতদিনে সে মরে যেত বা গলায় দড়ি দিত।
বুচিডংয়ের মানুষ হঠাৎ করেই যেন অদৃশ্য হতে শুরু করে। ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ রেখে যে যার মতো পালাচ্ছে। ততদিনে রাফিক ষোলতে পা দিয়েছে। ওর ডানপিটে শরীর আর মায়াময় চোখ কারও দৃষ্টি এড়াত না। সাবেরা সবসময় ওকে চোখে চোখে রাখত। হঠাৎ যদি তার যক্ষের ধন নিয়ে যায় মিয়ানমার আর্মি কিংবা আরসা। রাফিক মায়ের উদ্বিগ্নতায় ভেতরে ভেতরে ভয় পেত। তবে মাকে সান্ত্বনা দিতে এসব কথাবার্তা এক ফুৎকারে প্রায়ই উড়িয়ে দিত সে। যেন এমন কিছু কখনও ঘটবে না। তবে বাবা আনোয়ার ছিলেন কর্কশ। বাজারে যেতে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। কথা না শোনায় একদিন বাবার হাতে চড়ও খেয়েছে রাফিক। রাখাইনে জাতিগত সংঘাত শুরু হওয়ার পর আনোয়ার দিঘির জলের মতন শান্ত হয়ে গেছেন। সারাক্ষণ কী যেন ভাবেন। জন্মভূমির রক্তাক্ত পরিণতি তিনি কিছুতেই মানতে পারেন না। অনেকদিন হলো রাফিক তাকে হাসতে দেখেনি। বুচিডং বাজারে তাদের নামকরা ওষুধের দোকান। আগে বেচাবিক্রি ভালোই ছিল। হাসপাতালে রোগী আসত প্রচুর। এখন হাসপাতাল বন্ধ, তাই দোকানে ভিড় নেই। এছাড়া সব কাজেই মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রাফিক আগে সপ্তাহে দু-একদিন দোকানে বসত। উদ্দেশ্য বাবাকে সহযোগিতা করা আর পৈতৃক ব্যবসাটির কলাকৌশল আত্মস্থ করা। আরেকটি গোপন ব্যাপার অবশ্য ছিল। বাবা কখনও টের পেতেন না। দোকানের কাছাকাছি একটি পুরানো বাড়িতে হামিদারা থাকত। ওরা সমবয়সী। এত চঞ্চল সে, হাঁটে না, যেন উড়ে উড়ে চলে। হামিদা প্রায়ই দোকানে আসত দাদার ওষুধ নিতে। ওকে দেখলেই রাফিকের মুখ লাল হয়ে যেত। কখন কী বলবে বুঝে উঠতে পারত না। তবে হামিদার ঠোঁটে সবসময় সেঁটে থাকত অপ্রার্থিব হাসি। অনেক সময় নিয়ে সে ওষুধ কিনত। রাফিক ভেবেছিল, ওদের চোখাচোখি প্রেম কেউ জানবে না। অথচ সাবেরা জানতেন। মায়ের চোখ ফাঁকি দেয়ার মতো চালাক রাফিক হয়নি। ঘুমের ঘোরেও হামিদাকে সে ভুলতে পারে না।
চারদিকে বরফ-সময়। পথঘাট, পশু-পাখি, মানুষ—সবকিছুই যেন প্রাণহীন, আড়ষ্ট। ব্যতিক্রম কেবল নদীটির জীবন। সাবেরা আগে কখনও এত গভীরভাবে নাফ নদী দেখেনি। শিকদারপাড়া থেকে ওরা যখন নদী পার হচ্ছিল, সাবেরার মনে হয়েছে এটি যেন স্বর্গের নদী। এপারে দোজখ, ওপারে বেহেশত। ওরা রুদ্ধশ্বাসে নদী পার করেছিল। বাংলাদেশে সাবেরার প্রথম স্থান হয় হাসপাতালের বেডে। ডাক্তার বলেছিল, জ্বর নিয়ে অবহেলা করা ঠিক হয়নি। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে সে। সুস্থ হওয়ার পরে ওদেরকে কুতুপালংয়ে ঘর দেয়া হয়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী শিবির কুতুপালং। উঁচু-নিচু টিলায় ছোট-বড় ঘরে অসংখ্য রোহিঙ্গার বাস। গা ঘেঁষে ঘেঁষে উঠেছে ঘরগুলো। ঠিক ঘরও বলা যায় না। বাঁশ-পলিথিন দিয়ে চাল ও বেড়া দেয়া হয়েছে। শীতকালে কায়ক্লেশে থাকা যায়, কিন্তু গরম হলে কষ্টের সীমা থাকে না। কুতুপালংয়ে সাবেরা প্রতিদিন উড়ে যাওয়া দিনের সামনে দাঁড়ায়। সবই স্মৃতি। অনেকসময় অতীতে এত মগ্ন হয় সে, কোনটি বর্তমান আর কোনটি ফেলে আসা সুসময়— আলাদা করতে পারে না। দুঃখের ডানায় ভর করে দিন কেটে যায়। প্রতিদিনের কাজকর্ম বলতে সামান্য। রান্নাবান্না করা। বিকেল হলে সবাই গল্পগুজব করে। বেশিরভাগ গল্পই স্বদেশের। এ ক্যাম্পে নিরাপত্তা আছে, খেয়ে-পরে মোটামুটি থাকা যায়। মগের অত্যাচার নেই, মৃত্যু বাঘের মতো তাড়া করে ফেরে না। তবু কিছু একটা যেন নেই। সবার চোখ মরা মাছের মতো শূন্য। হাসলেও ওদের চোখের মণি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে না। সবাই অপেক্ষা করে—একদিন আবার নিজ দেশে ফিরবে। নিজের জমিতে ফসল ফলাবে, রুটিরুজির দোকান খুলবে। নিজবাড়ির পরিচিত বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে শান্তির ঘুম দেবে। ওদের অপেক্ষা বাড়তে থাকে। কখনও কখনও ওরা ভাবে— নিজবাড়ি কি এখনও আছে? নাকি পুড়িয়ে দিয়েছে?
সাবেরার জীবনে তৃতীয় কোনো মানুষ নেই। আছে হয়তো, অথবা হারিয়ে গেছে। এখন শরফুনই তার সব। সাবেরা ওর মুখের দিকে ঠিকমতো তাকাতে পারে না। জিংলার মতো হয়ে গেছে মেয়েটা। তারপরও মা-মেয়ের মধ্যে ঝগড়া হয়। কথা বলা বন্ধ থাকে দু-একদিন। একঘেয়ে জীবনে বৈচিত্র্য আসে। এক শুক্রবারে শরফুন বাবা আর ভাইয়ের ছবি ঘরে টাঙিয়েছিল। ভেবেছিল মা খুশি হবেন। কিন্তু সাবেরা ঘুরে ঢুকেই হতবাক হয়। মাথা ঝিমঝিম করে তার চোখেমুখে অন্ধকার নেমে আসে। তারপর শরফুন কিছু বুঝে ওঠার আগেই আনোয়ারের ছবিটা বাইরে সর্বশক্তি দিয়ে ছুড়ে ফেলে সাবেরা। স্বামীর প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ জলোচ্ছ্বাসের মত উপচে পড়ে। মুখে অকথ্য যা আসে তা-ই গালাগাল দেয়। শরফুনও ক্ষুব্ধ হয়। তিলতিল করে জমানো টাকায় ছবিগুলো বাঁধাই করে আনিয়েছে সে।
—ফটো ইয়্যান কেল্লা ফেলাইয়ন অ- মা? (—ছবিটা ফেললে কেন মা?)
—তরে হইয়্যিদেননে নাম ইয়্যান মস্সাম্মত্তু ন-লবি। (—তোরে বলছি না ওই নাম আমার সামনে নিবি না। তুই আমার মরা মুখ দেখবি।)
—তুই মর মরা মুখ দেখিবি। (—তুই আমার মরা মুখ দেখবি।)
—হিবা মর বাপ। হিবা লরাই গরইয়া। হিবার ফটো মুই রাখিম। (—উনি আমার বাবা। উনি সংগ্রামী। উনার ছবি রাখবো আমি।)
—পোয়াছার জিন্দেগির মাব্বত ন’গরে, হিবা আবার লরাই গরইয়্যা। (—পুত্র-কন্যার জীবনের মায়া করে না, সে আবার সংগ্রামী...।)
ক্ষোভে হিতাহিত জ্ঞান হারায় সাবেরা। হাতের কাছে যা পায়, তাই দিয়ে এলোপাতাড়ি মারে শরফুনকে। হাড্ডিসার মেয়েটা দৌড়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। সাবেরা আকাশপাতাল কাঁপিয়ে কাঁদে। ঘরে আশপাশের মানুষের ভিড় জমে। সবাই জানে এ কান্না সহজে থামবে না। যেমন একবার নামলে থামতে চায় না আষাঢ়ের বৃষ্টি। তবু দু-একজন সান্ত্বনা দিয়ে যায়। সাবেরা ছেলের ছবিটা বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কাঁদতে থাকে।
নাম না-জানা এক ভিক্ষুক রাফিককে বলত, জীবনের গতি দুরকম—একটি সময়, অন্যটি অসময়। বুচিডংয়ে এখন দিকভ্রান্ত সময় চলছে। প্রতিদিনই আর্মিরা বাজারে আসে। একে ধরে, ওকে মারে। ইচ্ছে হলে হত্যা করতেও দ্বিধা নেই। প্রায়ই বোমা ফাটার শব্দ শোনা যায়। এর মধ্যে মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাফিক বের হয়েছে। অনেকদিন সে হামিদাকে দেখে না। মন খাঁচাবন্দী পাখির মতো আনচান করে। বড় গলি পার হয়ে সে হামিদার বাড়ির দিকে এগোয়। পকেটে সঙ্গোপনে ওর জন্যে কিছু ফুল নিয়েছে। হামিদার দাদা ওকে ভালোভাবে চেনে। তার কাছে যাওয়ার বাহানায় হামিদাকে দেখবে। বলবে—দোকানে কিছু টাকা পাওনা আছে, সেগুলো নিতে এসেছি। বাড়িটার কাছে পৌঁছে রাফিক দেখলো কোথাও কেউ নেই। চারদিকে কবরের নিস্তব্ধতা। গেটে বড় একটি তালা ঝুলছে। কোথাও কি বেড়াতে গিয়েছে হামিদারা? রাফিক হতাশ হয়। কিছুক্ষণ আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে সে। বাজারে আজকাল মানুষজন কম আসে। অনেক দোকানপাট বন্ধ। রাফিকদের ওষুধের দোকানটি কদাচিৎ খোলা হয়। ঝুঁকি নিয়ে বাবা খোলেন। রোজগার না হলে সবাই খাবে কী? কোত্থেকে যেন হঠাৎ বাবা এসে রাফিকের সামনে হাজির হন। তাকে বাজারে দেখে ভীষণ চটে গেছেন তিনি।
—বাইর কেল্লা অইয়্যছ? হয়লিদেনয়নে, ঘরত থাকিবি। (—বের হলি কেন? বলেছি না, ঘরেই থাকবি।)
—মর পেট হরাফ। দাবায় লইতো আইস্সমদ্যে। (—পেট খারাপ আমার। ওষুধ নিতে এসেছিলাম।)
—মরার আর সময় নপালিদ্যেনে। তঅক গরি ঘরত যা। মুই দাবায় লই আইম্মদ্যে। (—মরার আর সময় পেলি না। তাড়াতাড়ি বাড়ি যা। আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।)
—অয়। নীরবে মাথা নাড়ে ও।
— বিল বাঈ ঘরত যাইস। অবস্থা ভালা নয়। শফিক হাক্কুতারা তিনদিন থুয়াই ন পাইর। মনেয়দ্দ্যে বাংলাদেশত গেইয়ই। (—বিলের পথ দিয়ে বাড়ি যাইস। পরিস্থিতি ভালো না। শাফিক চাচারা তিনদিন নিখোঁজ। মনে হয় বাংলাদেশে চলে গেছে।)
রাফিক ভূত দেখার মত চমকে ওঠে। শাফিক মিয়া হামিদার দাদা। বাড়ি ফেরার পথে সে নিজের অজান্তেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। অশ্রুতে হামিদার মুখখানা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে ওঠে। ওরা কি বেঁচে আছে? উত্তর জানা নেই কারো।
কুতুপালং চেকিং পয়েন্টটি জটিল। শরফুন আগেও কয়েকবার এখানে এসেছে। এখানে ওরা দেশ-মাটিহীন শরণার্থী। ইচ্ছে হলেই ক্যাম্পের বাইরে ওরা যেতে পারে না। এটা ওদের জন্মভূমি নয়। ওদের জন্মস্থান বুচিডং। শরফুন মাদ্রাসায় যেত। পড়াশোনায় ও ভালো ছিল না, কিন্তু পৃথিবীর জানার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। একদিন ওদের শিক্ষক মকবুলকে কুপিয়ে মেরে ফেলে মগরা। তারপর থেকে বাড়িতেই থাকত শরফুন। নিজ দেশে স্বেচ্ছাবন্দীর জীবন। বাবার দোকান প্রায়সময়ই বন্ধ রাখতে হয়। তবু নিস্তার নেই। এদিকে একরাতে বাড়িতে আসে অপরিচিত ছয়-সাতজন মানুষ। শরফুন দেখেছে, ওদের প্রত্যেকের চোখে নিষ্ঠুর চাহনি। ওরা নিজেদের সরকারের লোক দাবি করে। বাবাকে যাচ্ছেতাই গালিগালাজ করে শাসিয়েছে। বলেছে—বাবা নাকি জঙ্গীগোষ্ঠী আরসার সমর্থক। তিনি তাদের নাকি বিনামূল্যে ওষুধ ও টাকা দিয়েছেন। বাবা হাতজোড় করে বলেছেন, ওরা অস্ত্রের মুখে কিছু ওষুধ আর টাকা লুট করেছে। বাবা ওদের সহযোগিতা করেনি। আর্মির সদস্যরা ক্রুর হাসে। যেন বাবা মিথ্যাবাদী রাখাল। তারপরের সপ্তাহেও বাবা দুদিন দোকান খুলেছেন। আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ। তারপর একদিন ভরদুপুরে বাড়ি ফিরছেন শরীর রক্তাক্ত করে। মিয়ানমার আর্মি তাকে খুব মেরেছে। বাবাই যেন আরসা কিংবা স্বাধীনতাকামী আরাকান আর্মির সদস্য। দোকানটাও দখলে নিয়েছে মিয়ানমার আর্মি। বলেছে, আবার দোকানের ধারে-কাছে পেলে ওরা কেউ প্রাণে বাঁচবে না।
সেদিন থেকে বাবা অন্য মানুষ। ঘরেই থাকেন। চুপচাপ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকেন। কারও সাথে তেমন কথা বলেন না। অবশ্য মাঝে মাঝে কার সঙ্গে যেন উত্তেজিত হয়ে ফোনে কথা বলেন। আবার দু-একবার মায়ের সঙ্গে প্রচণ্ড ঝগড়া করেন। ক’বার গায়েও হাত তুলেছেন। অপমানিত মা ফাঁসি দিতে গিয়েছিলেন। শরফুন ও রাফিক তাকে শান্ত করেছে। তিনদিন পরপর বাবা মাঝরাতে ঘর থেকে বের হন। ভোররাতের দিকে কোথায় থেকে যেন খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসেন। খাবারের উৎস সম্পর্কে শরফুন একদিন জিজ্ঞেস করেছিল। বাবা নিরুত্তর থেকেছেন। কিন্তু মা যেন গর্জে ওঠেন— ‘আরসায় যোগ দিছে তোর বাপ। আমাদের আর বাঁচতে দিবে না।’ বাবাও মার কথা সহ্য করেন না। অকথ্য গালিগালাজ করেন। রাফিক বাবাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে।
প্রায় একবছর হলো শরফুন বাবাকে দেখে না। ক্যাম্পের গেটে সে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে। ভাবে—এই গেট দিয়ে একদিন আনোয়ার হোসেন এসে সামনে দাঁড়াবেন। তার হাতটা জড়িয়ে ধরে শরফুন বাড়ি ফিরবে। এসব ভাবতেই ওর চোখ ঝিলিক দিয়ে ওঠে। মায়ের মারধর ক্লিশে হয়ে আসে। সে স্বভাবসুলভ ঢঙে বাড়ি ফেরে। উঠোন থেকে কুড়িয়ে নেয় বাবার ছবিখানি। মা শান্ত হলে পরে একসময় আবার সাঁটাবে। শরফুন কেবল বাবাকে চোখের সামনে দেখতে চায়। আগের মতো, হাসিমুখে।
বুচিডং আজকাল রহস্যময় নগরী। আগে এটি শহর ছিল, এখন ক্রমশ বৃহৎ গোরস্তানে পরিণত হচ্ছে। রাফিকও একদিন বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। সাবেরা পাড়া-প্রতিবেশীর ঘর, আশপাশ তন্ন তন্ন করে খোঁজে। কোথাও ছেলেটার চিহ্নটুকু নেই। চিন্তায় ওর পাগল হবার জোগাড়। কোথায় নেই রাফিক। তাহলে কি আর্মিরা ওকে ধরে নিয়ে গেছে? সাবেরার দিনভর কাঁদে, আনোয়ার তাকে সান্ত্বনা দেয়। বলে, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। অথচ সাবেরার দিনরাত কাটে না। দুশ্চিন্তায় খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। প্রতিবেশীদের মধ্যে কানাঘুষা চলে। সেসব কথা এক-দু কান হয়ে সাবেররা কাছে আসে। কিন্তু তার কিছুই বিশ্বাস হয় না। একদিন রাতে আনোয়ারই সবকিছু খুলে বলেন। রাফিক আরসাতে যোগ দিয়েছে। ও শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ে মাতৃভূমি উদ্ধার করবে। আনোয়ারের কথা শেষ হওয়ার আগেই সাবেরা জ্ঞান হারায়। তারপর থেকে তাদের কথা বলা বন্ধ। দুজন আলাদা বিছানায় ঘুমান। কেউ কারও মুখ দেখেন না। তারপর একরাতে আনোয়ারও উধাও হয়ে যায়। পড়ে থাকে একটি চিঠি, আর বাংলাদেশে যাওয়ার কিছু পথখরচ। সাবেরা হতবাক হয়ে পড়ে। স্বামীর কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণে প্রবল ঘৃণা জন্মে। ধরে নেয় তার স্বামী অপঘাতে মারা গেছে। সে বিধবা হয়েছে। শরফুনকে নিয়ে এক ভোররাতে সাবেরা সীমান্তের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। চারদিকে মৃত্যুর আনাগোনা। পরের তিনমাস পথে পথে কেটেছে সাবেরার। রাতে থেকেছেন মানুষের বাড়ি বাড়ি। গন্তব্য ছিল অজানা বাংলাদেশ।
বুচিডংকে এখন আর কোনোভাবেই চেনা যায় না। মিয়ানমারে মুসলমান মানে রোহিঙ্গা, অ-নাগরিক। এ ভূমি বহুকাল মুসলমানের বধ্যভূমি। অথচ এরা এ ভূমিরই সন্তান। সাবেরা প্রায় নিজেদের অবস্থা নিয়ে ভাবে। কার দোষে ওরা দেশান্তরী? সরকার, রোহিঙ্গা বিদ্রোহী নাকি আনোয়ার? উত্তর মেলাতে পারে না। কিন্তু মন থেকে ঘৃণার পাহাড় সরে না। ইদানীং উখিয়ার ক্যাম্পে শরণার্থী আসার সংখ্যা বেড়েছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার ওদের সীমান্তে ঢুকতে দিতে চায় না। কয়েক দফা ফেরত পাঠায়। তারপরও শরণার্থীর ঢল থামানো যায় না। আজকাল একদিনে চল্লিশ-পঞ্চাশজনও ক্যাম্পে আসে। সাবেরা প্রায়ই নতুন শরণার্থীদের দেখতে যায়। পরিচিত কেউ এলে এলাকার খোঁজখবর নেয়া যাবে। সবাই জানে সংঘাত আরও বেড়েছে। ফলে শরণার্থী ক্যাম্পে ভিটামাটিহীন মানুষও বাড়ছে।
রাফিক কখনও এমন করতে পারে, সাবেরা স্বপ্নেও ভাবেনি। কিশোর ছেলে, ওর জ্ঞানবুদ্ধি আর কতটুকু ছিল। আনোয়ারই সবকিছুর জন্য দায়ী। সাবেরার কাছে জীবনকে দুঃস্বপ্ন মনে হয়। ওর সোনার টুকরো ছেলে। মাঝে মাঝেই খবর আসে, আরসার অমুক-তমুক মারা গেছে। গাছের ডালে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। প্রথমদিকে সাবেরার বুক কেঁপে উঠতো। সে জানে, একদিন ঠিক এমনভাবেই বাতাসে ভেসে আসবে রাফিকের মৃত্যুসংবাদ কিংবা আনোয়ারের। তারপরও সাবেরা বুকে পাথর বেঁধেছে। সবকিছু শুনেও শোনে না। জেনেও জানে না। যেন কোনো কিছুতেই ওর কিছু যায়-আসে না। কেবল একদিন তার ব্যতিক্রম হয়। শরফুন এক দুপুরে দেখে মা হাউমাউ করে কাঁদছেন। বুকে জড়িয়ে রেখেছেন রাফিকের শার্ট। সন্ধ্যা নামে, দিন আসে, আবারও সন্ধ্যা নামে প্রকৃতির নিয়মে। সাবেরার জীবনে সন্ধ্যা আর কাটে না।
কুতুপালং আগের মতো নেই। নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে শরণার্থীরা। নিজেদের মধ্যেও বিরোধ কম নয়। কয়েকদিন আগেও ক্যাম্পের হেডমাঝি সাবেরকে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মাঝে মাঝে ধর্ষণের খবরও আসে। সাবেরার বিতৃষ্ণা লাগে। শরফুনকে চোখের আড়াল হতে দেয় না। একঘেয়েমি কাটাতে ঘরের পাশেই কিছু সবজি গাছ লাগিয়েছে ও। শরফুন মিলে নিয়ম করে পানি ঢালে। হাঁসমুরগি পালার ইচ্ছেও ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে হয়ে ওঠে না। ক্যাম্পে হুটহাট ঝগড়া লাগে। সাবেরা দেখতে যায়, কখনও মীমাংসা করে দেয়। আজকাল সলেমা খাতুন খুব ঝগড়া করে। কখন কার সঙ্গে সে ঝগড়া বাধাবে আগে থেকে আঁচ করা যায় না। ওর বাড়ি ছিল রাখাইনের পোয়াংখালী গ্রামে। নাফ নদী পেরিয়ে প্রথমে এসেছিল টেকনাফের মুছনী গ্রামে, পরে কুতুপালংয়ে। সাবেরার সঙ্গে সলেমা খাতুনের মিল ছিল। সেনারা ওর ছেলেকে খুন করেছে। সাবেরা তাই প্রায়শই ওর ঘরে যেত। ইদানীং সলেমাকে যেন চেনা যায় না। ভীষণ একরোখা। ওর শরীরে যেন জিন ভর করেছে। আজ যখন সন্ধ্যায় ওর ঘর থেকে চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছিল, সাবেরা প্রথমে যেতে চায়নি। পরে যখন সলেমার কান্নার শব্দ তীব্রতর হলো সে না গিয়ে থাকতে পারেনি। সঙ্গে সঙ্গে শরফুনও এসেছে। সলেমার ঘরে লোকে ভর্তি। কে যেন ওর গহনা চুরি করেছে। এ নিয়ে তুলকালাম। সাবেরা কী করবে বুঝতে পারে না। অসহায়ভাবে আশপাশে তাকায়। সম্ভাব্য চোরকে খোঁজে যেন। হঠাৎ চোখে বিভ্রম লাগে। শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শরফুন চিৎকার করে ওঠে। তারপর এক দৌড়ে ঝাপটে ধরে মেয়েটাকে। কতদিন পরে দেখা। হামিদাও বিস্মিত। দৃশ্যটা সাবেরার স্বপ্ন মনে হয়। কি হাড্ডিসার চেহারা হয়েছে মেয়েটার।
সাবেরা ওকে নিজের ঘরে নিয়ে আসে। হামিদা জানায়, গতকাল এসেছে ও। একা একা। দাদা-বাবা কেউ নেই। মিয়ানমার আর্মি মেরে ফেলেছে। সাবেরাকে এসব বলছে আর অনর্গল কাঁদছে মেয়েটা। এতদিন হয়ত কান্নারও সুযোগ হয়নি তার। জীবন বাঁচাতে ছুটে বেড়িয়েছে একগ্রাম থেকে অন্যগ্রামে। তারপর বহুকষ্টে পার হয়েছে কাঁটাতার। ঘণ্টাখানেক পর হামিদা ধাতস্থ হয়। লজ্জাবনত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘রাফিক ভাই হড়ে (কোথায়)?’ সাবেরা কী বলবে ভেবে পায় না। মাথা ঝিমঝিম করে, চোখের সামনে অসংখ্য তারার ঝলকানি। শরফুন ধীরে ধীরে আঙুল তুলে ঘরে টানানো ছবিটি দেখায়। হামিদা আচমকা বুঝতে পারে না। কতদিন পর ও রাফিককে দেখলো।
ক্যাম্পে আসার পর শরফুনকে কেউ কখনও কাঁদতে দেখেনি। আজ সাবেরা দেখে, শরফুনের চোখে অশ্রুর ধারা বইছে। ঘোর বর্ষায় কেউ যেন নাফ নদীর সব বাঁধ খুলে দিয়েছে।
হতচ্ছাড়া রাতের শরীর বাড়তে থাকে। সাবেরা একটি রক্তিম ভোরের জন্য অধীর-অপেক্ষা করে।







