প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৭
চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটের বাসযাত্রীরা বোগদাদ ও আইদি’র কাছেই জিম্মি হয়ে থাকবে?

চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৭০ কিলোমিটার। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই পথ পাড়ি দিতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। অথচ বাস্তবে এই পথের যাত্রীরা কখনো আড়াই ঘণ্টা, কখনো তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা, এমনকি তারও বেশি সময় রাস্তায় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রশ্ন হলো—একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়কে এমন অব্যবস্থাপনা কি স্বাভাবিক? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, পরিবহন-সিন্ডিকেট এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার এক অদৃশ্য যোগসূত্র?
|আরো খবর
চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটে দীর্ঘদিন ধরে বোগদাদ সার্ভিসের আধিপত্য ছিল। পরবর্তীতে কথিত বৃদ্ধাশ্রমে সহযোগিতার নামে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের মন গলিয়ে আইদি পরিবহন যুক্ত হয়ে যাত্রীসেবার মানোন্নয়নের প্রত্যাশা তৈরি করেছিলো। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযোগ ও সরেজমিন অনুসন্ধানের চিত্র যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রতিযোগিতা যাত্রীসেবার উন্নতি ঘটানোর পরিবর্তে উল্টো যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। দু পরিবহনের বাসে যাতায়াতকারী মানুষ যেন সেবা গ্রহণকারী নাগরিক নন, বরং একটি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কাছে জিম্মি যাত্রী। এক্ষেত্রে বাস মালিক সমিতিসহ সড়ক-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংগঠনের অর্থবহ নীরবতা যাত্রীদের ভোগান্তির প্রতি চরম পরিহাসের নামান্তর হয়ে গেছে। এসব সংগঠনের নেতাদের ভাবসাব এমন : যাত্রীরা যা ইচ্ছা তা-ই বলুক, আমরা নিজেরা ম্যানেজড, আর যাদের ম্যানেজ করা দরকার, তাদেরকে তো ম্যানেজ করেই চলছি।
চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটের সবচেয়ে বড় সমস্যা সময়। ৭০ কিলোমিটারের পথ চার ঘণ্টা পর্যন্ত লাগা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি বাস নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর পরিবর্তে পথে পথে যাত্রী তোলার জন্য থামবে, অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয় করবে, আবার সেই বিলম্বের দায়ও যাত্রীকে বহন করতে হবে—এ ব্যবস্থা পরিবহনসেবা নয়, এটি যাত্রী হয়রানি। বিশেষ করে হাজীগঞ্জ বাজার, শাহরাস্তির দোয়াভাঙ্গা এবং লাকসামের মুদাফফরগঞ্জ যেন দীর্ঘদিনের যানজটের স্থায়ী ফাঁদে পরিণত হয়েছে। অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত বাজার, থ্রি-হুইলার স্ট্যান্ড ও এলোমেলো যান চলাচল এসব এলাকার স্বাভাবিক যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব অনিয়ম কি একদিনে তৈরি হয়েছে? যদি বছরের পর বছর মহাসড়কের ওপর অব্যবস্থাপনা চলতে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায় কোথায়?
আরও উদ্বেগের বিষয় অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন। ৫০ আসনের বাসে ১০-১৫ জন অতিরিক্ত যাত্রী দাঁড়িয়ে যাতায়াত করছেন—এমন অভিযোগ কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। একটি চলন্ত বাসে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী মানেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ানো। সেখানে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের কথা বিবেচনা না করে যদি কেবল বাড়তি আয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাহলে সেটি নিছক অব্যবস্থাপনা নয়; এটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চালক-হেলপারদের দুর্ব্যবহার। একজন যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া বা অতিরিক্ত যাত্রী তোলার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাকে অপমানিত হতে হবে—এমন সংস্কৃতি কোনো সভ্য গণপরিবহন ব্যবস্থায় থাকতে পারে না। যাত্রী টাকা দিয়ে সেবা কিনছেন। ফলে তার জানার, প্রশ্ন করার এবং নিরাপদ যাতায়াতের অধিকার রয়েছে।
ভাড়ার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার অভাব গুরুতর অভিযোগ। বাসের ভেতরে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান না থাকলে যাত্রী কীভাবে বুঝবেন তিনি সঠিক ভাড়া দিচ্ছেন কি না? ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা পরিবহন মালিকের দায়িত্ব এবং তা তদারক করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এই দুই জায়গায় ব্যর্থতা থাকলে অনিয়মই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক্ষেত্রে নীরব থাকাটা যাত্রীদের নিকট প্রশ্নবোধক হয়েই থাকছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় অবশ্যই নিরাপত্তা। গত ২৭ আগস্টের ঘটনাটি এ ক্ষেত্রে একটি বড় সতর্কবার্তা। অতিরিক্ত যাত্রী তোলা নিয়ে প্রতিবাদের পর চালকের ক্ষুব্ধ হয়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগ সত্য হলে, সেটি শুধু যাত্রী হয়রানি নয়—এটি সরাসরি জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। একটি বাসে থাকা কয়েক ডজন মানুষের জীবন কোনো চালক বা পরিবহনকর্মীর ব্যক্তিগত রাগ-ক্ষোভের বিষয় হতে পারে না। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—কোনো একটি পরিবহনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই পুরো প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগগুলো যদি ধারাবাহিক, বহুমাত্রিক এবং বহু যাত্রীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরব থাকারও সুযোগ নেই। তদন্ত, তদারকি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা—তিনটিই সমান জরুরি।
প্রশ্ন তাই বোগদাদ কিংবা আইদি একা নয়; প্রশ্ন পুরো পরিবহন ব্যবস্থার। দুটি কোম্পানি যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক রুটের প্রায় পুরো যাত্রী পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেখানে যাত্রীদের কার্যকর বিকল্প না থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একচেটিয়া প্রভাব তৈরির আশঙ্কা থাকে। প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি না হলে সেবার মান উন্নত হওয়ার চাপও কমে যায়। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন কঠোর ও নিয়মিত নজরদারি। বাসকে নির্ধারিত কাউন্টার ও টিকিট ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। অনুমোদিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধ করতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। বাসের ভাড়ার তালিকা স্পষ্টভাবে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
একই সঙ্গে যানজটের স্থায়ী কারণগুলোও দূর করতে হবে। হাজীগঞ্জ, দোয়াভাঙ্গা ও মুদাফফরগঞ্জে অবৈধ পার্কিং, অবৈধ স্ট্যান্ড ও মহাসড়ক দখলের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে ছবি তোলা নয়, অভিযান-পরবর্তী পরিস্থিতিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অন্যথায় কয়েক দিন পর আবার একই অবস্থা ফিরে আসবে।
প্রয়োজনে এই রুটে নতুন ও সুশৃঙ্খল পরিবহন সংস্থাকে সুযোগ দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যাত্রীর হাতে বিকল্প থাকলে কোনো পরিবহনই সহজে যাত্রীকে জিম্মি করে রাখতে পারে না। তবে নতুন পরিবহন নামানোর পাশাপাশি তাদেরও একই কঠোর নিয়মের আওতায় আনতে হবে। সমস্যার সমাধান যেন ‘এক সিন্ডিকেটের বদলে আরেক সিন্ডিকেট’ না হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা। একজন চালকের হাতে থাকে কয়েক ডজন মানুষের জীবন। একজন হেলপারের আচরণ একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি তৈরি বা নষ্ট করতে পারে। তাই চালক ও পরিবহনকর্মীদের প্রশিক্ষণ, আচরণবিধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে শুধু সামান্য জরিমানা নয়, প্রয়োজনে রুট পারমিট, চালকের লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে—অবশ্যই আইন ও যথাযথ তদন্তের ভিত্তিতে।
চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়ক শুধু দুটি জেলার মধ্যে যাতায়াতের পথ নয়; এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। একজন রোগীর চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে দেরি হওয়া, একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষাকেন্দ্রে সময়মতো পৌঁছাতে না পারা কিংবা একজন চাকরিজীবীর কর্মস্থলে বিলম্বে পৌঁছানো—এসবকে নিছক ‘যাত্রাপথের ভোগান্তি’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ৭০ কিলোমিটারের একটি পথ যদি চার ঘণ্টার নরকযন্ত্রণায় পরিণত হয়, তবে সমস্যাটি শুধু বাসের নয়; এটি আমাদের পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিরও প্রতিচ্ছবি। তাই এখন সময় এসেছে সরাসরি প্রশ্ন করার—চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটের হাজার হাজার বাসযাত্রী কি বোগদাদ ও আইদি পরিবহনের অনিয়মের কাছে এভাবেই জিম্মি হয়ে থাকবেন? উত্তর অবশ্যই ‘না’ হতে হবে। কারণ গণপরিবহন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য নয়। এটি জনগণের সেবা। আর জনগণের সেবায় অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও জীবনঝুঁকির কোনো স্থান থাকতে পারে না। সংশ্লিষ্ট দুই জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ, পুলিশ প্রশাসন এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
যাত্রীদের দাবি খুব বেশি কিছু নয়—সময়মতো বাস ছাড়বে, নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হবে, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হবে না, চালক-হেলপার শালীন আচরণ করবেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকবে। ৭০ কিলোমিটারের এই পথকে আর জিম্মিদশার প্রতীক হতে দেওয়া যায় না। চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটে নিরাপদ, নিয়মতান্ত্রিক, প্রতিযোগিতামূলক ও যাত্রীবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।







