মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৭

ডিজিটাল সন্ত্রাসের নতুন রূপ: চট্টগ্রামে প্রকাশ্য তাণ্ডব, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের সামনে এক নির্মম প্রশ্ন!

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
ডিজিটাল সন্ত্রাসের নতুন রূপ: চট্টগ্রামে প্রকাশ্য তাণ্ডব, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের সামনে এক নির্মম প্রশ্ন!

বাংলাদেশের অপরাধ জগত যেন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। বন্দুকের নল আর রক্তাক্ত গলিপথের সেই পুরোনো সন্ত্রাস আজ প্রযুক্তির আবরণে আরও সংগঠিত, আরও দূরপাল্লার এবং আরও বিপজ্জনক। এখন আর সন্ত্রাসের নির্দেশনা আসে না কেবল অন্ধকার কোনো আস্তানা থেকে; অভিযোগ অনুযায়ী, তা ভেসে আসে সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশের মাটি থেকে, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ-এর আড়ালে। আর মাঠে নামে স্থানীয় বাহিনী—যারা কয়েক মিনিটেই কোটি টাকার বিনিয়োগকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে সক্ষম।

ভিডিও ক্যাপশন :ডিজিটাল সন্ত্রাসের নতুন রূপ(সংগৃহীত)

৩ জুলাই ২০২৬-এর চকবাজারের ঘটনাটি নিছক একটি ডাকাতি বা ভাঙচুরের মামলা নয়। এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়কে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানানোর এক দুঃসাহসী ঘোষণা।

দিনের আলোয়, মানুষের ভিড়ে, নগরীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায়, সিসিটিভির ক্যামেরার সামনেই অস্ত্রধারীরা একটি প্রতিষ্ঠানে ঢুকে তাণ্ডব চালায়, নগদ অর্থ লুট করে এবং নির্বিঘ্নে চলে যায়। প্রশ্ন হলো—অপরাধীরা কি শুধু অস্ত্রের শক্তিতে এতটা সাহসী হয়েছিল, নাকি তারা বিশ্বাস করেছিল যে রাষ্ট্রের প্রতিরোধ তাদের স্পর্শ করতে পারবে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার আগে বিদেশি নম্বর থেকে কোটি টাকার চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। তদন্তে যে তথ্য উঠে আসছে, তা যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি কেবল চাঁদাবাজি নয়; এটি হবে ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম—যেখানে বিদেশে অবস্থানকারী অপরাধচক্র দেশের অর্থনীতিকে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

এটি শুধু আইন-শৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বর প্রতিও এক নীরব আঘাত।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই হামলার লক্ষ্য ছিল কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতাও নয়—লক্ষ্য ছিল একটি বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ ভয় সৃষ্টি করে অর্থ আদায়ের যে অর্থনীতি, সেটিই এখন সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের মূল ব্যবসায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির স্পন্দিত হৃদপিণ্ড। সেই শহরের উদ্যোক্তারা যদি নিরাপত্তার পরিবর্তে আতঙ্ককে ব্যবসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হন, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।

রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা কেবল আদালতের রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না; প্রতিষ্ঠিত হয় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করার সক্ষমতায়।

আজ প্রশ্ন উঠেছে—আমাদের গোয়েন্দা কাঠামো কতটা প্রস্তুত? প্রযুক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতা কতটা আধুনিক? কেন বারবার একই ধরনের চাঁদাবাজি, হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ সামনে আসার পরও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি?

রাষ্ট্র যদি কেবল ঘটনার পর তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অপরাধীরা প্রতিবারই এক ধাপ এগিয়ে থাকবে।

এখন সময় এসেছে 'জিরো টলারেন্স' নীতিকে শুধু বক্তৃতার ভাষা নয়, বাস্তব রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার। বিদেশে অবস্থানকারী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে; দেশের অভ্যন্তরে তাদের অর্থের উৎস, সহযোগী নেটওয়ার্ক ও আশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কারণ ইতিহাস বলে—যখন চাঁদাবাজরা ব্যবসার নিয়ম নির্ধারণ করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

চকবাজারের এই হামলা একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ নয়; এটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার বিরুদ্ধে ছুড়ে দেওয়া এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।

এ চ্যালেঞ্জের জবাব যদি রাষ্ট্র দ্রুত, কঠোর ও দৃশ্যমানভাবে দিতে ব্যর্থ হয়, তবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় সংকট হবে শুধু অপরাধ বৃদ্ধি নয়—রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার ক্ষয়। আর কোনো রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর সতর্কসংকেত আর হতে পারে না।

ডিসিকে/ এমজেডএইচ

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়