শুক্রবার, ০৮ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১৯:৪৫

আমার ছাতা কৈ

মোঃ তাইয়্যেব হোসাইন
আমার ছাতা কৈ

শৈশবের স্মৃতিগুলো জীবনের ভাণ্ডারে সবচেয়ে মূল্যবান রত্নের মতো। সময় যতই পেরিয়ে যাক, সেই মুহূর্তগুলো মানুষের মনে রঙিন ক্যানভাসের মতো আঁকা থাকে। আমার জীবনেও এমন একটি স্মৃতি আছে, যা আজও মনকে ভিজিয়ে রাখে বৃষ্টিভেজা কাদার মতো। সেই স্মৃতির কেন্দ্রবিন্দু হলো— বাঁশিওয়ালা একটি লাল রঙের ছোট্ট ছাতা।

গ্রামের সাধারণ ছেলে আমি। প্রাইভেট স্কুল থেকে হঠাৎ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া—আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শীতের কুয়াশা ভেদ করে প্রতিদিন কাঁচা রাস্তায় হেঁটে স্কুলে যেতাম। বাড়ি থেকে স্কুলটা ছিল বেশ দূরে, কিন্তু গ্রামের ছেলেমেয়েদের কাছে হাঁটাপথ কোনো কষ্ট ছিল না, বরং ছিল একরকমের আনন্দ। কত রকম কথা, খেলার পরিকল্পনা সাজাতে সাজাতে স্কুলের কাছে পৌঁছে যেতাম। কুয়াশায় ঢাকা গ্রামের সকাল, রাস্তার দুই পাশে সবুজ ধানক্ষেত আর ভিজা দূর্বা ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে মৃদু বাতাস গায়ে মেখে স্কুলে যাওয়ার আনন্দ—এসব আজও মনে পড়ে স্পষ্ট ছবির মতো।

আমার মা খুবই সহজ-সরল মানুষ। গ্রামের এই স্কুলে তাঁর অনেক পরিচিত শিক্ষক-শিক্ষিকা ছিলেন। বিশেষ করে, আমাদের নতুন বাড়ির কাছেই একজন শিক্ষক ছিলেন। তাই আমার পড়াশোনার খোঁজখবর মা সহজেই উনার কাছ থেকে জানতে পারতেন।

শীত কেটে গেল কয়েক মাস পরেই আসে বর্ষার দিন। গ্রামের কাঁচা রাস্তাগুলো তখন যেন রূপ নেয় ভয়ঙ্কর কাদার মাঠে। হাঁটতে গেলে পা ধসে যায়, কখনো স্যান্ডেল খুলে আটকে যায় কাদার ভেতর। বৃষ্টি মানেই স্কুলে যাওয়ার কষ্ট। শরীর ভিজে যেত, প্রায়ই ঠান্ডা-জ্বর আসত।

প্রতিনিয়ত বৃষ্টি থেকে ভিজে যাওয়ার কারণে মা তখন আমাকে একটি ছাতা কিনে দিলেন। সেই ছাতা যেন আমার কাছে শুধু বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষাকারী ছিল না, বরং জীবনের এক বড় আনন্দের উৎসও বটে।

একদিন মা আমাকে নিয়ে গেলেন বাজারে। দোকানে অনেক ছাতা সাজানো ছিল। আমি বেছে নিলাম একটি লাল রঙের ছোট্ট ছাতা। ছাতার হাতলে ছিল ফিতা দিয়ে বাঁধা বাঁশি। ছাতাটি আকারে বড় না হলেও, আমার কাছে সেটি ছিল একেবারে পৃথিবীর সেরা জিনিস। মা যখন টাকা দিয়ে ছাতাটি কিনলেন, মনে হলো আমি যেন এক অমূল্য ধন পেয়েছি। ছাতাটিতে আলপনা আঁকা ছিল , বাঁশি ছিল ছাতাটির সাথে বোনাস পাওয়ার মত আনন্দ। বাজার থেকে ফেরার পথে বেশ কয়েকবার বাঁশিতে ফুঁ দিলাম অদ্ভুত আনন্দ উপভোগ করলাম।

প্রথম দিন যখন ছাতাটি নিয়ে স্কুলে গেলাম, সকালবেলা আকাশ ছিল মেঘলা আবার রোদ্দুর ঝলমল করছিল। তবুও আনন্দে ছাতাটি মাথার উপর ধরলাম। সেই ছাতা কেবল বৃষ্টির ছাতা নয়, আমার কাছে এটি ছিল এক ধরনের খেলনা, এক টুকরো গর্ব করার জায়গা,সবাইকে দেখাইতাম বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে । অনেকেই ছাতার দাম জিজ্ঞাসা করতো দাম আমার জানা ছিল না, বলতাম অনেক টাকার ছাতা।

কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। প্রথম দিনেই ক্লাসে রেখে এসেছিলাম ছাতাটি। স্কুল শেষে যখন ফেরার সময় হলো, ছাতাটি আর খুঁজে পেলাম না। কত খোঁজাখুঁজি করলাম, বন্ধুদের জিজ্ঞেস করলাম, এমনকি পরের দিনও খুঁজলাম—কিন্তু লাল ছাতাটি যেন হাওয়া হয়ে গেল।

জীবনে প্রথমবার কোনো প্রিয় জিনিস হারানোর বেদনা তখনই আমি অনুভব করলাম। মনটা ভীষণ ভেঙে গেল। ক্লাস রুমের সামনে বসে কান্না করছিলাম বিকাল প্রায় শেষ ওইদিন আমি সবার শেষে স্কুল থেকে বের হই । বাসায় ফিরে মা-কে বলতেই তিনি খুব রাগ করলেন। বকা খেলাম প্রচুর। কিন্তু মনের কষ্টের সাথে সেই বকাঝকার কষ্ট মিলে যেন বুকটাকে আরও ভারী করে তুলল।

এরপর আর কখনো মা আমাকে নতুন ছাতা কিনে দিলেন না। পাঁচ বছর ওই স্কুলে পড়াশোনা করেছি, বৃষ্টিতে ভিজে অনেক বর্ষা কেটেছে, কিন্তু আর ছাতা হাতে নেওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। কাদা মাড়িয়ে, বৃষ্টিভেজা শরীর নিয়ে, কখনো জ্বর-সর্দি নিয়ে স্কুলে গেছি। তবু বাঁশিওয়ালা লাল ছাতার অভাবটা সবসময় শূন্য অনুভূত হয়েছে।

আজ এত বছর পরও যখন বৃষ্টির দিনে ছাতা হাতে নিয়ে ছোট্ট ছেলে মেয়েরা হেঁটে যায়, তখন মনে পড়ে যায় সেই হারানো বাঁশিওয়াল লাল ছাতার কথা। এটি ছিল আমার জীবনের প্রথম ছাতা, আর সেই কারণেই সেটির মূল্য ছিল অপরিসীম। কখনো মনে হয়, যদি কোনোভাবে সেই ছাতাটি ফিরে পেতাম!

সেই ছাতাটি হয়তো আজ নেই, হয়তো বহু আগেই কোথাও হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে সেটি আজও জ্বলজ্বল করছে। মন চায় আজও ওই ক্লাসরুমে গিয়ে ছাতাটা খুঁজি। এক টুকরো লাল রঙ যেন এখনও মনের গভীরে রঙ ছড়িয়ে দেয়। খুব ইচ্ছে করে ছাতাটা হাতে নিয়ে বাঁশিতে একটু ফুঁ দেই।

এই ছোট্ট স্মৃতি আমাকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। তা হলো—জীবনে যা-ই পাই, তাকে মূল্য দিতে হবে। কারণ একবার হারালে হয়তো আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যায় না।

আজকের দিনে হয়তো আমরা সহজেই অনেক কিছু কিনতে পারি। একটি ছাতা হারালে আবার আরেকটি কিনে নেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের শৈশবের দিনে তা ছিল না। একটি ছাতা মানেই ছিল আনন্দ, নিরাপত্তা, এবং এক টুকরো গর্ব। তাই সেই লাল ছাতাটি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতির অংশ হয়ে রয়ে গেছে।

শৈশব আমাদের জীবনের অমূল্য সম্পদ। আমরা যত বড় হই, যত আধুনিক যন্ত্রে ঘেরা জীবন কাটাই না কেন, সেই শৈশবের ছোট ছোট স্মৃতিগুলোই আমাদের সত্যিকার আনন্দের উৎস।

আজও মনে পড়ে, যদি কখনো আবার সেই লাল ছাতাটি হাতে নিতে পারতাম, বন্ধুদের সামনে গিয়ে বাঁশিতে ফু দিতে পারতাম। হয়তো শৈশবের এক টুকরো সুখকে আবার ছুঁয়ে দেখতে পারতাম। কিন্তু তা আর সম্ভব নয়। শুধু সম্ভব, হৃদয়ের গভীরে তাকে লালন করে রাখা—আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি হিসেবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়