রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬, ০০:৪৮

হারানো স্বপ্নের খোঁজে

উজ্জ্বল হোসাইন
হারানো স্বপ্নের খোঁজে

জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে অনেক সময় আমরা নিজের অজান্তেই হারিয়ে ফেলি আমাদের স্বপ্নগুলো। বাস্তবতার চাপ, দায়িত্বের বোঝা আর সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতে ভেসে গিয়ে একসময় মনে হয়Ñযা চেয়েছিলাম, তা আর পাওয়া হবে না। ঠিক তখনই জীবনে এসে উপস্থিত হয় ভালোবাসাÑনিঃশব্দে, অপ্রত্যাশিতভাবে, কিন্তু গভীর এক শক্তি নিয়ে। হারানো স্বপ্নগুলোকে আবার নতুন করে খুঁজে পাওয়ার সাহস দেয় ভালোবাসা। এটি শুধু দুইটি মানুষের সম্পর্ক নয়, বরং একটি আশ্রয়, যেখানে ক্লান্ত মন শান্তি খুঁজে পায়। জীবনের ব্যর্থতা, হতাশা আর অপূর্ণতার মাঝেও ভালোবাসা আমাদের শেখায় সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি, এখনো অনেক কিছু বাকি। যে স্বপ্নগুলো একসময় ভেঙে গিয়েছিল, ভালোবাসা সেগুলোকে নতুন করে গড়ে তোলার শক্তি দেয়। একজন মানুষের আন্তরিক উপস্থিতি, তার বিশ্বাস আর সমর্থন এসবই জীবনের অন্ধকার পথকে আলোকিত করে। তখন মনে হয়, হারিয়ে যাওয়া পথও আবার খুঁজে পাওয়া সম্ভব। ভালোবাসা আমাদের বদলে দেয়। এটি আমাদের দায়িত্বশীল করে, সচেতন করে, আর জীবনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। যে মানুষটি পাশে থাকে, সে শুও একজন সঙ্গী নয়Ñসে আমাদের স্বপ্নের সহযাত্রী। হারানো স্বপ্নের খেঁাজে ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় প্রেরণা। এটি আমাদের শিখায়Ñস্বপ্ন কখনো পুরোপুরি হারায় না, শুধু সময়ের অপেক্ষায় থাকে। আর যখন ভালোবাসা সেই স্বপ্নকে স্পর্শ করে, তখন জীবন আবার নতুন করে শুরু হয়, নতুন আশা ও সম্ভাবনার আলো নিয়ে।

একদিন মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। কোনো শব্দ ছিল না, কোনো দুঃস্বপ্নও না তবুও যেন বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা। ঘরের ফ্যান ঘুরছে ধীরে, বাইরে নিস্তব্ধতা। কিন্তু আমার ভেতরে যেন ঝড় উঠেছে। চোখ মেলে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হঠাৎ ভেসে উঠলো সেই পরিচিত মুখ আমার বন্ধুর। কয়েকদিন আগেই সে বিয়ে করেছে। সেদিন খুব স্বাভাবিকভাবে বিষয়টা নিয়েছিলাম। হাসি-ঠাট্টা করেছি, খেয়েছি-দেয়েছি, অনুষ্ঠান শেষ করে চলে এসেছি। কিন্তু আজ রাতে কেন যেন মনে হলো সে জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে পা দিয়েছে, আর আমি এখনো কোথাও আটকে আছি। মনে প্রশ্ন এলো আমি কেনো বিয়ে করছি না?

এই প্রশ্নটা নতুন নয়। পরিবার থেকে বহুদিন ধরেই চাপ দিচ্ছিল। খালাম্মা, আত্মীয়-স্বজন সবাই বলতো, এখন তো সবকিছু মোটামুটি ঠিক আছে, এবার সংসার করো। কিন্তু আমি সবসময় এড়িয়ে গেছি। কখনো বলেছি সময় হয়নি, কখনো বলেছি দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত না। কিন্তু আজ রাতে মনে হলো সময় কি সত্যিই হয়নি, নাকি আমি নিজেই সময়কে এড়িয়ে গেছি?

চোখ বন্ধ করতেই জীবনের অনেক ছবি ভেসে উঠলো। কলেজ জীবন, সাংগঠনিক কাজ, ব্যস্ততা, দৌড়ঝঁাপ সবকিছু যেন সিনেমার মতো সামনে দিয়ে চলে গেলো। আমি সবসময় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি, যেন নিজের ভেতরের শূন্যতাকে ঢেকে রাখতে পারি। হঠাৎ মনে হলো আমার জীবনের অনেক স্বপ্নই তো হারিয়ে গেছে।

ছোটবেলায় কত স্বপ্ন দেখতাম! একটা সুন্দর সংসার হবে, পাশে থাকবে একজন আপন মানুষ, যার সাথে দিনের শেষে সব কথা ভাগ করে নেওয়া যাবে। কিন্তু কবে যে সেই স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছে, বুঝতেই পারিনি।

আজ মনে হচ্ছে যা কিছু হারিয়েছে, তা হয়তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই একটি স্বপ্ন একটা নিজের সংসার, নিজের মানুষ এটা তো এখনো আমার হাতে আছে।

এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিলো। যেন কেউ ভিতর থেকে প্রশ্ন করছে তুমি কি সত্যিই প্রস্তুত?

আমি উঠে বসে পড়লাম। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম। দূরের আলো, ফঁাকা রাস্তা সবকিছু যেন আমার নিঃসঙ্গতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

মনে হলো আমি আসলে খুব একা।

এত মানুষ আমার চারপাশে খালাম্মার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী তবুও নিজের একজন মানুষ নেই। যে শুধু আমার হবে, যার কাছে আমি নিজের সব দুর্বলতা খুলে বলতে পারবো।

কিন্তু তখনই আরেকটা প্রশ্ন মাথায় এলো আমি সেই মানুষটাকে কোথায় পাবো?

ছোটবেলার সেই দিনগুলো মনে পড়লো। আমাদের পাড়ায় একসাথে বড় হওয়া, স্কুলে যাওয়া, বিকেলে খেলাধুলা সেই সময়ের কিছু মুখ আজও মনে গেঁথে আছে। তাদের মধ্যে একজন ছিল খুব পরিচিত, খুব কাছের। নামটা আজও মনে আছে, কিন্তু এতদিন পর সেই নামটা যেন দূরের কোনো স্মৃতি হয়ে গেছে।

সে ছিল একদম সহজ-সরল মেয়ে। খুব বেশি কথা বলতো না, কিন্তু চোখে ছিল এক ধরনের শান্তি। আমরা একসাথে পড়তাম, মাঝে মাঝে গল্প করতাম। তখন বুঝিনি, কিন্তু এখন মনে হয় সেই সময়টাতেই হয়তো একটা অদ্ভুত টান ছিল। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। স্কুল শেষ হলো, সবাই যার যার পথে চলে গেলো। কেউ শহরে, কেউ অন্য কোথাও। আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নিজের জীবনে।

আজ এত বছর পর সেই মুখটা কেনো মনে পড়ছে? হয়তো কারণ, আমি খুঁজছি এমন একজন মানুষকে যার সাথে কোনো অভিনয় করতে হবে না, যার সাথে সম্পর্কটা হবে সহজ, স্বাভাবিক।

কিন্তু বাস্তবতা তো এত সহজ নয়। এখনকার সময়ে সম্পর্ক মানে অনেক হিসাব-নিকাশ। কে কী করে, কত আয় করে, ভবিষ্যৎ কী সবকিছু বিবেচনা করা হয়।

আমি নিজের দিকে তাকালাম। আমার কি সেই স্থিরতা আছে? আমি কি কাউকে একটা নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিতে পারবো?

এই প্রশ্নগুলো আমাকে আবার দ্বিধায় ফেলে দিলো।

কিন্তু আবার মনে হলো জীবনে কি সবকিছু নিশ্চিত করে তারপরই সিদ্ধান্ত নিতে হয়? আমার বন্ধুও তো কিছু না ভেবেই বিয়ে করেছে। তবুও সে খুশি।

তাহলে আমি কেনো এত হিসাব করছি?

রাতটা আর ঘুম হলো না। ভোরের দিকে একটু তন্দ্রা এলো। সকালে উঠে মনে হলোÑগত রাতের সব ভাবনা কি শুধুই এক মুহূর্তের আবেগ ছিল?

কিন্তু না, ভেতরের অনুভূতিটা এখনো রয়ে গেছে।

সেদিন বিকেলে একা হঁাটতে বের হলাম। শহরের রাস্তাগুলো যেন নতুন করে দেখতে লাগলাম। প্রতিটা মোড়ে, প্রতিটা মুখে যেন নতুন অর্থ খুঁজে পাচ্ছি।

একটা পার্কের বেঞ্চে বসে ছিলাম। সামনে কয়েকটা ছোট বাচ্চা খেলছে। তাদের হাসি দেখে মনে হলো জীবন আসলে এত জটিল না, আমরা নিজেরাই তাকে জটিল করে তুলি।

হঠাৎ মনে হলো আমি কি সত্যিই কাউকে খুঁজছি, নাকি নিজের ভেতরের শূন্যতাকে পূরণ করতে চাইছি?

এই প্রশ্নটা আমাকে থামিয়ে দিলো।

আমি বুঝতে পারলাম বিয়ে শুধু একটা সম্পর্ক নয়, এটা একটা দায়িত্ব, একটা প্রতিশ্রুতি। শুধু নিজের একাকীত্ব দূর করার জন্য কাউকে জীবনে আনা ঠিক হবে না।

আমাকে আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

কিন্তু তবুও সেই ছোটবেলার মেয়েটার কথা মাথা থেকে যাচ্ছে না। হঠাৎ একটা ইচ্ছা হলো তার খেঁাজ নেওয়ার। অনেক কষ্টে তার একটা পুরোনো পরিচিতির মাধ্যমে খবর পেলাম সে এখন অন্য শহরে থাকে। পড়াশোনা শেষ করে একটা স্কুলে শিক্ষকতা করছে। খবরটা শুনে মনে কেমন যেন হলো। ভালো লাগলো, আবার একটু আফসোসও হলো। যদি আগে কখনো যোগাযোগ রাখতাম! তবুও মনে হলো জীবন এখনো শেষ হয়ে যায়নি। যদি ইচ্ছা থাকে, নতুন করে শুরু করা যায়। কিন্তু এবার আমি তাড়াহুড়ো করতে চাই না। আমি বুঝে শুনে, নিজেকে তৈরি করে এগোতে চাই।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম প্রথমে নিজের জীবনটাকে একটু গুছিয়ে নেবো। ব্যবসাকে আরও শক্ত করবো, নিজের অবস্থান তৈরি করবো। তারপর যদি মনে হয়, আমি প্রস্তুত তখনই নতুন কোনো সম্পর্কের দিকে এগোবো।

কারণ এবার আমি কোনো খামখেয়ালিপনায় নয়, সচেতন সিদ্ধান্তে জীবন গড়তে চাই।

রাতের সেই হঠাৎ জেগে ওঠা মুহূর্তটা আমার জীবনের একটা মোড় ঘুরিয়ে দিলো।

আমি বুঝলাম স্বপ্ন হারিয়ে যায় না, আমরা তাকে হারিয়ে ফেলি। আবার চাইলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়।

আজ আমি আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। হয়তো সেই ছোটবেলার পরিচিত মেয়েটা আমার জীবনে ফিরে আসবে না। হয়তো অন্য কেউ আসবে। কিন্তু এবার আমি প্রস্তুত সেই মানুষটাকে গ্রহণ করার জন্য, তাকে নিজের জীবনের অংশ করে নেওয়ার জন্য। কারণ আমি জানি জীবন একা চলার জন্য নয়। আর ভালোবাসা সেটা কখনো পুরোনো হয় না, শুধু সময়ের অপেক্ষায় থাকে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়