প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ১০:৫১
মে দিবসের তাৎপর্য ও ইসলাম

১লা মে, ঐতিহাসিক মে দিবস। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রমিক শ্রেণির এক অনন্য দিন। ১৮৮৬ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের ‘হে মার্কেটে’ দৈনিক ৮ (আট) ঘন্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট ডেকেছিল শ্রমিকেরা। শাসক ও মালিকগোষ্ঠীর হিংস আক্রমণে সভ্যতার নির্মাতা শ্রমিকের তাজা রক্ত ঝরছিল সেদিন। অধিকার আদায়ের জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন শ্রমিকেরা। ১৮৮৮ সালের ১লা মে থেকে প্রতি বছর চারদিনের বেদনাবহ ও গৌরবময় ঘটনাবলি স্মরণে ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার’ মিছিল-সমাবেশের মধ্য দিয়ে এই দিনটিকে মে দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই দিনটি অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে এই দিনটিকে ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়। কেবল শ্রমিকরাই যে এদিনটি পালন করছে তা নয়, শাব্দিক অর্থে যারা শ্রমিক নন, তারাও এখন মে দিবস পালন করেন। কারণ দিনে-দিনে প্রমাণিত হয়েছে, সভ্যতার বিনির্মাণে শ্রমিকদের ভূমিকা অনন্য। শ্রমিকদের শ্রম ছাড়া সভ্যতা নির্মাণ সম্ভব নয়। কিন্তু শুরুতে শ্রমিকদের ন্যায়সংগত দাবি তাদের নিজেদের লড়াই করেই আদায় করতে হয়েছে। অন্যরা মালিকদের শোষণ সমর্থন করে তাদের দাবির বিরোধিতাই করেছিল। ১৮৮৬ সালে হে মার্কেটে শ্রমিকদের রক্তদান বৃথা যায়নি। আজ শ্রমিকদের রোজ আট ঘন্টা কর্মের দাবি কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই স্বীকৃত হয়নি, এটি স্বীকৃত হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে সারা বিশ্বে। এখন যে কোন দেশে আট ঘন্টার বেশি শ্রমদান ও শ্রম আদায় নিষিদ্ধ। এছাড়াও শ্রমিক শ্রেণির বহু দাবি আজ অধিকার হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। ১৮৮৬ সালের মে দিবসের ইতিহাস ও পূর্বাপর কিছু ঘটনা নিম্নরুপ-
ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ১৮০৬ সালে মামলা হয়েছিল ফিলাডেলফিয়ার ধর্মঘটী জুতা শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে। এই মামলায় ফঁাস হলো যে, কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের ঊনিশ থেকে বিশ ঘন্টা পর্যন্ত খাটায়! তখনকার প্রচলিত অলিখিত নিয়মই ছিলো দিনের কাজের ঘন্টা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এর প্রতিবাদে ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকের ফুঁসে উঠে আমেরিকার শ্রমিকরা। ১৮২০ সালে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে ছোট-ছোট স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলো একত্র করে একটা ফেডারেশন গঠনের চেষ্টা করা হয়। শ্রমিকরা ১৮৪০ সাল পর্যন্ত কাজের ঘন্টা কমানোর জন্য একের পর এক ধর্মঘট করে। ১৮২৭ সালের ফিলাডেলফিয়ার গৃহনির্মাণ শ্রমিকরা দৈনিক দশ ঘন্টা কর্মঘন্টার দাবিতে ধর্মঘট করেছিলেন। ১৮৩৪ সালে নিউইয়র্কের রুটি শ্রমিকরা ধর্মঘট করেন; যাদেরকে দৈনিক গড়ে আঠারো থেকে বিশ ঘন্টা কাজ করতে হতো!
১৮৩৭ সালে অর্থনৈতিক মন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার সরকারি কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের দৈনিক দশ ঘন্টার কর্মঘন্টা বেঁধে দেন। পরবতর্ী বছরগুলোতে বেসরকারি শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও এই আইন কার্যকর করার দাবি উঠতে থাকে। দৈনিক দশ ঘন্টার কর্মের এ দাবি খুব দ্রুত আন্দোলনের আকার ধারণ করে। দৈনিক দশ ঘন্টা কাজের সময়, শ্রমিকদের সন্তানদের বিনামূল্যে শিক্ষা ব্যবস্থা, দেনা শোধ করতে না পারলে শ্রমিকদের জেলে পাঠানোর আইনের বিলুপ্তি, অপ্রাপ্তবয়সী ও মহিলা শ্রমিকদের কাজের ও মজুরির সুযোগ-সুবিধা প্রদান প্রভৃতি দাবিতে শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হতে থাকে। ১৮৫০ সালের দিকে সর্বত্র শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ার প্রবল উদ্যোগ দেখা যায়; এই সময় থেকে শ্রমিকরা দশ ঘন্টার জায়গায় আট ঘন্টা রোজের দাবি তোলেন এবং আমেরিকাসহ সকল উদীয়মান পঁুজিবাদী দেশে আট ঘন্টা রোজের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
১৮৭০-এর দিকে আমেরিকা জুড়ে শুরু হয় তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও বাণিজ্যিক মন্দা। মন্দার অজুহাতে মালিকরা মজুরি কমানো, শ্রমিক ছঁাটাই, শ্রম ঘন্টা বাড়ানো প্রভৃতি নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে; শ্রমিকরাও এইসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করে।
এভাবে আন্দোলন, জীবন বিসর্জন, বিভিন্ন সময় শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের জেল ও ফঁাসিতে ঝুলানোর এক পর্যায়ে ১৮৮৬ সালের ১লা মে রোজ শনিবার সমগ্র শিকাগো শহর নিস্তব্ধ। চালু নেই কোন কল-কারখানা। মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে ধর্মঘটী শ্রমিকরা। মিছিল যাবে মিশিগান এভিনিউ হয়ে লেক ফ্রন্টের দিকে; যেখানে ছয় লাখ শ্রমিক জড়ো হয়েছে। ১১ হাজার ৫শ’ ৬২টি শ্রমিক সংগঠন অংশগ্রহণ করেছে। তালা ঝুলছে প্রায় ১৫৭২টি শিল্প প্রতিষ্ঠানে; সরকার ও মিল মালিকরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও আন্দোলন বন্ধ করতে পারছেনা। বিভিন্ন গুজব ছড়ানোর পরও শান্তিপূর্ণভাবে শ্রমিকদের প্রথম দিনের সমাবেশ শেষ হয়। পরের দিন রবিবার ছুটির দিনেও শান্তিপূর্ণভাবে শ্রমিকদের সমাবেশ শেষ হয়। কিন্তু ৩-মে সোমবার আবার কারখানায়-কারখানায় ধর্মঘট শুরু হলে সরকার ও মালিকপক্ষ তা নস্যাৎ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের উপর ঝাড়িয়ে পড়ে পুলিশ; ঘঠনাস্থলেই নিহত হয় ৬জন শ্রমিক এবং আহত হলো অগণিত শ্রমিক। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদে শিকাগোর হে মার্কেটে প্রতিবাদ সভা ডাকা হলো ৪ঠা মে। গত দিনের শ্রমিক হত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অভূতপূর্ব জনসমাবেশ ঘটলো। ঘাবড়ে গেল মালিক পক্ষ। শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ প্রায় শেষের দিকে; যখন শেষ বক্তা ফিল্ডেন উঠেছেন বক্তৃতা দিতে রাত প্রায় ১০ টার দিকে; তখন পুলিশের বড় কর্মকর্তা নির্দেশ দিলেন সমাবেশ ভেঙ্গে দিতে। পুলিশের সাথে শ্রমিক নেতাদের কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সমাবেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় বোমা ফাটানো। পুলিশ শুরু করে লাঠিচার্জ ও গুলি বর্ষণ। তাৎক্ষণিকই নিহত হন সাতজন পুলিশ ও চারজন শ্রমিক। স্পাই ও ফিল্ডেনসহ অনেকেই সভাস্থলেই গ্রেফতার হন। রক্তের বন্যা বয়ে যায় শিকাগোর হে মার্কেটে।
ইসলামে শ্রমের মর্যাদা:
ইসলামে মানুষের শ্রমের মাধ্যমে উপার্জনের অধিকার পূর্ণ মাত্রায় স্বীকৃত। মানুষ তার যোগ্যতা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে যে কোন বৈধ পন্থায় আয়-উপার্জন করতে পারবে। আর ইসলামি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকরা যাতে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করতে পারে সে জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এজন্য ফরয ইবাদতের পর দ্বিতীয় ফরয হালাল উপায়ে রুজি অন্বেষণ করা। কুরআনুল কারীমে এজন্য শ্রমকে জীবিকার প্রধান উপায় বলা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “এবং মানুষের প্রাপ্য শুধু তা, যার জন্য সে চেষ্টা ও শ্রম করেছে। এই চেষ্টা ও শ্রম অবশ্যই গুরুত্ব পাবে এবং চেষ্টা ও শ্রমকারীকে অবশ্যই পূর্ণ মাত্রায় তার প্রতিফল দেয়া হবে।” (সূরা আন নাজম:৩৯-৪১) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেন, “এরপর যখন সালাত আদায় শেষ হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে, আল্লাহর অনুগ্রহ উপার্জন করবে এবং আল্লাহর বেশি বেশি যিকর করবে, তাহলে তোমরা সফল হবে।”(সূরা জুমুআ: ১০)
ইসলামে হালাল পন্থায় রিজিক অন্বেষণ করা ফরজের পর ফরজ করা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “হালাল জীবিকা উপার্জন করা ফরজের পরে একটি ফরজ।” (সহিহ বুখারী) ইসলামে শ্রমলব্ধ হালাল উপার্জনকেই সর্বোত্তম উপার্জন বলা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “দু’হাত দিয়ে উপার্জিত খাবারের চেয়ে উত্তম খাবার কেউ কোন দিন খায়নি।”(সহিহ বুখারী) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন-যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন দিয়ে তার পরিবার-পরিজনের প্রতিপালনের চেষ্টা করে সে যেন মহান আল্লাহর পথের মুজাহিদ। (ইবনে মাজাহ) ইসলামে হালাল উপার্জনের জন্য শ্রম দেয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত; যার মাধ্যমে সাওয়াব অর্জন, মর্যাদা লাভ ও গুনাহ থেকে ক্ষমা পাওয়া যায়। তাইতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “শ্রমজীবী (হালাল উপার্জনকারী) আল্লাহর বন্ধু।” (বায়হাকি)
তেমনিভাবে ইসলামি রাষ্ট্রে শ্রমজীবী ও অন্যান্য পেশার কোন লোককে কেউ বিনা পারিশ্রমিকে খাটাতে পারবে না। তাদের শ্রমের ন্যায়সংগত পারিতোষিক অবশ্যই দিতে হবে। সামর্থের বাইরে তাদের উপর কাজের বোঝা চাপানো যাবে না, তাদের আর্থিক কিংবা দৈহিক কোন ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, সর্বোপরি তাদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “শ্রমিককে গায়ের ঘাম শুকাবার আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”(সুনান ইবন মাজা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপর এক হাদীসে বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অভিযোগ উত্থাপন করবেন। তন্মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি হচ্ছে, যে ব্যক্তি কাউকে মজুর হিসেবে খাটিয়ে ও তার দ্বারা পূর্ণ কাজ আদায় করা সত্ত্বেও শ্রমিকের মজুরী দেয় না।’ (দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, পৃ.-৪৯৯) রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, “শ্রমিকের পারিশ্রমিক ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালবাহানা করা যুলুম।”(বুখারী ও মুসলিম)সাথে সাথে ইসলাম শ্রমিকের উপরও এই দায়িত্ব অর্পণ করেছে যে, সে যেন চুক্তি অনুযায়ী যথাযথভাবে কর্ম সম্পাদন করে। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “তোমরা প্রতিশ্রুতি পালন করবে, প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈপিয়ত তলব করা হবে।”(সূরা বনী ইসরাইল:৩৪) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আর শ্রমজীবী ব্যক্তি তার মনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল এবং সে এ মালের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”(সহীহ বুখারী)
ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। ইসলাম শ্রমিক-মালিকের অধিকার ও কর্তব্য ব্যক্তি, সমাজ ও বিশ্বে শতভাগ বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছে। এ কারণে সমগ্র বিশ্বের সব মানব জাতি, ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল, দেশ, কাল নির্বিশেষে যদি সত্যিকারের কর্মের ন্যায়সংগত অধিকার, মযার্দা ও স্বীকৃতি পেতে বা দিতে চায় তাহলে একান্তভাবে ফিরে আসতে হবে ইসলামের মহান আদর্শের দিকে। মানবতার মুক্তির জন্য তাই ইসলামের বিজয় অনিবার্য। তাইতো গবেষক মুহাম্মদ খালিদ বলেছেন,“ওংষধস রং রহভধপঃ রফবড়ষড়মু (নধংবফ ড়হ উরারহব জবাবষধঃরড়হ) ধধিু ড়ভ ষরভব, ঁহরাবৎংধষ রহ রঃং ধঢ়ঢ়ৎড়ধপয ধহফ বঃবৎহধষ রহ রঃং ধঢ়ঢ়ষরপধঃরড়হ. ইবরহম ঁহরাবৎংধষ রহ রঃং পযধৎধপঃবৎ রঃ বাড়ষাব ধ ধিু ড়ভ ষরভব যিরপয ধিং নধংরপধষষু 'ফবসড়পৎধঃরপ' ধহফ বংঃধনষরংযবফ ধ ংড়পরধষ ড়ৎফবৎ নধংবফ ড়হ বয়ঁধষরঃু, ভৎধঃবৎহরঃু ধহফ লঁংঃরপব.”(গড়যধসসধফ কযধষরফ, ডবষভধৎব ঝঃধঃব ড়ভ চধশরংঃধহ, জড়ুধষ নড়ড়শ পড়সঢ়ধহু, কধৎধপযর, ১৯৬৮,ঢ়.-৫৩.)
নূর মোহাম্মদ: সহকারী অধ্যাপক (ইসলাম শিক্ষা), বলাখাল মকবুল আহমেদ ডিগ্রি কলেজ বলাখাল, হাজীগঞ্জ, চঁাদপুর।








