প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ১০:৫৩
কুরবানীর ইতিহাস ও মাসয়ালাহ

কুরবানী শব্দটি আরবি। আভিধানিক দৃষ্টিকোন হতে এর অর্থ হলো নৈকট্য লাভের উপায় হিসাবে যে কোন বস্তু ব্যবহার করা। অপর দিকে শরীয়তের পরিভাষায় কুরবানী বলা হয় ঐ নির্দিষ্ট জন্তুকে যা একমাত্র আল্লাহ পাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে একমাত্র মহান আল্লাহর নামে জবাই করা হয়।
কুরবানীর ইতিকথা ঐতিহাসিক পটভূমি
আজ থেকে প্রায় সাত হাজার ছয় শত পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে মানব গোষ্ঠীর আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর সন্তান হাবিল ও কাবিল এর মধ্যে তাদের বোন আকলিমাকে বিবাহ করা নিয়ে কলহ-বিবাদ দেখা দিলে হযরত আদম (আ.) আল্লাহ পাকের নির্দেশক্রমে তাদেরকে এখলাছের সহিত কুরবানী করার আদেশ দেন এবং বলেন তোমাদের মধ্যে যার কুরবানী গৃহীত হবে তার সংগেই আকলিমার বিবাহ হবে।
হাবিল ভেড়া দুম্বা ইত্যাদি পালন করতো সেহেতু সে একটি উৎকৃষ্ট দুম্বা কুরবানীর উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসল। অপর দিকে কাবিল কৃষি কাজ করতো বিধায় সে কিছু শষ্য ও গম ইত্যাদি কুরবানীর জন্য পেশ করলো। নিয়মানুযায়ী আল্লাহ পাকের হুকুমে আকাশ হতে অগ্নিশিখা অবতরণ করে হাবিলের কুরবানীটি ভস্মিভূত করে দিল এবং কাবিলের কুরবানী যেমন ছিল তেমনি পড়ে রইলো। কাবিল হাবিলকে হত্যা করলো। এইভাবেই সর্বপ্রথম কুরবানীর প্রথা চালু হয়।
ইব্রাহীম (আ.) কর্তৃক ইসমাঈল (আ.)কে কুরবানীর ঘটনা
পবিত্র কুরআনের সূরা ছফফাতে এসেছে, অতঃপর যখন হযরত ইসমাঈল (আ.) তঁার পিতার সাথে চলাফেরার (নয় বৎসর) বয়সে উপণীত হলেন তখন হযরত ইব্রাহীম (আ.) তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)কে সম্বোধন করে বললেন, প্রিয় পুত্র আমার! “আমি তোমাকে কুরবানী করার জন্য স্বপ্নযোগে আদিষ্ট হয়েছি। এ বিষয়ে তোমার অভিমত কী? পুত্র উত্তরে বললেন আব্বা! আপনি যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন শীঘ্র তা কাজে পরিণত করুন, ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন। অতঃপর যখন পিতা পুত্র উভয়েই আত্মসমর্পণ করলেন, আর পিতা পুত্রকে কুরবানী করার জন্য উপুৎ করে ধরাশায়ী করলেন। আমি তখন তাকে ডাক দিয়া বললাম, হে ইব্রাহীম! সত্যিই আপনি স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেছেন। আমি এই ভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। বস্তুত ব্যাপারটি একটি প্রকাশ্য পরীক্ষা মাত্র। আর আমি এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দিলাম। (সূরা সাফফ্ত ১০২-১০৭)
ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন তিনি তঁার প্রিয় বস্তু কুরবানী করতে আদিষ্ট হয়েছেন। এই স্বপ্ন হযরত ইব্রাহীম (আ.)কে উপর্যুপরি তিন বার অর্থাৎ ৮, ৯, ও ১০ জিলহজ তারিখে দেখানো হয়। (কুরতুবী)। একথা স্বীকৃত সত্য যে পয়গম্বরগণের স্বপ্ন ওহীই বটে। তাই এই স্বপ্নের অর্থ ছিল এই যে, আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর প্রতি একমাত্র পুত্রকে জবাই করার হুকুম হয়েছে। এই হুকুমটি সরাসরি কোন ফেরেস্তার মাধ্যমেও নাজিল করা যেতো কিন্তু স্বপ্নে দেখানোর তাৎপর্য হলো হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর আনুগত্য পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ পাওয়া। স্বপ্নের মাধ্যমে প্রদত্ত আদেশে মানব মনের পক্ষে ভিন্ন অর্থ করার যথেষ্ঠ অবকাশ ছিল। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আ.) ভিন্ন অর্থের পথ অবলম্বন করার পরিবর্তে আল্লাহ পাকের আদেশের সামনে মাথা নত করে দেন। (তাফসীরে কবির)। আর সাথে সাথে কুরবানীর প্রস্তুতি হিসাবে পুত্রকে সাথে নিয়ে সিরিয়া হতে মক্কা শরীফের ঐ স্থানের দিকে আগমন করেন যেখানে ১৩ বৎসর মতান্তরে ৮ বৎসর পূর্বে মা হাজেরাসহ প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রকে রেখে গিয়াছিলেন। মক্কা শরীফে পেঁৗছিয়ে হযরত ইব্রাহীম (আ.) স্ত্রী হাজেরা (আ.)কে বললেন ইসমাঈলকে সাজিয়ে দাও এক স্থানে বেড়াতে যাবে (মতান্তরে দাওয়াতে যাবে) সাজিয়ো দিলেন মা হাজেরা (আ.) কলিজার টুকরা ইসমাঈলকে। পিতা চলছেন গন্তব্যস্থানে পচ্চাদানুসরণ করে চলছেন পুত্র ইসমাঈল (আ.) পথিমধ্যে হযরত ইব্রাহীম (আ.) পুত্রকে কুরআন পাকের ভাষায় বললেন, ইসমাঈল! আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি যে তোমাকে কুরবানী করছি। অতএব, ভেবে দেখ তোমার অভিমত কী? কিন্তু খলিলুল্লাহরই পুত্র ভাবী পয়গম্বর তাই তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বললেন, পিতা, আপনাকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা সম্পন্ন করে ফেলুন এবং সাথে সাথে পিতাকে আরো আশ্বাস দিলেন, ইনশাআল্লাহ! আপনি আমাকে ধৈর্যধারণকারীদের মধ্যে পাবেন। অপরদিকে মুসলমানের আজীবন শক্র ইসলামের চির দুশমন ইবলীস এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তাদেরকে প্রতারিত করার কাজে লেগে গেল। তাফসীরের বিভিন্ন বর্ণনায় জানা যায়, শয়তান প্রথমে হযরত হাজেরা (আ.)কে প্রতারিত করার চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ায় হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর প্রতি ছুটলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, শয়তান হযরত ইব্রাহীম (আ.)কে তিনবার প্রতারণা করার চেষ্টা করেছে। প্রথমে বন্ধুর বেশে জামারায়ে আকাবার নিকট তখন তিনি “আলাহু আকবার” ধ্বনী দিয়া সাতটি কংকর নিক্ষেপ করেন মতান্তরে পিতা পুত্র উভয়েই সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। অদ্যবধি এই প্রশংসনীয় কাজের স্মৃতি হিসাবে মীনায় তিনবার কংকর নিক্ষেপের বিধান চালু আছে। যা শরীয়তে মোহাম্মদীতে ওয়াজিব। শয়তান সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে জামারায়ে উসতার নিকট বাধা প্রদান করে। কিন্তু ইব্রাহীম (আ.) সেখানেও কংকর নিক্ষেপ করে তাকে বিতাড়িত করেন। হতাশ হলো শয়তান অবশেষে তৃতীয়বার জুমরায়ে উলার পথ বন্ধ করে দঁাড়ায়। সেখানেও “আল্লাহু আকবার” বলে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করে চির অভিশপ্ত শয়তানকে বিতাড়িত করলেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সাথে শয়তানের তর্ক হয় এবং হযরত ইসমাঈল (আ.)কে এই মহান কাজ হতে বিরত রাখার জন্য সর্বশেষ চেষ্টা প্রয়োগ করে বললো, হে ইসমাঈল! তুমি কি জান? তোমার পিতা তোমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তদুত্তরে তিনি বললেন বেড়াতে যাচ্ছি। তখন শয়তান বললো, তুমিতো কিছুই জান না। তোমাকে তোমার পিতা হত্যা করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। উত্তরে হযরত ইসমাঈল (আ.) বললেন-পিতা কি কখনো পুত্রকে হত্যা করতে পারে? ইবলীস বললো, তাকে আল্লাহ তায়ালা হুকুম দিয়াছেন। তোমাকে কুরবানী করার জন্য তখন হযরত ইসমাঈল (আ.) দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, এর চেয়ে উত্তম জীবন আর কী হতে পারে! যে জীবনকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কবুল করেছেন। হে শয়তান! তোর উপর আল্লাহ পাকের অভিসম্পাত অবতীর্ণ হোক তোর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। এইখানেই মরদুদ নিরাশ হয়ে চলে গেল।
অবশেষে পিতা পুত্র উভয়েই আল্লাহর রহমতে শয়তানের ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে কুরবানীর স্থানে মীনায় পেঁৗছাইতে সক্ষম হলেন। হযরত ইসমাঈল (আ.) পিতাকে সম্বোধন করে বললেন আব্বাজী আর দেরী নয় এখনই বিসমিল্লাহ বলে আমার গলায় ছুরি চালিয়ে দিন। তবে ইহধাম পরিত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্তে আপনি আমার এই প্রার্থনাগুলি মঞ্জুর করে নিন।
(ক) পিতা আমাকে খুব শক্ত করে বঁাধিয়া নিন। যাতে আমি ছটফট করতে না পারি।
(খ) আপনার পরিধেয় বস্ত্র সামলাইয়া নিন। যাতে আমার রক্তের ছিটা তাতে না পড়ে।
(গ) আপনার ছুরিটা ধার দিয়া নিন এবং তা আমার গলায় দ্রুত চালাইবেন যাতে আমার প্রাণ সহজে বাহির হয়ে যায়। কারণ মৃত্যর জ্বালা কঠিন। অন্য বর্ণনা মতে হে পিতা! আপনি যখন বাড়ি তাশরীফ নিবেন তখন আমার জনম দুঃখিনী মাকে আমার রক্তমাখা জামাটা দিবেন। হয়তো ইহাতে তিনি কিছুটা শান্ত্বনা পাবেন। একমাত্র পুত্রের মুখে এইসব কথা শুনিয়ে পিতার মানসিক অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আ.) দৃঢ়তার পাহাড় হয়ে জবাব দিলেন বৎস আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালন করার জন্য তুমি আমাকে চমৎকার সহযোগিতা করেছ। অতঃপর তিনি পুত্রকে স্নেহের চুম্বন করলেন এবং অশ্রপূর্ণ নেত্রে তাকে বেঁধে নিলেন। কুরআনপাকের ভাষায় অতঃপর তারা উভয়েই নত হয়ে গেলেন (অর্থাৎ আত্মসমর্পণ করলেন) এবং তাকে উপুড় করে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। এই ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত পাওয়া গেলেও ঐতিহাসিক বর্ণনায় এইভাবে শোয়ানোর কারণ বর্ণিত হয়েছে যে, শুরুতে হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাকে গোজা করে শোয়াইয়া ছিলেন কিন্তু বারবার ছুরি চালানো সত্ত্বেও গলা কাট ছিল না। কেননা আল্লাহ পাক স্বীয় কুদরতে পিতলের একটি টুকরা মাঝখানে অন্তরায় করে দিয়া ছিলেন। তখন পুত্র নিজেই আবদার করলেন, পিতা আমাকে কাত করে শোয়াইয়া দিন। কারণ আমার মুখমণ্ডল দেখিয়া আপনার পৈতৃক স্নেহ উথলিয়া উঠে ফলে গলা সম্পূর্ণ রূপে কাটা হয় না তাছাড়া ছুরি দেখিয়া আমিও ঘাবড়াইয়া যাই। সেই মতে, হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাকে এইভাবে শোয়াইয়া ছুরি চালাইতে থাকেন। (মাযহারী)। [বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) মবছুত ও কাজীখান কিতাবদ্বয় থেকে হেদায়ার ব্যাখ্যা গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হযরত জিব্রাঈল (আ.) আল্লাহ পাকের নির্দেশে বেহেস্ত হতে একটি দুম্বা নিয়ে রওয়ানা হলেন। তার সংশয় হতেছিল পৃথিবীতে পদার্পণ করার পূর্বেই হযরত ইব্রাহীম (আ.) জবাই কাজ সম্পন্ন করে ফেলিবেন। তাই হযরত জিব্রাঈল (আ.) আকাশ হতেই উচ্চঃস্বরে ধ্বনী দিতে থাকেন “আল্লাহু আকবার” হযরত ইব্রাহীম (আ.) তার আওয়াজ শুনে দেখলেন যে উপস্থিত কুরবানীর বস্তু ইসমাঈল (আ.)-এর পরিবর্তে তিনি একটি দুম্বা নিয়ে আসছেন। তাই তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার”। পিতার মুখে তাওহীদের অমূল্য বাণী শুনতে পেয়ে তিনিও বলে উঠলেন “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার-ওয়া লিল্লাহিল হামদ।” তাই এই তিন মহান ব্যক্তির আমল ও কালামগুলো দরবারে এলাহীতে এত বেশি কবুল হলো যে, কিয়ামত পর্যন্ত উক্ত বাণীগুলো ঈদুল আযহায় সমস্ত মুসলিমের কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকবে। আল্লাহ পাকের অসীম কুদরাতে হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর পরিবর্তে কুরবানী হলো একটি বেহেস্তী দুম্বা। এই ভাবেই প্রচারিত হল কুরবানীর মহান বিস্ময়কর ইতিহাস। যা অনন্তকাল সুন্নাতে ইব্রাহীম হিসাবে বিশ্ব মানবতার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আমাদের কুরবানী
আমরা জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর স্মরণে কুরবানী করে থাকি। সে প্রসঙ্গে হাদীস পাকে এসেছে অর্থাৎ হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) হতে বর্ণিত কতিপয় সাহাবী প্রশ্ন করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কুরবানী কী? তদুত্তরে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটি তোমাদের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সুন্নাত। যদিও পরে স্বতন্ত্রভাবে আমাদের উপর কুরবানীর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবুও সেই নির্দেশ সুন্নাতে ইব্রাহীম (আ.)-এর অনুসরণে দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা শরীয়তে। মোহাম্মাদীর এই নির্দেশ সুন্নাতে ইব্রাহীম (আ.)-এর স্মরণে পালন করে থাকি। [চলবে]
)








