মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৩

ধারাবাহিক স্মৃতিকথা

বড়বেলার স্কুলজীবন

হীরামনি
বড়বেলার স্কুলজীবন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

পৌঁছে গেলাম কোইকা হেডকোয়ার্টার্সে। ওখানে পৌঁছেই এক আশ্চর্য্য অনুভূতি হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো বাবার বাড়িতে গিয়েছি, অতি আপন। বাবার বাড়ি, কারণ কোরিয়ায় এসে প্রথম কোইকা আইসিসি হোটেলেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো কোইকা। তবে বিয়ে হয়ে গেলে বাবার বাড়ি সত্যিই কী আপন মনে হয়! মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতে ঢুকে গেলাম সেমিনার হলে। সেমিনার হলে ঢুকেই দেখতে পেলাম কোরিয়ার উন্নয়নের ইতিহাস। আমি দেখেই যাচ্ছি। হঠাৎ ওলিভিয়া আমাকে ইশারা দিয়ে তার সাথে যেতে বললো। ওলিভিয়া আমার কোর্সমেট। ওর সাথে আমার একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল এই হোটেলেই। আমি কোনো একটা বিশেষ বিষয় নিয়ে ওর সাথে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিলাম। যেদিন কোরিয়ায় এসেছি এটা সেদিনকার রাতের ঘটনা। আমি একটানা কথা বলে শেষ করার পরে অলিভিয়া আমাকে বললো, “দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ ইউ ওয়ার টকিং টু মি, ওয়াজ ইট ইয়োর মাদার টাং?” সাথে সাথে আমার টনক নড়লো, আমি এতোক্ষণ বাংলায় কথা বলছিলাম। অলিভিয়ার বাড়ি ফিজি। যাদেরকে অতি আপন মনে হয় আমরা মনে হয় তাদের সাথেই মায়ের ভাষায় কথা বলে ফেলি।

আমরা মোট ৬ জন আছি এই দলে। আমাদের জন্য একটা সেমিনার রুম বরাদ্দ। এরকম আরও বেশ কতগুলো দল আছে। যাই হউক আমরা ৬ জন বসলাম। শুরু হলো প্রেজেন্টেশন। উপস্থাপনায় আছেন হায়েজং চৈ নামের একজন ভদ্রমহিলা। ছিমছাম গড়ন তাঁর, উচ্চতা ভালো, লম্বা ঝরঝরে চুল, চোখে চশমা, নম্র ভদ্র। তার উপস্থাপনায় প্রথম পর্ব শেষ করে জিজ্ঞেস করলেন কোনো প্রশ্ন আছে কী না! আমি একটি প্রশ্ন করলাম, তিনি দারুণভাবে উত্তর দিলেন। আমি সন্তুষ্ট। এবার তিনি গেলেন পরের পর্বে। প্রেজেন্টেশন শেষ করে তিনি আমাদের একটি ২০ মিনিটের কাজ দিলেন। একটি প্রজেক্টের লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। এক ঘন্টার প্রেজেন্টেশন শেষে নিজের একটি প্রজেক্ট তৈরি করতে হবে। আমার কাছে ব্যাপার কিছুটা শক্ত হলেও কেমন করে যেন সব কিছু লিখে ফেললাম। আমার প্রজেক্টের নাম দিলাম “লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা ও জনগণকে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করা”, হঠাৎ মাথায় এই জিনিসটাই আসলো। মনে হচ্ছিলো স্কুল কলেজ মাদ্রাসায় পড়েই কি শিক্ষিত হওয়া যায়। আমাদের দেশের মতো দেশগুলোর উন্নতির জন্য মন মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া খুব দরকার। আর তার জন্য প্রয়োজন প্রচুর বই পড়া। তাই এই বিষয়টা নেয়া যেতে পারে। বিষয় ঠিক করে ফেললাম, কিন্তু আমি ল্যাপটপ নিয়ে আসি নি, এখন কী করি! ল্যাপটপ নিয়ে আসার নির্দেশনা ইমেইলে দেয়া ছিলো। সবার হাতে ল্যাপটপ দেখে নিজেকে খুব অমনোযোগী মনে হলো, সত্যি বলতে কয়েকদিন ধরে আমি কোনো কাজেই তেমন করে মন বসাতে পারছি না। যাই হউক, সমস্যা যেহেতু একটা করেই ফেলেছি, তার সমাধানও একটা বের করে ফেলবো। বিষয়টি শেয়ার করলাম প্রেজেন্টর চৈ -এর সাথে। তিনি আমাকে একটি কাগজ ও একটি কলম বের করে দিলেন। আমি ছক এঁকে লেখা শুরু করলাম। হঠাৎ করে আবার মনোযোগ হারালাম। সেমিনার রুম থেকে বের হয়ে গেলাম। খুঁজে বেড়াচ্ছি ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড। কোরিয়ায় আছি ৪ মাসেরও অধিক সময়। আমার কোনো কোরিয়ান সীম নেই। ইচ্ছে করেই কিনি নি। কারণ সব জায়গায় পাবলিক ওয়াইফাই পাওয়া যায়। কিন্তু কাউকে পেলাম না ওয়াইফাই পাসওয়ার্ডের কথা জিজ্ঞেস করার জন্য। গেলাম ওয়াশরুমে। কোরিয়ায় এসে যে শব্দটি প্রথম শিখেছি সেটি হলো হুয়াজাংশিল। কোরিয়ান ভাষায় ওয়াশরুমকে বলা হয় ‘হুয়াজাংশিল’। এই শব্দটি শিখেছি মিঠুন দাদার কাছ থেকে। মিঠুন দাদার পরিচয়ে পরে আসি, উনার পরিচয় অনেক লম্বা, আরেকদিন দিবো। হঠাৎ দেখা হলো কোইকা-র প্রজেক্ট ম্যানেজার ভদ্রমহিলার সাথে, তিনি কোরিয়ান, কিন্তু আমাদের সাথে সব সময় ইংরেজিতে কথা বলেন। কিন্তু হুয়াজাংশিল শব্দটির সদ্বব্যবহার করলাম। ফেরত আসলাম আবার সেমিনার রুমে, লিখতে শুরু করলাম লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক এর বাকি অংশ। আর এদিকে প্রেজেন্টর একে একে সব শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছেন। মিস চৈ আমার কাছে এসে তার দেয়া কাগজ কলমে আমার হাতের লেখা দেখে অদ্ভুতভাবে বিস্মিত হয়ে বললেন, “ও মাই গড, ডিড ইউ টাইপ ইট, ওয়াও!” এই কথা শুনে সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছিলো। আনন্দমিশ্রিত এক লজ্জা লাগছিলো আমার। আমি মিস চৈ -কে আমার প্রজেক্ট সম্পর্কে সব বর্ণনা করলাম। তিনি খুব শান্ত ও সৌম্য কণ্ঠে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলেন, ভীষণ ভালো লাগলো সব মিলে। প্রেজেন্টেশনের সময় শেষ। মিস চৈ বিদায় নেয়ার জন্য তৈরি। আমি তার প্রেজেন্টেশনের প্রশংসা না করে পারলাম না, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালাম। সবাই মিলে ছবি তুললাম, ছবি তোলা একটা অফিসিয়াল দায়িত্ব হয়ে গিয়েছে আজকাল।

এশলে কুইন্স, একটা বাফে রেস্তোরা, ওখানে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য রওনা দিলাম। রাস্তাঘাট ভীষণ পরিচিত লাগছিলো, মনে একটা আপন আপন স্বস্তি লাগছিলো। রাস্তাঘাট পরিচিত লাগার একটা কারণ হলো কোরিয়ার প্রায় সকল রাস্তা একই রকম দেখতে। প্রতিটি সিটিতে প্রায় একই রকম সুযোগ সুবিধা রাখা হয়েছে যেন নাগরিকগণ নিজেদেরকে কোনো কারণে বঞ্চিত মনে না করেন। জানলা দিয়ে রাস্তা, দালান কোটা, মানুষজন দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম এশলে কুইন্স-এ। এখানে আগে কখনো যাই নি। তবে অন্যদের কাছে এখানকার খাবারের সুনাম শুনেছি। এশলে কুইন্স- এর সামনে হাসি হাসি মুখ করে একটা ছবি তুলে নিলাম। একটা ব্যাপার হলো মন যতোই ভালো বা খারাপ থাকুক, ক্যামেরার সামনে গেলেই আমার মুখে হাসি চলে আসে। ছবি তুলে এস্ক্যালেটরে চড়ে উঠে গেলাম সেই বাফে রেস্তোরায়। ছবি তুলার কারণে আমি প্রায় সবার শেষে ঢুকলাম রেস্টুরেন্টে। সবাই প্রথমে নিজেদের বসার জায়গা ঠিক করে নিলাম। আমাদের সাথে স্কুলের পক্ষ থেকে যিনি এসেছেন তিনি এসে বলে গেলেন আমাদের খাওয়ার জন্য সময় আছে এক ঘন্টা। এক ঘন্টা পর আমরা অন্য একটি স্পটের উদ্দেশ্যে রওনা দিবো। আমি সাধারণত এমন জায়গায় বসে খেতে পছন্দ করি যেখান থেকে বাইরে দেখা যায় অথবা বসার পরে স্বাভাবিকভাবে চোখের সামনে যে দৃশ্য পড়বে সেটা যেন সুন্দর হয়। তাই এমন একটি জায়গা বেছে নিলাম। এখন খাবার নিতে যাওয়ার পালা। শত শত খাবার। কিন্তু কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। তারপরও কিছু খাবার তুলে নিলাম প্লেটে। খাবার নিয়ে ফেরত আসলাম আমার পছন্দ করে রেখে যাওয়া টেবিলে। এই টেবিলে আমরা তিনজন বসেছি। আমার সাথে আছে ওয়াকার এবং জর্জ। খাওয়া শুরু করলাম আর বাইরে তাকিয়ে তাকিয়ে মানুষের বিভিন্ন ধরনের চলাফেরা, কথা বলার ধরণ, সাজগোছ ইত্যাদি দেখছি। আমাদের খাবার টেবিলে থাকা বাটনে চাপ দিতেই একটি রোবট আসলো খাবার খাওয়ার পরে এঁটো প্লেট চামচ নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি রোবট দেখিয়ে জর্জের সাথে আমার দেশ বাংলাদেশের একটি রেস্টুরেন্টের রোবট নিয়ে কথা বলছি। কোরিয়ার যে রোবট সেই রোবটে কোনো ছেলে বা মেয়ের ছাপ নেই। শুধু শেলফের মতো যার প্রতিটি তাকে প্লেট চামচ গ্লাস রেখে দেয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশের রেস্টুরেন্টের ঐ রোবটটি একজন মেয়ের আদলে তৈরি এবং গায়ে শাড়ি পরানো। সাধারণত বাংলাদেশের রেস্টুরেন্ট ও হোটেলে ওয়েটার হিসেবে ছেলেরাই কাজ করে কিন্তু ওয়েটার হিসেবে কাজ করা রোবটের আদল একজন মেয়ের মতো। এই কথা শুনে জর্জ মুখ চেপে একটা অট্টহাসির মতো দিলো চাইলো। প্রথম দফা খাওয়া শেষ। এবার ভাবলাম কিছু মিষ্টি খাবার, ফল, জুস ইত্যাদি নিয়ে আসি। মনে হলো ওয়াকার কোনো জুস নেয় নি, কিন্তু জর্জ নিয়েছে। তাই আমি দুই রকমের জুস নিলাম, ওয়াকারকে অফার করলাম তার পছন্দমতো যেকোনো একটি গ্লাস জুস বেছে নিতে। সে নিলো নীল রঙের লেমন জুস। জুসগুলো মনে হলো স্প্রাইট বা মাউন্টেইন ডিউ মিশিয়ে আর কিছু ফ্লেভার দিয়ে বানানো। আমি পান করলাম স্ট্রবেরির শরবত। খাবার খাওয়া শেষ। রোবট এলো, প্লেট গ্লাস চামচ নিয়ে গেলো। আমরাও সবাই রওনা করলাম নতুন গন্তব্যের উদ্দেশে।

ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল মিউজিয়াম অব কোরিয়া-তে পৌঁছালাম বাসে আধ ঘন্টা জার্নি করার পর। মিউজিয়ামটি সনজু নামক একটি জায়গায় অবস্থিত। বাস যেখানে পার্ক করা হয়েছে সেখান থেকে ২ মিনিট হেঁটে মিউজিয়ামে ঢুকতে হবে। আমি আজ পেন্সিল হিলের সাপ্পুন জুতো পরেছি। ভেবেছিলাম সারাদিন ঘরের ভিতর থাকা হবে যেমন সেমিনার বা মিউজিয়াম। কিন্তু এই ২ মিনিট হাঁটার রাস্তায় যে পার্কিং টাইল বসানো হয়েছে সেই টাইলসের এমন নকশা যে নকশায় আমার জুতোর হিল বারবার ঢুকে যাচ্ছে। তাই হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিলো। সাথে সাথে নিজের হাঁটার রাস্তা শিফট করে ফেললাম প্রতিবন্ধীদের হাঁটার রাস্তায়। কোরিয়ার প্রতিটি রাস্তায় প্রতিবন্ধীদের হাঁটার জন্য বিশেষ খাঁজ কাটা রাস্তার ব্যবস্থা আছে। এখানে প্রতিটি হুয়াজাংশিল, পার্কিং লট, পাবলিক বাস, ট্রেন ইত্যাদি সব জায়গায় প্রতিবন্ধীদের জন্য এই খাঁজ কাটা রাস্তা সযত্নে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এটা আমাকে খুব মুগ্ধ করে। প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ খাঁজ কাটা রাস্তা ধরে হেঁটে পৌঁছে গেলাম মিউজিয়ামের সামনে। স্মৃতি ধরে রাখার জন্য মিউজিয়ামের নেম প্লেটের সামনে ছবি তুলে নিলাম। তাছাড়া আজকাল ফেসবুকে ছবি পোস্ট করা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

হীরামনি : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বান্দরবান সদর উপজেলা, বান্দরবান।

(চলবে, পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়