প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪২
ওবিইর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রয়াস এবং বাস্তবতা

আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে পাঠ্যবিষয়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় নির্দিষ্ট কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা কী ধরনের যোগ্যতা অর্জন করবে এবং সেই দক্ষতার মূল্যায়ন কীভাবে হবেÑসেদিকে। এর মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি, প্রায়োগিক দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২০ সালে ওবিই কারিকুলাম চালুর সুপারিশ করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদের অধীনে ৮৪টি বিভাগ এবং ১৩টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। এর মধ্যে কলা ও চারুকলা অনুষদের অধিকাংশ বিভাগে ওবিই চালু করা হয়েছে বলে পত্রিকার মাধ্যমে খবর দেখলাম, তবে বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের কোনো বিভাগেই এখানো এ কারিকুলাম চালু হয়নি। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের মাত্র দুটি বিভাগে ওবিই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব এবং বড় আকারের শ্রেণিকক্ষের কারণে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় ও শঙ্কা রয়েছে।
এখানে যেটি হওয়া উচিত ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাও তাই যে, বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করা, তাদের পাঠ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কীভাবে আনন্দময় করা যায়, উচ্চশিক্ষা কীভাবে মানবিকতা, সমাজিকতা, জ্ঞানস্পৃহা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারীরা শুধু জ্ঞানের ভাণ্ডার হয়ে বসে না থেকে বরং সমাজের চাহিদা অনুযায়ী নিজেরা কাজ করবেন এবং অন্যদেরও করাতে পারবেন। এসব বিষয়ের গবেষণার ফল সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবেন যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন বা করছেন; কিন্তু, এখন দেখা যাচ্ছে অন্যান্য লেভেলের শিক্ষকদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে কীভাবে তাদের শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট বিষয়ে পাঠে দেওয়া লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারেন। এগুলো তাদের তৈরি করার কথা ছিল, সকল পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য। তাদের গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ তথ্য অন্যান্য শিক্ষকদের মাঝে বিতরণ করার কথা ছিল; কিন্তু হয়েছে উল্টো! অন্যের তৈরি করা শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কীভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর মাধ্যমে অর্জন করানো যায় সেটি নিয়ে চলছে প্রশিক্ষণ।
এর বেশ কিছু কারণও আছে। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনে দেখেছি যারা শিক্ষক হয়েছেন (ব্যতিক্রম আছে) তারা শুধু নিজের বিষয়ে নোট মুখস্থ করে, নির্দিষ্ট কিছু পাঠের ওপর জোর দিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছেন; কিন্তু সমাজ, রাজনীতি, মানবিকতা, সামাজিকতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, দেশের পরিস্থিতি এসব বিষয়ে তারা ছিলেন বেখেয়ালী। তারা পড়ে পড়ে প্রথম বিভাগ অর্জন করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন এবং তারাও প্রায় এরকমই কিছু শিক্ষার্থী তৈরি করছেন। অন্যদিকে যারা চারদিকের জ্ঞান রাখেন, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি রাজনীতি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কাজ করেন তারা সিভিল সার্ভিসে যোগ দিচ্ছেন। তারা শুধু একটি বিষয়ে ইন্টেলেকচুয়্যালি গভীরে না গিয়ে সবদিকে মোটামুটি স্মার্ট। তারা হচ্ছেন, আমলা ও রাজনীতিবিদ। এ ধরনের বিষয় আশির দশক পর্যন্ত একেবারে বেমানান ছিল না। কিন্তু তারপরের দশকগুলোতে এগুলোকেও ছাপিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়েছেন শুধু পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীও না, আবার আমলা হওয়ার আশায় যারা শুধু নিজ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত না থেকে বাইরের অনেক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত তারাও না। প্রধানত পার্টিতন্ত্রের জোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ঢুকে পড়েছেন একটি বড় অংশ, যারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বারোটা বাজিয়েছেন।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সমাজের কেউ এখন প্রকৃত শিক্ষকই মনে করেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, তথাকথিত জ্ঞান দান সবকিছুই একেবারেই গৌণ হয়ে পড়েছে। তাই প্রবীণ শিক্ষকরা, ইউজিসির কিছু চিন্তাবিদ সদস্য চিন্তা করলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা তাহলে কী করবেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দরকার। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যোগ্যতা অর্জন করছেন না সেটি পরিমাপ করতে হবে।
সরকার টেকনিক্যাল সেন্টারের মতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা শুরু করল। মনে হচ্ছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে এক ধররেন ট্রেনিং সেন্টার যেখান থেকে পাস করে বের হলেই সমাজে যেসব পেশার চাহিদা আাছে তারা সেগুলো পূরণ করে ফেলবেন এবং বেকার থাকবেন না। উচ্চশিক্ষা নিয়ে এই উল্টো ধারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আমাদের দরকার প্লাম্বার, আমাদের দরকার রেডিও টিভি, ফ্রিজ মেরামত করার লোক, দরকার গাড়ির মেকানিক, আমাদের প্রয়োজন কৃষি বিজ্ঞানী, কৃষি প্রকৌশলী কিন্তু এদের বড় অভাব। আপনার বাসায় বাথরুমে কিংবা কিচেনে সমস্যা হয়েছে সঠিক লোক পাবেন না। লোক ডেকেছেন সে আসছে চার-পাঁচ দিন পর। কারণ তাদের প্রচুর চাহিদা। অথচ একটি প্রতিষ্ঠানে একজন বা দুজন এমবিএ প্রার্থী চাওয়া হয়েছে, গিয়ে হাজির হবেন ৫০০ কিংবা ৬০০ জন। চাওয়া হয়েছে এসএসসি বা উচ্চ মাধ্যমিক পাস পিওন, দেখবেন ২০০ দরখাস্ত পড়েছে মাস্টার্স আর গ্র্যাজুয়েট। এ বাস্তবতার আলোকে যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেটি কে নেবে? সবাই ভাবে রাষ্ট্র নেবে। রাষ্ট্র নেয় না। দায়িত্বে যারা থাকেন, তারা কিছু জনপ্রিয় কথা বলে থাকেন! তা না হলে পূর্ববর্তী সরকার উচ্চশিক্ষার যে মহাক্ষতি করে গেছে, তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ছোট ছোট জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, সেটিকে আরও বেগবান করার চেষ্টা চলছে। জনপ্রিতিনিধিরা আসল সমস্যায় না গিয়ে তাদের নিজ নিজ এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চান। এর মানে কী, তা আমাদের বুঝে আসে না।
আপাতদৃষ্টিতে বাজারমুখী দক্ষতার চমৎকার আলোচনা ও সাইনবোর্ড বেশ আকর্ষণীয়; কিন্তু উচ্চশিক্ষার সঙ্গে এই ধারণ কতটা যায়! লোক প্রশাসন বিভাগে যারা পড়াশোনা করেন তারা দেশের লোকপ্রশাসন, পার্শ্ববর্তী এবং উন্নত বিশ্বের কিছু লোকপ্রশাসন সম্পর্কে ধারণা রাখেন; কিন্তু প্রকৃত প্রশাসন চালাতে হলে তাকে প্রশাসনে আসতে হবে তারপর পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে করে, বহু ধাক্কা খেয়ে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে লোক প্রশাসনে যারা পড়াশোনা করেছেন তারা সবাই কি প্রশাসক হবেন? তাদের জন্য এত পোস্ট কী খালি আছে? তারা সবাই প্রশাসনে গেলে অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের কী হবে? একইভাবে যারা পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন তারা সবাই কি অ্যাটমিক এনার্জি বা এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানেই চাকরি করবেন? বাস্তবে আমরা কি দেখতে পাই? বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা যেমন, প্রকৌশল, কৃষি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন থেকে পাস করে বেশ কয়েক দশক ধরে অনেকেই নিজেদের বিভাগীয় চাকরি বা প্রসপেকটাস বাদ দিয়ে সাধারণ চাকরি বিশেষ করে প্রশাসনে চলে আসছেন, এমনকি ব্যাংকে চাকরি করছেন, পুলিশ প্রশাসনে চাকরি করছেন। কারণ উচ্চশিক্ষায় বিষয়ভিত্তিক চাকরি নেই। আর বিশেষায়িত বিষয় পড়ে যাদের বিশেষ সেবা করা দরকার ছিল রাষ্ট্র তাও নিশ্চিত করতে পারেনি। অথচ আউটকাম বেজড কারিকুলামের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই রোগের চিকিৎসা কতটা সারানো যাবে সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে যে বিভাগেই পড়ুক না কেন, সবাই প্রথম বর্ষ থেকেই বিসিএস গাইড পড়া শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লাইব্রেরির বই ও জার্নাল থাকে আনটাচড অথচ লাইব্রেরিতে বসার জায়গা নেই, লাইব্রেরিতে ঢোকার জন্য লম্বা লাইন। তারা সবাই জানেন, বিষয় পড়ে কোনো লাভ নেই, পড়তে হবে সাধারণ জ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান আর ইংরেজি ও গণিত। তাহলে বিসিএসসহ যে কোনো চাকরির দরখাস্ত করা যাবে, চাকরির পরীক্ষায় ভালো করা যাবে। আর তাই সবাই সেদিকে ছুটছেন। এই বাস্তবতার সঙ্গে ওবিই প্রশিক্ষণ কতটা এবং কীভাবে সমন্বয় করবে সেটি আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে।
সরকারি পলিটেকনিক থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের টেকনিক্যাল নলেজ নেই, বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই কারণ তারা প্রাকটিক্যাল কাজ শিখেনি, রাজনীতি করেছে। তবে ব্যতিক্রম আছে। টেকনিক্যাল কাজ শিখছে নিতান্ত অসহায় অবস্থায়, রাস্তার পাশে, চিপার ভেতর কোন কারখানায়। সমাজে তাদের চাহিদা রয়েছে। এগুলোকে কীভাবে উন্নত করা যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, এখন কাজ করতে হবে সেগুলো নিয়ে কারণ সমাজে এদের প্রয়োজন। যেমন একজন গাড়ির ড্রাইভারের বেতন ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত অথচ একজন এমবিএ পাস করা গ্র্যাজুয়েটের বেতন ১০ হাজার টাকা, একজন মাধ্যমিকের শিক্ষকের বেতন ১০-১২ হাজার টাকা। এটি বর্তমান সমাজের চাহিদা ও বাস্তবতা! সরকার এগুলো কীভাবে সমন্বয় করবে সেটি নিয়ে দরকার বাস্তব পরিকল্পনা কিন্তু আমরা শুনি আরও কোথায় কোথায় বিশ্ববিদ্যালয় হবে অর্থাৎ সমাজে আরও বেকার কীভাবে বানানো যায়, সে দিকে হাঁটা। আরও শুনি কারিকুলাম পরিবর্তন করতে হবে, তাহলে সবাই যেন চাকরি পেয়ে যাবে ইত্যাদি! আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটকাম বেজড কারিকুলাম থাকবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পাস করার পর চাকরি পান।
আমাদের মনে রাখতে হবে উচ্চশিক্ষা নির্দিষ্ট বাটখারায় পরিমাপযোগ্য পণ্য নয়, উচ্চশিক্ষা টেকনিক্যাল বিষয় নয়, উচ্চশিক্ষা নির্দিষ্ট কিছু প্রশিক্ষণ, গ্রেড আর লেসন প্লানের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। উচ্চশিক্ষার ধারণা ব্যাপক, উচ্চশিক্ষা বৈশ্বিক জ্ঞান, বিশেষ জ্ঞান নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করে যার প্রকাশ ঘটে নতুন কিছু আবিষ্কার, নতুন কিছু উদ্ভাবনের মাধ্যমে। চার বছরের অনার্স আর এক বা দুই বছরের মাস্টার্স পড়ে ওই বিষয়েই চাকরি ম্যানেজ করতে হবেÑএই ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। এ জন্য আমাদের কলেজ বা বিশেষায়িত টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা দরকার, যেখানে সাধারণ বিষয়াবলিও থাকবে তবে টেকনিক্যাল জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা শেখানো হবে বিশাল অঙ্কের শিক্ষার্থীদের। সে চাহিদা বা ছাঁচে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা হতে পারে না।








