প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫১
মঞ্চনাটক থেকে শিশুদের স্বপ্ন গড়ার এক নিরলস সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক পি এম বিল্লাল
“আমি চাই, চাঁদপুরে নাট্যচর্চা আরও বিস্তৃত হোক, নতুন প্রজন্ম সংস্কৃতিমনা হয়ে গড়ে উঠুক এবং নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজের অসংগতি দূর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। যতদিন সামর্থ্য থাকবে, ততদিন সংস্কৃতি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে চাই।”

চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে একটি পরিচিত মুখ পি এম বিল্লাল। একজন সংগঠক, নাট্যাভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক হিসেবে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। মঞ্চনাটকের প্রতি ভালোবাসা, শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং নাটকের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা। শুধু মঞ্চে অভিনয় কিংবা সংগঠন পরিচালনা নয়, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়েও তিনি নিজের কর্মপরিধি বিস্তৃত করেছেন।
নাট্যঙ্গনে পদার্পণ ও প্রাথমিক যাত্রা : শৈশব-কৈশোরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল পি এম বিল্লালকে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। প্রায় দু যুগ আগে জাতীয় শিশু সংগঠন ‘ঐকতান খেলাঘর আসর’-এর মাধ্যমে চাঁদপুরের সংস্কৃতি জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে তিনি যুক্ত হন মঞ্চনাটকের সঙ্গে। চাঁদপুর থিয়েটারে যোগ দিয়ে ‘১৯৭১’ নাটকে ইমাম চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চাভিনয়ে তাঁর অভিষেক ঘটে। সেই শুরু, এরপর নাটকের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে নিয়ে যায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও নাট্যনির্দেশনার বিস্তৃত পরিসরে।
পরবর্তীতে নাট্যকার হানিফ পাটওয়ারীর আমন্ত্রণে বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। তৎকালীন সময়ে ‘অনন্যা নাট্যগোষ্ঠী’র প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ‘ইঙ্গিত’, ‘দেশের মানুষ’, ‘তোমরাই’, ‘রাক্ষুসী’ ও ‘রূপবান’সহ বিভিন্ন নাটকে সফলতার সঙ্গে অভিনয় করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি যুক্ত হন ‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’ চাঁদপুর জেলা সংসদে। নাট্যনির্দেশক আকরাম খানের নির্দেশনায় ‘ইদানিং তিনি ভদ্রলোক’ ও ‘ব্যারিকেড চারদিক’ নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে গণসংগীতেও অংশগ্রহণ করেন।
শিশু থিয়েটার ও নটমঞ্চ প্রতিষ্ঠা : শিশুদের সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং পথশিশুদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ভাবনা থেকে ১৯৯৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘শিশু থিয়েটার’। শিশুদের প্রতিভা বিকাশ ও আনন্দময় পরিবেশে নাট্যচর্চার লক্ষ্যে তাঁর নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় ‘বাউল বাঁশির সুর’, ‘বাংলা ভাষী ভালো’, ‘ভূতের মুখে রাম নাম’ ও ‘লেখাপড়া’সহ মোট ১২টি শিশুতোষ নাটক।
এরপর ২০০১ সালে বড়দের নিয়ে নিয়মিত নাট্যচর্চা ও মঞ্চনাটক নির্মাণের উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নাট্যসংগঠন ‘নটমঞ্চ’। তাঁর নির্দেশনায় এ সংগঠনের ব্যানারে মঞ্চে আসে ১৩টি নাটক। নটমঞ্চের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার মধ্যে রয়েছে ‘কৃপণ’, ‘তামাশা’, ‘বদহজম’, ‘দূরপাল্লা’ এবং ‘ইদানিং তিনি ভদ্রলোক’। এছাড়া ‘১৯৭১’, ‘বদির বিয়ে’, ‘সিআইডি’ ও ‘গুনাই বিবি’সহ বিভিন্ন নাটকের সঙ্গেও তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।
সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক কার্যক্রম : নাট্যচর্চাকে কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করেছেন পি এম বিল্লাল। নটমঞ্চের উদ্যোগে জেলার আটটি উপজেলায় ২৫টি পথনাটক প্রদর্শিত হয়েছে। এর মধ্যে আর্সেনিক ও স্যানিটেশন সচেতনতামূলক পথনাটক চাঁদপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৭ বার এবং মাদক ও ধূমপানবিরোধী সচেতনতামূলক পথনাটকও মঞ্চায়ন করা হয়েছে।
নাট্যাঙ্গনের বাইরেও তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ড প্রশংসনীয়। চাঁদপুরের বেদে পল্লি, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে কাজ করার পাশাপাশি শিশুদের চিকিৎসাসেবা সহায়তার উদ্যোগেও তিনি যুক্ত রয়েছেন। বিশেষ করে ঠোঁটকাটা, তালুকাটা ও বাঁকা পায়ে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা এবং সংশোধনমূলক সেবায় সহায়তার মাধ্যমে তিনি অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
সংগঠন পরিচালনা ও স্বীকৃতি : পিএম বিল্লালের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৩ সালে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে শিশু নাটকের নির্দেশক হিসেবে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এছাড়া চাঁদপুরের ‘নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠন’, ‘উদ্দীপন’ ও ‘প্রতিভা’ সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকেও তিনি সংবর্ধিত হন। সাংগঠনিক দক্ষতায় তিনি ‘দোয়েল সাংস্কৃতিক সংগঠন’ এবং ‘নবরূপ মানবিক উন্নয়ন সংস্থা’-র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
পিএম বিল্লাল বিশ্বাস করেন, নাটক শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নতুন প্রজন্মকে নাটকের সঙ্গে যুক্ত করা এবং শিল্পকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর যে নিরলস প্রচেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন, তা এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।






