প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৭
চাঁদপুর ইলিশের জৌলুস রক্ষায় সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিন

চঁাদপুর শহরের পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত চঁাদপুরের প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ‘বড়স্টেশন মাছঘাট’। পদ্মা-মেঘনার মিঠা পানিতে ইলিশের বিচরণ। এ দু নদীর মিলনস্থল চঁাদপুর অবস্থিত হওয়ায় মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সময় এই অঞ্চলে চলে আসে। মা ইলিশ ডিম ছাড়ার পর এই নদীতেই ইলিশের পোনা জাটকার বিচরণ এবং এখানেই জাটকা বড়ো হয়ে পরিপূর্ণ ইলিশ হয়। এ কারণে চঁাদপুরকে ‘ইলিশের বাড়ি’ বা ‘ইলিশের রাজধানী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বিশাল পরিমাণে সুস্বাদু রূপালি ইলিশের উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহে দেশের বৃহত্তম ইলিশের মোকাম থাকার কারণে ‘ইলিশের বাড়ি চঁাদপুর’ হিসেবে জেলাটির ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে । তবে এখন বাস্তবতা ভিন্ন রূপ নিচ্ছে। এখানে দিন দিন ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ‘হোয়াইট গোল্ড’ খ্যাত এই মাছটির দাম এখন বেশ চড়া। ইলিশ মৌসুমে ইলিশের জৌলুস যেনো হারিয়ে যেতে বসেছে। চঁাদপুর মাছঘাটের ইলিশের সেই চাকচিক্য নেই বললেই চলে। এখন আর আগের মতো ঘাটে দেখা যায় না সমুদ্রের একাধিক ফিশিং বোট। মাছ ঘাটের মৎস্য ব্যবসায়ীদের থেকে জানা যায়, স্থানীয় জেলেদের ধরা এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। ফলে অনেকেই দরদাম করেও ইলিশ না কিনে ফিরে যাচ্ছেন। এদিকে দক্ষিণাঞ্চল থেকে চঁাদপুরের মোকামে ইলিশের আমদানি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানি বাড়লে বাজারে ইলিশের দাম আরও কমবে। মৎস্য বিভাগের দাবি, ইলিশের আমদানি কমেনি, বরং বর্তমানে গড়ে মাছের আকার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই ২০২৬) দুপুরে চঁাদপুর শহরের বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে চঁাদপুর কণ্ঠের প্রতিনিধি এসব তথ্য সংগ্রহ করেন। কিছু সময় ঘাটে অবস্থান করে দেখা গেছে, এখন আর আগের মতো সড়ক ও নৌপথে হাতিয়া ও লক্ষ্মীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইলিশের আমদানি নেই। শুধুমাত্র স্থানীয় পদ্মা-মেঘনায় আহরিত ছোট-বড় মিলিয়ে কিছু ইলিশ আসছে আড়তে। তাও সংখ্যায় খুবই কম। নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুরের বেপারীরা ঝুড়ি ভর্তি ইলিশ ঘাটে নিয়ে আসলে আড়তে তোলামাত্র ভিড় জমে যায় পাইকারদের। সেখানে দেখা যায়, ইলিশের চেয়ে পাইকারের সংখ্যা বেশি। চঁাদপুর সদর উপজেলার আখনের হাট এলাকার জেলে মজনু সরকার বলেন, এখন ইলিশের মওসুম, কিন্তু নদীতে পর্যাপ্ত পানি বা স্রোত নেই। সারাদিন জাল বেয়ে জ্বালানি খরচও ঠিক মতন উঠছে না, মাছ খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। হরিণা রাঢ়ি বাড়ি এলাকার জেলে ছলেমান বলেন, এখন বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে। অন্য বছর ইলিশের আমদানি কিছুটা বেশি ছিলো। তবে এবার কমেছে। বড়ো সাইজের ইলিশ কম। টেম্পু ইলিশ বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
ইলিশের বাজারদর জানালেন চঁাদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটের ইলিশ বিক্রেতা ইমরান। তিনি বলেন, ইলিশের সঙ্গে মঙ্গলবার (৭ জুলাই ২০২৬) মাঝারি সাইজের ১০-১২টি নদীর পাঙ্গাশ মাছ ঘাটে বিক্রির জন্যে জেলেরা নিয়ে এসেছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী ইলিশের আমদানি খুবই কম। আড়তে ইলিশ না থাকায় গত দুদিন যাবত মাছ কিনে বিক্রি করতে পারছেন না। ইলিশের দাম শুনে ক্রেতারা চলে যাচ্ছে। গত বছরের তুলনায় ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি। চঁাদপুর মৎস্য বণিক সমিতির নেতা সুমন খান জানান, সাগর ও নদীর উপকূলীয় অঞ্চলের আহরিত ইলিশের ওপর নির্ভরশীল চঁাদপুর মাছঘাট। সাগরের ইলিশের আমদানি কম হওয়ায় এখানে ইলিশের তেমন প্রাচুর্য এবার দেখা যাচ্ছে না। সামনের জোতে বোঝা যাবে ইলিশের আমদানি কেমন হয়। চঁাদপুর শহরের অদূরে মহামায়া থেকে আসা মহসিন নামে এক ক্রেতা জানান, আত্মীয়ের বাড়িতে মাছ পাঠাতে মাছঘাটে এসেছেন ইলিশ কেনার জন্যে। ঘাটেই ইলিশের এতো দাম শুনে অবাক! দাম দেখে চলে যেতে হয়। কারণ ১ কেজি ইলিশের দাম দিয়ে ৩ কেজির বেশি গরুর মাংস পাওয়া যায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, চঁাদপুরে থেকেও ইলিশের স্বাদ নিতে পারি না। চঁাদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, আষাঢ় মাসে ইলিশের আমদানি খুবই কম। জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রতিদিন ১ থেকে দেড়শ’ মণ ইলিশ আমদানি হলেও চলতি মাসে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ২০ মণও হয় না ইলিশের আমদানি। তিনি বলেন, ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ৪০০ গ্রাম থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। তবে আমদানি বাড়লে দাম কমবে। চঁাদপুর সদরের জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, ইলিশের আমদানি সংখ্যায় কমেনি। জেলেদের জালে যেসব ইলিশ ধরা পড়ছে, তাতে গড় ইলিশের ওজন ও আকার ছোট। এই কারণে উৎপাদনের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। তবে অনেক বেশি নয়। তিনি আরো বলেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা করায় ইলিশের উৎপাদন গত কয়েক বছরে বেড়েছে। আরো বাড়বে যদি নদীর প্রবাহ ঠিক থাকে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নদীতে ডুবোচর, ইলিশের খাবার সংকটসহ নানা কারণে এখন পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের বিচরণ কম।
ইলিশ আমদানি কম হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানালেন ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে ইলিশের বিচরণ কমেছে। প্রাকৃতিক কারণে নদীর পানিতে লবণের মাত্রা বেড়েছে। জেলের সংখ্যা আগের চেয়ে বেশি। মাছ ধরার কাজে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও ফঁাদ ব্যবহার হচ্ছে। যেমন-খুবই সূক্ষ্ম কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল। চঁাদপুর ইলিশ অবতরণ কেন্দ্রে এখন মাছের চেয়ে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি। নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা না পড়ায় ঘাটে সরবরাহ অনেক কম। এর ফলে স্থানীয় বাজারে ১ কেজি ওজনের ইলিশ আড়াই হাজার টাকার ওপরে পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও চঁাদপুরের প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে (বড় স্টেশন মাছঘাট) আশানুরূপ ইলিশ আসছে না। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, গত কয়েক বছর ধরেই এখানে ইলিশের যোগান কমেছে। দক্ষিণাঞ্চল থেকে যেসব মাছ আসছে, তার আকারও তুলনামূলক ছোট। সরবরাহ সংকটের কারণে পাইকারি ও খুচরা-উভয় বাজারে ইলিশের দাম আকাশচুম্বী। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের পথ ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া অবৈধ জালের ব্যবহার এবং জেলেদের জালে বড় মাছ কম ধরা পড়াও সংকটের অন্যতম কারণ।
উপরোল্লিখিত বিবরণটি গতকাল চঁাদপুর কণ্ঠে প্রকাশিত শীর্ষ সংবাদে প্রতিবেদক মো. মিজানুর রহমান তঁার সরেজমিন অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন। এখানে চঁাদপুরের ইলিশের জৌলুস শুধু নয়, চঁাদপুরকেন্দ্রিক লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী সহ সন্নিহিত অঞ্চলের ইলিশের জৌলুস যে ক্রমশ কমে যাচ্ছে সে বিষয়টি উঠে এসেছে। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন দৃশ্যমানভাবে কমে যাওয়া সত্ত্বেও এবং এ ক্ষেত্রে ইলিশ গবেষকসহ অংশীজনের সুস্পষ্ট মতামত উদ্ধৃত করার পরও মৎস্য বিভাগ বরাবরের মতো নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে কীভাবে সত্যকে চাপা দিতে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির বায়বীয় অভিমত দিচ্ছে, সেটা লক্ষ্য করা গেছে। নদীগুলোতে মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষা অভিযান চলাকালে মৎস্য বিভাগ ও নৌপুলিশের ব্যাপারে যে সমস্ত তথ্য পাওয়া যায়, তাতে থমকে যেতে হয়। মৎস্য বিভাগের অবস্থা ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’ এবং তেলের জন্যে অপর্যাপ্ত বরাদ্দহেতু নৌপুলিশ ও টাস্কফোর্সের আভিযানিক সীমাবদ্ধতাসহ আরো কিছু গ্রহণযোগ্য/ অগ্রহণযোগ্য কারণে ইলিশ রক্ষার সর্বশেষ দুটি অভিযান যে পূর্বের বছরগুলোর তুলনায় কোন্ পর্যায়ে ছিলো সেটি কি গণমাধ্যম কর্মীর নিকট থেকে এবং গণশুনানির মাধ্যমে কেউ জানতে চেয়েছে, না মৎস্য বিভাগের বানানো রিপোর্টে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ-সে বিষয়ে কৌতূহল কিন্তু ঝুলছে। ইলিশ রক্ষায় পুরোপুরি সফল না হওয়া, এর পেছনের কারণসমূহ জানা, সীমাবদ্ধতা দূর করা, বিদ্যমান সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ আন্তরিক না হলে, সর্বোপরি বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ না করলে জাতীয় মাছ ইলিশ যে নদীতে ক্রমশ ফিনিশ হয়ে জাদুঘরে ঠঁাই নেয়ার বাস্তবতার দিকে ধাবিত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।








