সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮:৩০

নীরব ফোনের ওপারে একাকী হৃদয়

হাসান আলী
নীরব ফোনের ওপারে একাকী হৃদয়

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ শুধু শরীরেই নয়, সমাজেও ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যায়। এক সময় যাঁর কাঁধে ভর করে সংসার দাঁড়িয়েছিলো, যাঁর পরামর্শ ছাড়া পরিবারে কোনো সিদ্ধান্ত হতো না—সেই মানুষটাই একদিন হয়ে উঠেন ‘অপ্রয়োজনীয়’। আয় কমে যায়, শক্তি কমে যায়, গুরুত্বও কমতে থাকে। চারপাশে মানুষ থাকলেও প্রবীণ অনুভব করেন, তিনি যেনো একা।

এক সময় যে ফোনটা সারাদিন বেজে উঠতো, এখন সেটি নীরব পড়ে থাকে। সন্তানেরা ব্যস্ত, নাতি-নাতনিরা তাদের নিজের জগতে, বন্ধু-বান্ধবেরা কেউ অসুস্থ, কেউ দূরে, কেউ চিরতরে বিদায় নিয়েছে। প্রবীণ যখন নিজে ফোন করেন, ওপাশ থেকে ভেসে আসে—“আমি মিটিংয়ে আছি”, “ব্যস্ত আছি”, “পরে ফোন করবো।” সেই ‘পরে’ আর আসে না। দিন পেরিয়ে যায়, সপ্তাহ পেরিয়ে যায়, ফোনটা আর বেজে উঠে না। এই নীরবতাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

অনেকে ভাবেন, ফোন না এলে কী আর এমন ক্ষতি হয়? প্রবীণ তো চাইলে টিভি দেখতে পারেন, বই পড়তে পারেন, নামাজ পড়তে পারেন। কিন্তু মানুষের হৃদয় তো যন্ত্র নয়। শুধু সময় কাটানো আর মন ভরা এক নয়। একটি ফোনকল মানে শুধু কয়েক মিনিটের কথা নয়—তা মানে “তুমি আমার জীবনে আছো”, “তোমার কথা আমার মনে আছে”, “তুমি গুরুত্বপূর্ণ।”--এই অনুভূতিটুকুই প্রবীণদের বাঁচিয়ে রাখে।

শরীরের ভেতরে যখন নানা রোগ বাসা বাঁধে—ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁটুর ব্যথা, শ্বাসকষ্ট—তখন মনের শক্তিই সবচেয়ে বড়ো ওষুধ। কিন্তু সেই মনটাই যদি অবহেলায় ভেঙ্গে পড়ে, তবে শরীরও দ্রুত হেরে যায়। একাকিত্ব প্রবীণদের নীরব ঘাতক। কেউ কেউ না খেয়েই দিন কাটান, কেউ কথা না বলেই ঘুমিয়ে পড়েন, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকেন—কবে আবার কেউ ডাকবে?

এক সময় প্রবীণরাই ছিলেন পরিবারের চালিকা শক্তি। সন্তানের পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে—সবকিছুতেই তাঁদের ত্যাগ আর ভালোবাসা জড়িয়ে ছিলো। আজ সেই সন্তানরাই ব্যস্ত জীবনে হয়তো বুঝতেই পারেন না, তাঁদের একটি ছোট ফোনকল বাবার-মায়ের পুরো দিনটাকে আলোকিত করে দিতে পারে। একটি “কেমন আছো?” প্রশ্ন প্রবীণের চোখে জল এনে দেয়, কিন্তু সেই জল কষ্টের নয়—ভালোবাসার।

আমাদের সমাজে এখন প্রযুক্তি আছে, স্মার্টফোন আছে, ইন্টারনেট আছে। অথচ হৃদয়ের যোগাযোগ কমে গেছে। আমরা দ্রুত বার্তা পাঠাই, কিন্তু গভীর কথা বলি না। প্রবীণদের কাছে এই দ্রুততা অর্থহীন, তাঁদের দরকার ধীর, উষ্ণ, মনোযোগী কথা। পাঁচ মিনিটের আন্তরিক আলাপ অনেক ওষুধের চেয়েও বেশি শক্তি দেয়।

প্রবীণরা আসলে বেশি কিছু চান না। তাঁরা চান কেউ তাঁদের কথা শুনুক, তাঁদের স্মৃতিগুলোকে গুরুত্ব দিক, তাঁদের অনুভূতিকে সম্মান করুক। তাঁরা চান কেউ বলুক—“আপনি আমাদের জন্যে এখনো গুরুত্বপূর্ণ।” এই কথাটা হয়তো সরাসরি বলা হয় না, কিন্তু একটি নিয়মিত ফোনকল সেই কথাটাই বলে দেয়।

আমরা যারা এখন ব্যস্ত জীবনে ছুটছি, আমাদের মনে রাখা দরকার—একদিন আমরাও এই নীরব ফোনের পাশে বসে থাকবো। আজ আমরা যদি প্রবীণদের অবহেলা করি, কাল সেই অবহেলার শিকার আমরা নিজেরাই হবো। তাই এখনই সময়, এখনই উদ্যোগ নেওয়ার সময়।

আজই একটি ফোন করুন আপনার বাবা-মাকে, দাদা-দাদীকে, কোনো একাকী প্রবীণ আত্মীয়কে। বড়ো কিছু বলার দরকার নেই—শুধু বলুন, “আমি আছি।” এই ছোট বাক্যটাই তাঁদের জীবনে বড়ো আলো হয়ে উঠবে। নীরব ফোনের ওপারে যে একাকী হৃদয় বসে আছে, সে শুধু এই আলোটুকুরই অপেক্ষায়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়