প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৮
নারী বাঁচলে মানবিক বার্ধক্য বাঁচবে

মানুষের জীবনের শুরু যেমন নারীর মাধ্যমে, তেমনি জীবনের শেষ প্রান্তের নিরাপত্তাও অনেকাংশে নির্ভর করে নারীর ওপর। জন্মের সময় একজন শিশু সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল থাকে মায়ের ওপর, আর বার্ধক্যে একজন মানুষ আবার সেই নির্ভরতার জায়গায় ফিরে যান—তখন তার প্রয়োজন হয় সেবা, সহানুভূতি এবং ভালোবাসা। এই ভালোবাসা ও সেবার প্রধান উৎস হয়ে উঠেন একজন নারী—হতে পারেন তিনি স্ত্রী, কন্যা, পুত্রবধূ কিংবা সেবিকা। তাই নারী যদি নিরাপদ, সম্মানিত ও মর্যাদাবান না হন, তাহলে মানবিক বার্ধক্যের স্বপ্নও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে।
|আরো খবর
নারী শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি পরিবারের মানবিক ভিত্তি। পরিবারে কে অসুস্থ, কে কষ্টে আছে, কে একাকীত্বে ভুগছে—এই বিষয়গুলো একজন নারী সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন। বিশেষ করে প্রবীণ সদস্যদের প্রতি নারীর দায়িত্ববোধ ও সহানুভূতি অনেক গভীর হয়। একজন কন্যা দূরে থাকলেও নিয়মিত খোঁজ নেন, একজন স্ত্রী অসুস্থ স্বামীর পাশে রাত জেগে থাকেন, একজন পুত্রবধূ শ্বশুর-শাশুড়ির ওষুধ ও খাবারের যত্ন নেন। এই নীরব দায়িত্ব পালনই প্রবীণ জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভরসা।
কিন্তু সমাজের নির্মম বাস্তবতা হলো, এই নারীরাই অনেক সময় অবহেলা, নির্যাতন এবং অসম্মানের শিকার হন। তাদের শ্রমের স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। একজন নারী যখন নিজেই নিরাপত্তাহীনতা ও অবমূল্যায়নের মধ্যে থাকেন, তখন তার পক্ষে অন্যের প্রতি পূর্ণ মমতা ও সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ মানবিক সেবা শুধু দায়িত্ব নয়, এটি একটি মানসিক অবস্থার বিষয়। যে মানুষ নিজেই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন, তার পক্ষে অন্যকে শক্তি দেওয়া সম্ভব হয় না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি নারীই একদিন প্রবীণ হবেন। আজ তিনি যেভাবে পরিবার ও সমাজের জন্যে কাজ করছেন, ভবিষ্যতে তিনিও একই রকম ভালোবাসা ও যত্ন প্রত্যাশা করবেন। কিন্তু যদি তিনি সারাজীবন অবহেলা ও কষ্টের মধ্যে থাকেন, তাহলে তার বার্ধক্য হবে অসহায় ও বেদনাদায়ক। এতে করে সমাজে প্রবীণ জীবনের প্রতি এক ধরনের ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
এছাড়া, সমাজে কন্যা সন্তানের অবমূল্যায়ন ভবিষ্যতের জন্যে একটি বড়ো হুমকি। অনেক পরিবার এখনও ছেলে সন্তানকে বেশি মূল্য দেয়, কারণ তারা মনে করে ছেলে সন্তানই বার্ধক্যের ভরসা হবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। কন্যা সন্তানই আবেগগতভাবে বেশি সংযুক্ত থাকে এবং মা-বাবার পাশে থাকে। যদি সমাজে কন্যা সন্তানের সংখ্যা কমে যায় বা তাদের অবহেলা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রবীণদের সেবা করার মতো মানবিক শক্তিও কমে যাবে।
মানবিক বার্ধক্য শুধু অর্থ বা সম্পদের ওপর নির্ভর করে না। অনেক ধনী প্রবীণও একাকীত্ব ও অবহেলায় কষ্ট পান, আবার অনেক সীমিত আয়ের প্রবীণ ভালোবাসা ও যত্ন পেয়ে শান্তিতে থাকেন। এই ভালোবাসা ও যত্নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন একজন নারী। তাই নারীর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়লে মানবিক বার্ধক্যের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে যাবে।
নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু নারীর অধিকার নয়, এটি একটি মানবিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। পরিবারে মেয়েদের সমান গুরুত্ব দিতে হবে, তাদের মতামতকে মূল্য দিতে হবে এবং তাদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একজন শক্তিশালী নারীই একটি শক্তিশালী পরিবার এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারেন।
পরিশেষে বলা যায়, নারী বাঁচলে শুধু একটি মানুষ বাঁচে না, একটি প্রজন্ম বাঁচে, একটি মানবিক মূল্যবোধ বাঁচে। আর এই মানবিক মূল্যবোধই প্রবীণ জীবনের শেষ আশ্রয়। তাই নারীকে বাঁচানো, নারীকে সম্মান করা এবং নারীকে নিরাপদ রাখা মানে নিজের ভবিষ্যৎ বার্ধক্যকে বাঁচানো। নারী বাঁচলে মানবিক বার্ধক্য বাঁচবে—এটি শুধু একটি আবেগের কথা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক সত্য।





