বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০০

থেমে গেলো গানের পাখির পরিচিত কণ্ঠ

স্মৃতিতে থাকবেন ইতু চক্রবর্তী

কবির হোসেন মিজি
স্মৃতিতে থাকবেন ইতু চক্রবর্তী

চাঁদপুরের সংগীতাঙ্গনে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের উপস্থিতি শব্দে নয়, আবহে টের পাওয়া যায়। কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত শিক্ষিকা ইতু চক্রবর্তী ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি শুধু গান গাইতেন না, গানকে বুকের ভেতর লালন করতেন। শেখাতেন, ছড়িয়ে দিতেন, আগলে রাখতেন। চাঁদপুরের সেই পরিচিত মুখ গানের পাখি কণ্ঠশিল্পী ইতু চক্রবর্তীর কণ্ঠ চিরতরে থেমে গেছে। গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ দিবাগত রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণ চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্যে শুধু একটি মৃত্যু নয়, এক দীর্ঘ অধ্যায়ের নীরব সমাপ্তি।

চাঁদপুর শহরের গুয়াখোলা রোডস্থ পঞ্চবর্তী পাড়ার মেয়ে ইতু চক্রবর্তী শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি বড়ো বোন বাচ্চু চক্রবর্তীর কাছে তাঁর সংগীতের হাতেখড়ি নেন। ভারতে নজরুল সংগীতের এক প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে তিনি নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। চাঁদপুরে ফিরে এসে তাঁর সংগীতচর্চা আরো গভীর হয় প্রখ্যাত শিক্ষক সংগীত গুরু প্রয়াত শীতল ঘোষালের সান্নিধ্যে।

শুধু মঞ্চের শিল্পী হিসেবেই নয়, একজন দায়িত্বশীল সংগীত শিক্ষিকা হিসেবেও ইতু চক্রবর্তীর অবদান স্মরণযোগ্য। চাঁদপুর ললিতকলা সংগীত প্রতিষ্ঠান ও জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে তিনি দীর্ঘদিন গানের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। অসংখ্য শিক্ষার্থীর কণ্ঠে যে আত্মবিশ্বাস, তাল আর আবেগ, তার পেছনে ছিলো তাঁর নিরবচ্ছিন্ন শ্রম। নবারুণ শিশু শিক্ষা নিকেতনের অধ্যক্ষ হিসেবে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশেও তিনি রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও ছিলো তাঁর নিবিড় সম্পর্ক।

নৃত্যধারা সংগঠনের সভাপতি এবং চতুরঙ্গ সাংস্কৃতিক সংগঠনের নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনি চাঁদপুরের নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে সক্রিয় ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন। ছাত্র-ছাত্রী, সহশিল্পী, সংগঠক ও দর্শক মিলিয়ে তাঁর চারপাশে গড়ে উঠেছিলো এক ভালোবাসার বৃত্ত।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন কিডনি ও ফুসফুসজনিত জটিলতায় ভোগার পর গেলো ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এমন মৃত্যুর খবরে চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। ইতু চক্রবর্তীকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রায় সব ক’জন সংস্কৃতিকর্মী নিজস্ব ফেসবুক আইডিতে এই গানের পাখির মৃত্যুর সংবাদটি পোস্ট করে শোক প্রকাশ করেছেন। পরদিন চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে তাঁর মরদেহ নেওয়া হলে সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান। সেই দৃশ্য যেন বলছিলো, একজন মানুষ চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আর স্মৃতি থেকে যাবে আজীবন।

ইতু চক্রবর্তীর মৃত্যুতে চাঁদপুর শিল্পকলা একাডেমি, চতুরঙ্গ সাংস্কৃতিক সংগঠন, নৃত্যধারা, নবারুণ শিশু শিক্ষা নিকেতন, চতুরঙ্গ সাংস্কৃতিক সংগঠন, বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠী, সপ্তসুর, অনন্যা নাট্যগোষ্ঠী, চাঁদপুর ড্রামা, সপ্তরূপা নৃত্য শিক্ষালয়, রংধনু সাংস্কৃতিক সংগঠন, চাঁদপুর মঞ্চ, স্বরলিপি নাট্যগোষ্ঠী, নটমঞ্চ সহ জেলার বিভিন্ন নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। শোকবার্তায় তাঁরা বলেছেন, ইতু চক্রবর্তী ছিলেন চাঁদপুরের সংগীতচর্চার এক নির্ভরযোগ্য বাতিঘর। তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। মঞ্চ নীরব হলেও তাঁর কণ্ঠ নীরব হবে না। শিক্ষার্থীদের গানে, যে কোনো অনুষ্ঠানের স্মৃতিতে, কিংবা চাঁদপুরের সংস্কৃতির ইতিহাসে ইতু চক্রবর্তী বারবার ফিরে আসবেন। গানের স্মৃতিতেই তিনি বেঁচে থাকবেন আজীবন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়