প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৬
নারীর সব লক্ষণের বাস্তব রূপ দেবী মনসা!

নারীই জগৎজননী আদ্যাশক্তি মহামায়া, করালবোধিনী কালী, রজোগুণের (লাল আভার রজস্বলা) সাবিত্রী, বিষস্ফোটকদায়িনী শীতলা, আবার বিষপ্রদায়িনী ও হারিণী মনসা। শ্রাবণের শেষ দিনে বাংলার ঘরে ঘরে দেবী মনসা পূজিত হয়ে থাকেন সর্পের দেবীরূপে।
মনসা সিদ্ধযোগিনী, সর্পের দেবী। জগৎসংসারে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে একজন নারীর যে গুণগুলো থাকা প্রয়োজন এবং অধিকার আদায়ের জন্যে যা করা দরকার, তা-ই করেছেন পদ্মারূপিণী পাতালদেবী, কশ্যপের মানসকন্যা দেবী মনসা। যিনি কোনো ধর্মের সীমানায় আবদ্ধ নন; বাংলার হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসীÑসকলেরই আরাধ্য দেবী। বর্ষায় তিনি পূজিত হয়ে থাকেন নদীবিধৌত অঞ্চলে।
ভ্রাতা বাসুকির পরামর্শে সর্পকুল রক্ষার্থে জরৎকারু নামে একজন ছলনাময়ী নারীরূপে নিজেকে অধিষ্ঠিত করলেন মহাতেজোময় মুনি জরৎকারুর সেবাকার্যে শর্তযুক্ত হয়ে। সেবার পাশাপাশি একজন নারী হিসেবে কামনা চরিতার্থ করার প্রয়াসকে কাজে লাগিয়ে মুনির তেজোময় ব্রহ্মরাশি দ্বারা নিজের গর্ভসঞ্চার করলেন স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের পরামর্শানুযায়ী (সকল নারীর কাম্য ব্রহ্মতেজোময় বা বীরপুরুষের ঔরসে সন্তান লাভ, যে সন্তান বংশ রক্ষা করবে)। ছলনা দ্বারা নিজের কার্যসিদ্ধি হলেও শর্তভঙ্গ করায় মুনি কর্তৃক লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে গৃহত্যাগ করতে হয়েছে দেবীকেÑযা অতীত ও বর্তমান পুরুষশাসিত সমাজেরই এক বাস্তব চিত্র। কিন্তু মনসা কখনো স্বামী জরৎকারুকে নিন্দা বা অমর্যাদা করেননি, কারণ সনাতনী নারীদের স্বামীই পরম গতি।
একজন মমতাময়ী বাঙালি রমণীর ন্যায় মুনি জরৎকারুর ঔরসজাত সন্তান আস্তিককে অতি গোপনে লালন-পালন করার পাশাপাশি দেবরাজ ইন্দ্র এবং ভ্রাতা বাসুকির সহযোগিতায় প্রকৃত ব্রহ্মজ্ঞানী করে তুলেছেন ভবিষ্যৎ সর্পকুল রক্ষার জন্য (রাজা পরীক্ষিতের পুত্র জন্মেজয় কর্তৃক আয়োজিত সর্পসত্র যজ্ঞ পণ্ড করেছিলেন আস্তিক মুনি)। যোগ্য সন্তান গড়ার এমন চিন্তা-চেতনা সকল নারীর মাঝেই বিদ্যমান রয়েছে বলেই সন্তানের কর্মে মায়েরাই বেশি গর্বিত ও আনন্দিত হয়ে থাকেন, যেমনটা হয়েছিলেন দেবী মনসা।
শিবের বীর্যে পাতালের নাগমাতা মনদেবীর মননমূর্তি থেকে সৃষ্ট হওয়ার পর পিতা শিবের স্নেহধন্য হলেও কৈলাসে মাতা পার্বতীর সন্দেহবশত ভর্ৎসনা এবং হাতের শাখার আঘাতে চোখ হারিয়ে ‘কানি’ নামে পরিচয় নিয়েই জরৎকারু মুনির সহধর্মিণী হন। পরবর্তীতে স্বামী-আজ্ঞা লঙ্ঘন করায় সংসার থেকে বিতাড়িত হয়েও নিজেকে মর্ত্য ও স্বর্গের দেবীরূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে কতই না লড়াই করতে হয়েছে মনসাকে!
পদ্মপুরাণের বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের কাহিনীতে ছলনার দেবী মনসা নিজের প্রভাব জানান দিতে সর্পকুলের মাধ্যমে বিষপ্রয়োগ ও বিষহরণের কাহিনী লোকসাহিত্যের অন্যতম উপজীব্য। নিজের দেবীত্বের স্বীকৃতি আদায়ের জন্যে শিবভক্ত চাঁদ সওদাগরকে নিঃস্ব করে দিয়ে নিজের পূজার অধিকার আদায়ের মাধ্যমে মর্ত্য ও স্বর্গের দেবীরূপে পুনরায় নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে নিঃস্ব চাঁদ সওদাগরকে ফিরিয়ে দিলেন তাঁর হৃত সম্পদ ও সম্মান; সমাপ্ত হলো তাঁর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। যেমনি করে নারী নিজ পিতার ঘর ও স্বামীর ঘরের মধ্যে স্বীয় কর্ম দ্বারা প্রতিষ্ঠা লাভ করে থাকেন এবং প্রমাণ করেন নারী সব পারেন। সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের প্রকৃত রূপই নারী, আর এই নারীই প্রকৃতি (মহামায়া)।
কিন্তু বর্তমান পথভ্রষ্ট নারীদের বেহাল আচরণ ও সংসার ভাঙার প্রবণতায় মনসার মতো আদর্শ মাতাগণ লজ্জিত। বাস্তবে তিনি সেই নারীদের পূজা গ্রহণ করেন না। আবার যারা তাঁরই মতো অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিয়োজিত, তাদেরকে তিনি আহ্বান জানাচ্ছেনÑজাগো নারী জাগো! অধর্ম অবসানে তোমার প্রলয়-ঢঙ্কা বাজাও! তোমরা অভয়া নও, পূর্ণিমা নও; তোমরা অন্যায়ের ধ্বংসলীলায় করালবোধিনী কালী, সংসারে সেবাময়ী দশভূজা দুর্গা আর সোহাগে বিষহরী মনসা।
লেখক : সারথি, শারদাঞ্জলি ফোরাম এবং সনাতনী গবেষক।






