প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০১:১৪
মেডিকেল কলেজের পরও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার অপেক্ষায় জেলার লাখো মানুষ

প্রায় ২৬ লাখ মানুষের জেলা চাঁদপুর। নদীবেষ্টিত এই জেলার মানুষের জন্যে স্বাস্থ্যসেবা শুধু একটি মৌলিক অধিকারই নয়, বরং অতি জরুরি প্রয়োজন। বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই দেশের অন্যান্য জেলার সাথে সাথে চাঁদপুরের স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ নির্মাণের বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। তবুও বাস্তব প্রশ্ন রয়ে গেছে—জটিল রোগে আক্রান্ত একজন চাঁদপুরবাসী কি এখনও ঢাকা বা চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিতে বাধ্য?
|আরো খবর
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার দেশের বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে ধাপে ধাপে আইসিইউ, ডায়ালাইসিসসহ নানা বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা চালু করছে। ২০২৬ সালেই একযোগে ১০টি জেলা হাসপাতালে নতুন আইসিইউ উদ্বোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং জেলা সদরের মন্ত্রী-এমপিদের উদ্যোগে স্বাস্থ্যসেবার মান ও প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে চাঁদপুর জেলা সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালটি এসব অগ্রগতির তুলনায় এখনও অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন জেলার সাধারণ মানুষ।
চাঁদপুরের মানুষ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারির মতো উচ্চমাত্রার চিকিৎসা নয়, বরং অন্তত আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ, ডায়ালাইসিস এবং সংকটাপন্ন রোগী ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক বিশেষায়িত সেবাগুলো বেশি প্রত্যাশা করছেন—যেগুলো ইতোমধ্যে দেশের অনেক ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে চালু রয়েছে। অথচ অন্যান্য জেলায় এসব সেবা সহজলভ্য হলেও চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে এখনও সেগুলোর সবটুকুন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী মানিকগঞ্জ জেলার জনসংখ্যা প্রায় ১৫.৬ লাখ, ফেনী জেলার প্রায় ১৬.৫ লাখ, মুন্সীগঞ্জ জেলার ১৬ লাখের কিছু বেশি, শেরপুরে প্রায় ১৫ লাখ, মাদারীপুরে প্রায় ১৩.৩ লাখ এবং গোপালগঞ্জ ও চুয়াডাঙ্গা উভয় জেলার জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ। অথচ এসব জেলার তুলনায় অনেক বেশি, ২৬ লাখের বেশি মানুষের আবাসস্থল চাঁদপুর জেলায় এখনও একটি কার্যকর আইসিইউর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, যা জেলার স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
জামালপুর জেলায় ১০ শয্যাবিশিষ্ট আইসিইউ সেবা চালু রয়েছে। বিপরীতে বৃহৎ জনসংখ্যা ও বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসর নিয়ে গঠিত চাঁদপুর জেলায় এখনো একটি কার্যকর আইসিইউরও ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জনসংখ্যা দিয়ে এ ধরনের বৈষম্যের কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না; রোগীর চাপ, হাসপাতালের অবকাঠামো, রেফারেল কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প এবং নীতিনির্ধারণী অগ্রাধিকারও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
সরকারের ২০২৫–২৬ অর্থ বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুযায়ী, এস্টাবলিশমেন্ট অব চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ এবং হসপিটাল নার্সিং কলেজ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৭০.৭৪ কোটি টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত। এটি প্রমাণ করে যে, সরকার চাঁদপুরকে ভবিষ্যতে একটি আঞ্চলিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
চাঁদপুর মেডিকেল কলেজে বর্তমানে এমবিবিএস শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কলেজটিতে ৭৫টি এমবিবিএস আসন রয়েছে এবং কয়েক শ' শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। নিজস্ব হাসপাতাল ভবন চালু না হওয়ায় আপাতত ২৫০ শয্যার চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ, চিকিৎসা শিক্ষা শুরু হলেও পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো এখনও শুরু হয় নি।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে সাধারণ ও মাঝারি জটিলতার চিকিৎসা সম্ভব হলেও উচ্চতর বিশেষায়িত চিকিৎসা এখনও মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক—ওপেন হার্ট সার্জারি, নিউরোসার্জারি, ক্যান্সারের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা, কিডনি প্রতিস্থাপন, উন্নত কার্ডিয়াক ইন্টারভেনশন, বহু-বিভাগবিশিষ্ট সুপার-স্পেশালিটি আইসিইউ। ফলে এসব রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীকে ঢাকা বা চট্টগ্রামের বিশেষায়িত হাসপাতালে যেতে হয়।
চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহে বহু বছর ধরে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত বিভাগ গড়ে উঠেছে। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, উন্নত অপারেশন থিয়েটার এবং অধিকতর বিশেষায়িত সেবা পাওয়া যায়। অন্যদিকে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ এখনও অবকাঠামো উন্নয়নের পর্যায়ে। তাই একই ধরনের চিকিৎসা সুবিধা এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এটি উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরের ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে নিয়মিত বড় ও ছোট অস্ত্রোপচার, প্রসূতি সেবা এবং জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালটিতে নতুন যন্ত্রপাতিও যুক্ত হয়েছে এবং কিছু সেবার মান উন্নত হয়েছে। এটি জেলার মানুষের জন্যে ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও সুপার-স্পেশালিটি চিকিৎসার চাহিদা এখনও পুরোপুরি পূরণ হয়নি।
জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও জনবল সংকট একটি চ্যালেঞ্জ। উদাহরণ হিসেবে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের বহু পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছে, যার ফলে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সাধারণ মত হলো, একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করলেই সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের বিশেষায়িত চিকিৎসা চালু করা সম্ভব হয় না। এর জন্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি, আইসিইউ, ল্যাব, ব্লাড ব্যাংক, নার্সিং জনবল এবং ধারাবাহিক অর্থায়ন প্রয়োজন। তাই অবকাঠামো সম্পূর্ণ হলে চাঁদপুরের স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চাঁদপুরের স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নের যাত্রা শুরু হয়েছে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। ১ হাজার ৩৭০ কোটির বেশি টাকার প্রকল্প, মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। তবে প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত জেলার অনেক মানুষ এখনও উন্নত চিকিৎসার জন্যে রাজধানীমুখী হবেন—এটাই বর্তমান বাস্তবতা। এখন চাঁদপুরবাসীর সবচেয়ে বড়ো প্রত্যাশা, চলমান প্রকল্প দ্রুত শেষ হোক এবং জেলার মানুষ নিজ জেলাতেই অধিকাংশ বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতভাবে পান।
মন্তব্য
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, জেলা সদর হাসপাতাল-সংক্রান্ত বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের বক্তব্য নেওয়াই অধিক উপযুক্ত হবে।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ কে. এম. মাহাবুবুর রহমান বলেন, জায়গা সংকটের কারণে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ স্থাপন করা সম্ভব নয়। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে যেখানে ৫/৬ একর সম্পত্তি রয়েছে, আমার জেলা হাসপাতালে মাত্র ২ একর সম্পত্তি রয়েছে। আইসিইউ স্থাপন করতে ৩ হাজার স্কয়ার ফিট জায়গা প্রয়োজন। নতুন ভবন প্রয়োজন। আমার এখানে জায়গা সংকট রয়েছে। পরিপূর্ণ জায়গা না থাকার কারণে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না।








