প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৩
বাংলা উপন্যাসে নারীর আত্মহনন

সারসংক্ষেপ
|আরো খবর
বাংলাদেশের অন্যতম সামাজিক ব্যাধি আত্মহত্যা। নানা কারণে মানুষ নিজেকে হত্যা করে। ২০২৪ সালে সারাদেশে ৩১০ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন, যার মধ্যে ৬১ শতাংশই নারী। বাংলার বিভিন্ন উপন্যাস ও নাটকে নারীর আত্মহননের চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে; কিন্তু এ নিয়ে পূর্বে কোনো গবেষণা হয়নি। সাহিত্যে সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে আত্মহননের উপস্থাপন কীভাবে নারীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সংকটকে তুলে ধরে, তা-ই এই গবেষণার মূল আলোচ্য বিষয়। প্রবন্ধটিতে প্রেম, নির্যাতন, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে নারীর আত্মহত্যার চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। এছাড়া আত্মহননকে কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাংলা উপন্যাস ও নাটকে নারী চরিত্রগুলোর আত্মহত্যার কারণ, পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট বিষয় বিশ্লেষণই এ গবেষণা-প্রবন্ধের উপজীব্য বিষয়।
শব্দসংক্ষেপ (কবুড়িৎফং) : নারী, আত্মহত্যা, প্রেম, সমাজ, দ্বন্দ্ব।
কোনো ব্যক্তি যখন নিজেই নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকেন, সে অবস্থাকে আত্মহত্যা বলে। আত্মহত্যার নানা কারণ রয়েছে; যেমন : তীব্র হতাশা, জীবনকে অর্থহীন মনে করা, নিজের বা অন্যের প্রতি প্রবল ঘৃণা ইত্যাদি। দার্শনিকেরা আত্মহত্যার নানা রূপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দ্যুরখেইম (১৮৫৮-১৯১৭) আত্মহত্যাকে তিন ভাগে ভাগ করেছেনÑআত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা, পরার্থমূলক আত্মহত্যা ও নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা।
ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি বা বন্ধন দুর্বল হলে যে ধরনের আত্মহত্যা হয়, সেটি আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে অতিরিক্ত সংহতি বা ঐক্যের কারণে সংঘটিত আত্মহত্যা হলো পরার্থমূলক আত্মহত্যা। অন্যদিকে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার প্রতি ব্যক্তির চরম আস্থাহীনতা ও হঠাৎ সামাজিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের ফলে নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা সংঘটিত হয়। এছাড়া কৃপাহত্যার (ঊঁঃযধহধংরধ) কথাও বিশ্বব্যাপী আলোচিত। অনিরাময়যোগ্য রোগ ও নিদারুণ বেদনাক্রান্ত ব্যক্তিকে আরও কষ্টভোগ থেকে নিষ্কৃতি দিতে যে হত্যা করা হয়, সেটি কৃপাহত্যা হিসেবে বিবেচিত। এ হত্যাকে নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়ামসহ বিভিন্ন দেশ বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো দেশ আত্মহত্যাকে সমর্থন করে না; সব ধর্মেও আত্মহত্যাকে মহাপাপ হিসেবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
বাংলা উপন্যাসে এমিল দ্যুরখেইম বর্ণিত দু-ধরনের আত্মহত্যা দেখা যায়Ñআত্মকেন্দ্রিক ও পরার্থমূলক আত্মহত্যা। উদাহরণ দেওয়া যাক : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৪-১৯৫০) ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের পার্শ্বচরিত্র লীলার আত্মহত্যাটি ছিল আত্মকেন্দ্রিক। আর মাইকেল মধুসূদন দত্তের (১৮২৪-১৮৭৩) ‘কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৬১) নাটকের কৃষ্ণকুমারীর আত্মহত্যাটি ছিল পরার্থমূলক।
বাংলা উপন্যাসের অনেক নারী চরিত্রকে আত্মহত্যা করতে দেখা গেছে। তাদের আত্মহত্যার কারণও বিচিত্রÑকেউ জগতের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে, কেউ প্রেমে ব্যর্থতা নিয়ে, আবার কেউ সমাজের লাঞ্ছনা-গঞ্জনার ভয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) লিখিত ‘কপালকুণ্ডলা’ (১৮৬৬) উপন্যাসটির মূল চরিত্র কপালকুণ্ডলা। তাকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে। সে অরণ্যচারিণী। ঘটনাচক্রে দ্বীপে নির্বাসিত নবকুমারকে কাপালিকের হাত থেকে রক্ষা করে কপালকুণ্ডলা এবং তার সঙ্গী হয়। কাপালিক নবকুমারকে বলি দিতে চেয়েছিল; কপালকুণ্ডলার সহযোগিতায় নবকুমার পালিয়ে গেলে দেবী রুষ্ট হন। তিনি নির্দেশ দেন, “কপালকুণ্ডলাকে আমার নিকট বলি দিবে। যতদিন না পার, আমার পূজা করিও না।” ফলে কাপালিক তার পালিত কন্যাকে বলি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নবকুমারের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। কপালকুণ্ডলা ও নবকুমার সপ্তগ্রামে সংসার করছিল, কিন্তু সেখানে বাধা সাধে নবকুমারের প্রথম স্ত্রী পদ্মাবতী ওরফে লুৎফউন্নিসা। কাপালিক ও পদ্মাবতীর ষড়যন্ত্রে নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে চরিত্রহীন মনে করে এবং ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে কাপালিকের হাতে সোপর্দ করে। নবকুমার তাকে অবিশ্বাস করেছে ও দ্বিচারিণী মনে করেছেÑএটি জানতে পেরে কপালকুণ্ডলা ভীষণ আহত হয়। একদিকে দেবীর আদেশে পালক-পিতা তাকে বলি দিতে চায়, অন্যদিকে স্বামী তাকে অবিশ্বাস করে; এসব বিষয় কপালকুণ্ডলাকে মানসিকভাবে মৃত করে ফেলে। সে দেবীর চরণে আত্মবিসর্জন করার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও শেষ পর্যন্ত তাকে কাপালিক বলি দিতে পারেনি, তার আগেই নদীগর্ভে কপালকুণ্ডলার সলিলসমাধি ঘটে। “এইরূপ উচ্চ শব্দ করিয়া নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে হৃদয়ে ধারণ করিতে বাহু প্রসারণ করিলেন। কপালকুণ্ডলাকে আর পাইলেন না। চৈত্রবায়ুতাড়িত এক বিশাল তরঙ্গ আসিয়া, তীরে যথায় কপালকুণ্ডলা দাঁড়াইয়া, তথায় তটঅধোভাগে প্রহত হইল; অমনি তটমৃত্তিকাখণ্ড কপালকুণ্ডলা সহিত ঘোর রবে নদীপ্রবাহমধ্যে ভগ্ন হইয়া পড়িল। নবকুমার তীরভঙ্গের শব্দ শুনিলেন, কপালকুণ্ডলা অন্তর্হিত হইল দেখিলেন। অমনি তৎপশ্চাৎ লম্ফ দিয়া জলে পড়িলেন। নবকুমার সন্তরণে নিতান্ত অক্ষম ছিলেন না। কিছুক্ষণ সাঁতার দিয়া কপালকুণ্ডলার অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। তাহাকে পাইলেন না, তিনিও উঠিলেন না।”
কপালকুণ্ডলা আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত, সে দেখেছে এ সমাজ ও জীবনে তার কোনো বন্ধন নেই, কেউ তাকে ভালোবাসে নাÑনবকুমারও নয়। দ্বিতীয়ত, কাপালিকের কাছে মানুষ হয়েছে বিধায় সে-ও দেবীর অনুরাগী। এ কারণে কাপালিক যখন তাকে শ্মশানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তখন সে আকাশে দেবীকে দেখেছে; তার মনে হয়েছে ভৈরবী তাকে ডাকছে। বঙ্কিম অনেকটা নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়েছেন কপালকুণ্ডলাকে। তাকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য সমালোচকেরা বঙ্কিমের সমালোচনা করেছেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের আরেকটি উপন্যাস ‘বিষবৃক্ষ’ (১৮৭৩)। উপন্যাসের নায়ক নগেন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী সূর্যমুখী, কিন্তু নগেন্দ্র বিধবা কুন্দনন্দিনীর প্রেমে আসক্ত। সূর্যমুখী অনেক চেষ্টা করেও তাদের প্রণয় রোধ করতে পারে না। শেষে বাধ্য হয়ে নগেন্দ্রের সঙ্গে কুন্দের বিয়ে দিয়ে সূর্যমুখী গৃহত্যাগ করে। তখন নগেন্দ্রের অনুশোচনা হয় এবং বিয়ের মাত্র পনেরো দিনের ভেতরেই কুন্দের প্রতি তার মোহ কেটে যায়। তিনি সূর্যমুখীকে ঘরে ফিরিয়ে আনেন। অন্যদিকে হীরা নগেন্দ্রের কাছে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হয়ে প্রতিশোধ নিতে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। তার প্ররোচনাতেই কুন্দ বিষ পান করে।
এখানে নায়ক নগেন্দ্র হলেও তার প্রেম বহুমুখী। তাকে ঘিরে কেবল কুন্দ নয়, হীরারও অনুরাগ ছিল। ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে একদিকে নগেন্দ্র ও সূর্যমুখীর যেমন পুনর্বিলন ঘটেছে, তেমনি কুন্দের আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। মৃত্যুশয্যাতেও তার মনে নগেন্দ্রের প্রতি প্রণয় কমেনি। উপন্যাসের ভাষ্য : “কুন্দ, বিলয়ভূয়িষ্ঠ জলদান্তর্বর্তিনী বিদ্যুতের ন্যায় মৃদু মধুর দিব্য হাসি হাসিয়া কহিল, ‘তাহা ভাবিও না। যাহা বলিলাম, তাহা কেবল মনের আবেগে বলিয়াছি। তোমার আসিবার আগেই আমি মনে স্থির করিয়াছিলাম যে, তোমাকে দেখিয়া মরিব। মনে মনে স্থির করিয়াছিলাম যে, দিদি যদি কখনও ফিরিয়া আসেন, তবে তাহার কাছে তোমাকে রাখিয়া আমি মরিবÑআর তাহার সুখের পথে কাঁটা হইয়া থাকিব না। আমি মরিব বলিয়াই স্থির করিয়াছিলামÑতবে তোমাকে দেখিলে আমার মরিতে ইচ্ছা করে না।’
আরেকটি বিষয়ও এখানে উল্লেখ করার মতো। নগেন্দ্রের প্রেমে মগ্ন হয়ে হীরাও আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত করেনি। তার মতে, অন্যের জন্য সে মরবে কেনÑবিষ কুন্দ অথবা নগেন্দ্রকে দেবে! সে যে সফল হয়েছিল, তা কুন্দের আত্মহত্যার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত। মূলত নগেন্দ্রের অনিয়ন্ত্রিত প্রেম কুন্দ ও হীরার জীবনকে তছনচ করে দিয়েছে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ (১৯২৯)। এই আখ্যানের পরবর্তী অংশ হিসেবে লেখা হয়েছে ‘অপরাজিত’ (১৯৩২) উপন্যাসটি। উপন্যাসে অপুর বান্ধবী লীলা বিষপানে আত্মহত্যা করে। তার সংসারে শান্তি ছিল না; স্বামী মাতাল ও অন্য নারীতে আসক্ত। লীলা চলে এসেছে মেয়েকে নিয়ে, কিন্তু পরে স্বামী কৌশলে মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে যায়। লীলা প্রতিশোধ নিতে হীরক সেনের সঙ্গে এক বছর নিরুদ্দেশ থাকে। বর্ধমানের নিজের বাড়িতেও তার নাম নেওয়া যেত না। কিন্তু হীরক সেন? সে-ও লীলাকে ব্যবহার করেছে মাত্র, তার টাকা উড়িয়েছে দু-হাতে। অন্যদিকে মেয়ের জন্য লীলা প্রায়ই কাঁদত। তার আত্মহত্যার মূল কারণ ছিল সমাজস্থ মানুষের ঘৃণা, অবহেলা ও নিজের ওপর অনাস্থা। অপুর ভাষায় : “সেই লীলা! তাহার মুখে এ রকম দুর্বল ধরনের কথাবার্তা, সে কি কখনও স্বপ্নেও ভাবিয়াছিল। অপু এক মুহূর্তে সব বুঝিলÑঅভিমানিনী তেজস্বিনী লীলা আর সব সহ্য করিতে পারে, লোকের ঘৃণা তাহার অসহ্য। গত কয়েক বৎসরে ঠিক তাহাই জুটিয়াছে তাহার কপালে। এতদিন সেটা বোঝে নাইÑসম্প্রতি বুঝিয়াছেÑজীবনের উপর টান হারাইতে বসিয়াছে।”
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৮-১৯৭১) বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ (১৯৫১)। উপন্যাসের পার্শ্বচরিত্র পাখি আত্মহত্যা করেছিল। উপন্যাসের প্রধান দুই চরিত্র বনওয়ারী ও করালীর দ্বন্দ্বে বলি হয় সে। বনওয়ারীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের একপর্যায়ে সুবাসীকে কেড়ে নেয় করালী এবং তাকে বিয়ে করে ঘরে তোলে। সুবাসীও করালীকে পছন্দ করত। এ বিষয়টি সহ্য করতে না পেরে করালীর প্রথম স্ত্রী পাখি আত্মহত্যা করে। মৃত্যুর আগে পাখি করালীকেও হত্যা করতে চেয়েছিল। কাটারি দিয়ে নিজের মাথায় কোপ মারতে গিয়ে হঠাৎ সে করালীর মাথায়ও আঘাত করে। খানিকটা চোট পেলেও করালী প্রাণে বেঁচে যায়। ঔপন্যাসিক তার আত্মহত্যার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে : “পরদিন সকালে করালী এল কাহারপাড়ায় মাথায় ডাক্তারখানার ফেটা বেঁধে। তখন পাখী সাধের খাঁচায় মরে পড়ে আছে। তার সাধের কোঠাঘরের সাঙায় দড়ি বেঁধে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলছে; তবে হ্যাঁ, করালীর কপালে পাখী চিরস্থায়ী দাগ এঁকে দিয়ে গিয়েছে। পাখীকে ভুলবার পথ রাখে নাই পাখী।”
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ (১৯৩৬) উপন্যাসের যাদব পণ্ডিত চরিত্রটির কথা অনেকেরই মনে আছে। মানিকের সৃষ্ট চরিত্রটি ছোট, কিন্তু খুব রহস্যময়। সিদ্ধপুরুষ ও অলৌকিক ক্ষমতাধর হিসেবে গ্রামে তার খ্যাতি রয়েছে। তার স্ত্রী পাগলাদিদি। অন্যদিকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত চিকিৎসক শশী অলৌকিকতায় বিশ্বাস করে না। ধর্মজ্ঞানী যাদব তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। যাদব বলে, তার কাছে আছে ‘সূর্যবিজ্ঞান’-এর জ্ঞান; মূলত এসব তার ছলনা। শশী এসবের প্রতি অনাস্থা দেখালে কথায় কথায় যাদব পণ্ডিত বলে বসেন, “সূর্যবিজ্ঞান যে জানে, তার অসাধ্য কী? অতীত ভবিষ্যৎ তার নখদর্পণে। কবে কী ঘটিবে জীবনে কিছুই তাহার অজানা থাকে না। মৃত্যুর দিনটি পর্যন্ত দশ-বিশ বছর আগে থেকে জেনে রাখতে পারে।” এই আকস্মিক ঘোষণাই তাকে ইচ্ছেমৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। মূলত মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হলেও ধুরন্ধর যাদব খ্যাতি পেতে চান; তিনি মানুষের বিশ্বাস ও অলৌকিক সত্তার পরিচয় নিয়ে সাধুরূপে বহুকাল বেঁচে থাকতে চান। সে কারণে যাদব বলেন, রথের দিনে তার মৃত্যু হবে। শশী তাকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করলেও তিনি আফিম খেয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। তার এই ইচ্ছামৃত্যু মূলত আত্মহত্যাই।
আমাদের আলোচনার প্রেক্ষাপট যাদব নন, তার স্ত্রী পাগলাদিদি। তিনিও যাদবকে অনুসরণ করেন। যদিও প্রথমে যাদবের ইচ্ছামৃত্যুর কথা শুনে পাগলাদিদি আতঙ্কিত হন ও ভেঙে পড়েন, কিন্তু একসময় তার কাছেও জীবনের চেয়ে মানুষের ভাবাবেগ মুখ্য হয়ে ওঠে। তিনি যাদবের ফাঁকি জেনেও ইচ্ছামৃত্যুকেই বেছে নেন। শশী তাদের প্রাণরক্ষায় নানা উপায় বের করলেও সেগুলো সফল হয় না। পাগলাদিদিও পালাতে চান না, অমরত্ব চান। তাই তিনি একপর্যায়ে শশীকে বলেন :
“পালিয়ে গিয়েই বা কী হবে বলো? ক বছর আর বাঁচিব। বিদেশে নতুন লোকের মধ্যে কত কষ্ট হবে, মনে একটা আপসোসও থাকবে। অমন করে দুটো একটা বছর বেশি বেঁচে থেকে সুখটা কী হবে, তাই ভাবি। তার চেয়ে এভাবে যাওয়া ঢের বেশি গৌরবের।”
উপন্যাসে ইচ্ছামৃত্যুর পেছনে যাদবের ‘অমর’ হওয়ার বাসনার পাশাপাশি অশিক্ষিত ও ধর্মান্ধ মানুষের অবদান আছে। উপন্যাসে কয়েকবার যাদব ও পাগলাদিদি ইচ্ছামৃত্যুর হাত থেকে পরিত্রাণের সুযোগ খুঁজেছেন, কিন্তু অবোধ ও অন্ধভক্তদের কারণে সে সুযোগ পাননি। পাগলাদিদির মৃত্যু তাই সচেতন মানুষের জন্য বেদনাদায়ক।
‘ওরা তিনজন’ (১৯৬০) লিখেছেন ঔপন্যাসিক নীহাররঞ্জন গুপ্ত (১৯১১-১৯৮৬)। উপন্যাসটি শুরু হয় একজন নারীর আত্মহত্যার সংবাদ দিয়ে। প্রমীলা হাস্যোজ্জ্বল ও কৌতুকপ্রিয় মানুষ। শিবনের সঙ্গে তার দুদিন আগেও দেখা হয়েছিল, স্বভাবসুলভ রসিকতাও করেছিল নির্মলের সঙ্গে। অথচ সেই মেয়েটিই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে; শিবন বা নরেনÑকারোরই তা বিশ্বাস হয় না। এ উপন্যাসে শান্তশিষ্ট বুদ্ধিমতী গীতাকেও আত্মহত্যা করতে দেখা যায়। তবে উপন্যাসে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যাÑএ নিয়ে রহস্যের বিস্তর অনুসন্ধান চলে।
শওকত ওসমানের (১৯১৭-১৯৯৮) বিখ্যাত ‘জননী’ (১৯৫৮) উপন্যাসে মাতৃত্বের চরম রূপটি তুলে ধরার পাশাপাশি উপস্থাপিত হয়েছে ধর্মের দ্বন্দ্ব, প্রান্তিক মানুষের দুঃখ-বঞ্চনা ও স্বাধিকার চেতনা। প্রথম স্বামীর মৃত্যু হলে রাজমিস্ত্রি আজহার খাঁর সঙ্গে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দরিয়া বিবির বিয়ে হয়। মাঝেমধ্যে স্বামী নিরুদ্দেশ থাকত। রোগাক্রান্ত হয়ে আজহারের মৃত্যু হলে দরিয়ার বাসায় যাতায়াত শুরু করে ফুফাত ভাই ইয়াকুব। ঘরে দুই স্ত্রী থাকার পরও দরিয়ার প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ ছিল। সাংসারিক সহযোগিতার নামে একদিন বিকেলে ক্লান্ত দরিয়াকে সে ভোগ করে। দরিয়ার বড় ছেলে মোনাদির বিষয়টি টের পেয়ে নিরুদ্দেশ হয়, চলে যায় ইয়াকুবও। কিন্তু ততদিনে দরিয়ার গর্ভে ইয়াকুবের সন্তান। অনেক কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সবার অগোচরে সে পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়। শিশুটিকে ভালোবাসতে তার কার্পণ্য হয় নাÑদরিয়া নবজাতক শিশুটিকে গোসল করায়, দুগ্ধ পান করায়, শুইয়ে দেয়। উপন্যাসের কাহিনিপ্রবাহে অনেকে ভাবতে পারেন, দরিয়া বিবি অবৈধ সন্তানকে হয়তো মেরে ফেলবে। কিন্তু সন্তানের প্রাথমিক দেখভাল করে সে নিজেই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। তার আগে সে শিশুপুত্রকে আদর করতে ভোলে না। শওকত ওসমান তার আত্মহননের দৃশ্যটি চিত্রায়িত করেছেন এভাবে :
“ভোরের ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকিতেছিল চালের বাতার কাছাকাছি ফাঁক দিয়া। তখনো বাহিরে অন্ধকার। গরুর দড়িগাছি দরিয়াবিবি নিজেই মাচাঙে দাঁড়াইয়া চালে টানাইল। শুধু প্রসূতি, ধাত্রী নয়। আর এক কর্তব্য সম্পাদনা বাকি আছে। দরিয়াবিবি যে জল্লাদ।ৃ আর দেরি করা চলে না। দরিয়াবিবি নিজের মনে উচ্চারণ করিল। ৃদড়ির ফাঁসের দিকে দরিয়াবিবি তাকাইল। সারাজীবনে কত উদ্বেগ, কত সংগ্রামজনিত ক্লান্তি ওইখানে ঝুলাইয়া রাখিয়া আজ সে নিশ্চিন্ত হইতে চায়। তার আগে দরিয়াবিবি ডিপা নিভাইয়া ঘর অন্ধকার করিয়া দিল।”
দরিয়া বিবির আত্মহত্যার সংবাদে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? রহিম বখশ, রোহিণী চৌধুরী, চৌকিদার, সাকের, আমিরন চাচিসহ অনেকেই তার মরদেহ দেখতে এসেছিল। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টের সার্টিফিকেটের কল্যাণে তার লাশ থানায় নেওয়া হয়নি। আর সদ্যোজাত পুত্রসন্তানটির স্থান হয় নিঃসন্তান হাসুবৌর কাছে। সাকেরের প্রবল আপত্তির মুখেও হাসুবৌ হাল ছাড়েনি।
আরও কয়েকটি উপন্যাসের কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। সমরেশ মজুমদারের (১৯৪৪-২০২৩) ‘আগুনবেলা’ (২০২০) উপন্যাসে সদানন্দের স্ত্রী আরশোলা মারার বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, কারণ সদানন্দ তাকে বকেছিল। ডাক্তারবাবু সময়মতো আসার কারণে স্ত্রী সাক্ষাৎ-মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। আত্মহত্যার চেষ্টার সংবাদ থানায় পৌঁছে দেয় সদানন্দের শত্রুদের কেউ। ফলে ঘটনার তদন্ত করতে বাড়িতে আসেন থানার মেজবাবু। তিনি সদানন্দকে অকপটে বলেছেন, “বলা হয়েছে ডাক্তারবাবু তখনই ছুটে না গেলে ভদ্রমহিলা বাঁচতেন না। মরে গেলে ল্যাটা চুকে যায়। স্বামীর অত্যাচারে বউ বিষ খেয়েছে কিনা তা প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু মরতে গিয়েও যদি না মরে তাহলেই হয় সমস্যা।” তার এই বক্তব্যের মধ্যে সমাজের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। সমাজে স্বামীর অত্যাচারে বহু স্ত্রী আত্মহত্যা করেন, কিন্তু সেই অত্যাচারের কথা প্রমাণ করা যায় না; ফলে দোষী স্বামীর শাস্তিও হয় না।
‘সাতকাহন’ (১৯৬৪) উপন্যাসে ললিতা বিষ খেয়েছিল। শ্যামলের সঙ্গে বিয়ে-বহির্ভূত সন্তানসম্ভবা হওয়ার দায়মুক্তি সে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চেয়েছে। সে চা-বাগানে শ্যামলকে শারীরিক সম্পর্কে না জড়াতে বাধা দিয়েছিল, কিন্তু শ্যামল শোনেনি (এ ঘটনায় শ্যামলের বাবাও আত্মহত্যা করেন)। এছাড়া সমরেশ মজুমদারের ‘ভালোবাসা থেকে যায়’ (১৯৬০) উপন্যাসে আদিবাসী নারী রম্ভা আত্মহত্যা করে। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী এই নারীটি পরোপকারী ছিলেন, অথচ তিনিই গলায় দড়ি দিয়েছেন।
হুমায়ুন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২)-এর ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ (১৯৯৪) উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। এ উপন্যাসে মতিকে কুসুম প্রচণ্ড ভালোবাসে। কুসুমের নিখোঁজ বাবা বহুদিন পর অনাথ সুরুজ আলিকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন এবং তার সঙ্গেই কুসুমের বিয়ে ঠিক হয়। মতিকে তার ওস্তাদ বলেছেন, ‘গান আর সংসার একসাথে হয় না’Ñসে কারণে মতি জীবনে বিয়ে করবে না। মতিকে না পেয়ে কুসুম বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। পুষ্পকে সে বলেও: “আমি বিষ খাইব বইল্যা ঠিক করছি”। এতদিন খায়নি, কারণ রাজবাড়ির মেয়ে শাহানা সেখানে ছিল। সে চিকিৎসক, বিষ খেলেও তাকে বাঁচিয়ে ফেলত। এখন সে নেই; সুতরাং কুসুম নিশ্চিন্তে মরতে পারবে। পুষ্পকে প্রথমে গুরুতরভাবে কথাটি বললেও পরে তামাশা বলে উড়িয়ে দেয় সে, কিন্তু পরমুহূর্তেই বিষ পান করে। উপন্যাসের ভাষ্য : “কুসুম খিল খিল করে হাসছে। হাসির শব্দে বিরক্ত হয়ে ধমক দিতে গিয়ে মনোয়ারা ধমক দিলেন না। আহারে দুঃখী মেয়ে। মনের আনন্দে একটু হাসছে হাসুক। সে নৌকা ঘাটায় যেতে চেয়েছিল তিনি যেতে দেননি। এর জন্যেও মায়া লাগছে। যেতে দিলেই হত। মনোয়ারা ডাকলেন, কুসুম আয় চুল বাইন্দা দেই। কুসুম এল না। কোন উত্তরও দিল না। তার কিছুক্ষণ পর মনোয়ারা ভেতরের বারান্দায় গিয়ে দেখলেন কুসুমের মুখ দিয়ে ফেনা বেরুচ্ছে। শরীরের খিঁচুনি হচ্ছে। কুসুম ভাঙ্গা গলায় বলল, মাগো আমারে মাফ কইরা দিও। আমি বিষ খাইছি। ধান খেতে যে বিষ দেয় হেই বিষ।”⁸
কুসুমকে বাঁচাতে নৌকায় করে মোবারক, সুরুজ ও মতি ছুটলেও তাকে আর বাঁচানো যায়নিÑঅফেরতের দেশে চলে যায় কুসুম।
হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি উপন্যাস ‘অপেক্ষা’ (১৯৯৭)। এ উপন্যাসের চরিত্র সুপ্রভা পরীক্ষায় তিন বিষয়ে ফেল করে। হেডমিসট্রেস জানান, এ বছর তাকে প্রমোশন দেওয়া হবে না। সুপ্রভাই ছিল তার ক্লাসের একমাত্র মেয়ে, যে প্রমোশন পায়নি। বিষয়টি ছিল তার জন্য খুবই দুঃখজনক ও অসহনীয়। ওকে প্রমোশন দিতে অঙ্কের শিক্ষক হেডমিসট্রেসকে অনুরোধ করলেও কাজ হয়নি। সুপ্রভা তার মাকে যমের মতো ভয় পায়; ফেল করার কথা শুনলে মা তাকে ‘খুন’ করে ফেলবে। ও তার মামা জামিলুর রহমানকে বিষয়টি জানায়। মামা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে সুপ্রভাকে বাসায় পাঠিয়ে দেন এবং নিজে যান হেডমিসট্রেসের সঙ্গে দেখা করতে (ডোনেশন দিয়ে হলেও প্রমোশন দেওয়ার অনুরোধ করতে, কারণ তিনিও সুপ্রভার মায়ের আচরণ সম্পর্কে জানতেন)। সুপ্রভা বাসায় এলে মা সুরাইয়া রেজাল্ট জানতে চান। ওর ফেলের কথা শুনে তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ হন : “সুরাইয়া তীব্র এবং তীক্ষè গলায় বললেন, এখনো দাঁড়িয়ে আছিস? এক কথা আমি বার বার বলতে পারব না। যা ছাদে যা! ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে আমাকে উদ্ধার করা। সত্যি ছাদ থেকে লাফ দিতে বলছো!
হ্যাঁ বলছি। যদি সাহস থাকে, যা করতে বলছি কর। সঙের মত দাঁড়িয়ে থাকিবি না। সং দেখতে আর ভাল লাগে না।”
এই প্রতিক্রিয়ায় সুপ্রভা সত্যিই ছাদ থেকে লাফ দেয়। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে সে মাকে বলে : “মা আমি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে বিরাট একটা ভুল করেছি। তুমি কিছু মনে করো না। আমাকে ক্ষমা করে দিও।” অন্যদিকে মামা জামিলুর রহমান হেডমিসট্রেসকে অনুরোধ করে সুপ্রভাকে প্রমোশন করিয়েছিলেন, কিন্তু এ সংবাদ জানার আগেই মেয়েটি ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে। সুপ্রভাকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি। মানসিক চাপ ও পারিবারিক দুর্ব্যবহার যে শিশু-কিশোরদের কত সহজে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে, সুপ্রভা তারই দৃষ্টান্ত।
হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার আছে জল’ (১৯৮৫) উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র কিশোরী দিলুর কথাও স্মরণযোগ্য। তার পরিবার ও স্বজনেরা এক শীতের সকালে নীলগঞ্জ ডাকবাংলোয় বেড়াতে এসেছে। ভ্রমণসঙ্গী দিলুর মা রেহানা বেগম, বাবা ওসমান, বড় বোন নিশাত, নিশাতের শিশুপুত্র বাবু, মায়ের দূরসম্পর্কের ভাগ্নে সাব্বির ও জামিল। সাব্বির বিদেশে থাকে, সে প্রকৌশলী ও আলোকচিত্রী। নিশাতের স্বামী নেই, মা চান যেন সাব্বির তাকে পছন্দ করে। নিশাতের প্রাক্তন প্রেমিক জামিল, অথচ তারই ছোট বোন দিলু বেড়াতে এসে জামিলের প্রেমে পড়ে। এ একতরফা প্রেমের বিষয়টি সাব্বির বুঝতে পারে। একরাতে নিশাত দিলুকে জানায়, দিলুর বয়সী থাকতে জামিলকে সে মনে-প্রাণে ভালোবাসত; তারা পালিয়ে বিয়ে করার পরিকল্পনাও করেছিল (যদিও জামিল না আসায় তা বাস্তবে রূপ নেয়নি)। নিশাতের বিয়ে হয় কবিরের সঙ্গে, কিন্তু বিয়ের পরও সে জামিলকে ভুলতে পারেনি। দিলু স্পষ্ট বুঝতে পারে নিশাত এখনও জামিলকে ভালোবাসে এবং বিয়ে করতে চায়। নিশাতের এই প্রেমের বিষয় কিশোরী দিলু মেনে নিতে পারে না; তার মন ভেঙে যায় এবং সে পানিতে ডুবে আত্মহত্যা করে। ঔপন্যাসিক তার মৃত্যুদৃশ্য বর্ণনা করেছেন এভাবে :
“দিলু ভাসছিল মাঝপুকুরে। তার পরনে লাল একটা স্কার্ট। মাথার কালো চুল চারদিকে ছড়ানো। দীঘির সবুজ জলের ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি অসাধারণ কম্পোজিশন। একজন ফটোগ্রাফার এরকম একটি দৃশ্যের জন্যে সারা জীবন অপেক্ষা করে।
সাব্বির দীর্ঘ সময় দিলুর ভেসে থাকা শরীরটির দিকে তাকিয়ে রইলো। ভোরের আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে। স্কার্টের রঙ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। সাব্বির ছবি তুলতে গিয়েও তুলতে পারলো না। পাগলের মতো চেঁচাতে লাগলোÑতোমরা কে কোথায় আছ এই মেয়েটিকে বাঁচাও।
দমকা একটা হাওয়া এল তখন। সে হাওয়ায় দিলু ভেসে আসতে লাগলো ঘাটের দিকে। যেন সে বলছেÑ“ছবি তুলুন সাব্বির ভাই।”
কৈবর্তদের সংগ্রাম, সংঘাত, প্রেম, সামাজিক সংস্কার ও প্রতিরোধভিত্তিক উপন্যাস ‘দহনকাল’ (২০১০)। হরিশংকর জলদাস (১৯৫৫-) এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সময়কেও চিত্রিত করেছেন। হানাদার বাহিনী জেলেপাড়ায় গণহত্যা, নির্যাতন ও লুটপাট জানায়। পাঁচজন হানাদার রাধেশ্যামের স্ত্রীকে ধর্ষণ করে; তাদেরকে রাধেশ্যামের ঘর চিনিয়ে দিয়েছিল রাজাকার সেলিম ও খলিল। রাধেশ্যাম বাড়ি ফিরে দেখে তার স্ত্রী অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। তাকে খবরটি জানায় অনুচরণ :
“অনুচরণ রাধেশ্যামের ডান হাত চেপে ধরে উঠানের মাঝখানে নিয়ে গেল। খোলা দরজাটি দেখিয়ে বলল, ‘তোঁয়ার বউ ফাঁস খাইয়ে। বিয়ালে মিলিটারিরা বলৎকার গরি গেইয়ে তোঁয়ার বউয়েরে। অপমান সইয্য গরিৎ নো পারি গলাৎ শাড়ির আঁচল জড়াই আত্মহইত্যা গইয্যে।’’
এ ঘটনার পর শান্তশিষ্ট রাধেশ্যাম হয়ে ওঠে অকুতোভয়। সে প্রতিজ্ঞা করে, জীবনের বিনিময়ে হলেও সে বউয়ের অপমানের প্রতিশোধ নেবেই। তাকে ঘিরে জেলেপাড়ার সবাই সংগঠিত হয়। রাধেশ্যামের স্ত্রীর আত্মহত্যা ও অন্যান্য অবিচার সমাজে ভীষণ ক্ষোভ জন্ম দেয়, যার মাধ্যমে সকলের মাঝে নতুন চৈতন্য সঞ্চার হয়।
সত্তর-আশির দশকের কলকাতা শহরকে উপজীব্য করে তপন সেন লিখেছেন ‘শোনো কে বাজায়’। এ উপন্যাসে মাঝরাতে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে কণ্ঠশিল্পী চন্দ্রানী। শুভজিৎ জানে, সে স্বামীর দ্বারা অত্যাচারিত ছিল।
বাংলা উপন্যাসে নারীর আত্মহত্যার চিত্র আরও রয়েছে। তাদের আত্মহত্যার কারণ ও ধরণও ভিন্ন ভিন্ন। নারীর এই অস্বাভাবিক প্রস্থান উপন্যাসকে যে গতিময় ও হৃদয়বিদারক করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাহিত্যে সমাজের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে; রাষ্ট্রের বিভিন্ন রূপ সাহিত্যে রূপায়িত হয়। বাংলা সাহিত্যে নারীর আত্মহত্যার যে দৃশ্যপট উপস্থাপিত হয়েছে, তা সমাজ থেকেই উৎসারিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কিছু পরিসংখ্যানে দৃষ্টি দেওয়া যাক। এ দেশে আত্মহত্যা একটি সংক্রামক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আত্মহত্যার তালিকায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম (ভারতের অবস্থান প্রথম)। বাংলাদেশে ২০২৩ সালে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭,২০৯ জন; করোনা সংক্রমণের প্রথম বছরে মারা যান ৫,২০০ জন। অথচ দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আত্মহত্যাকারীদের ৬০ শতাংশ নারী; ২০২৩ সালে আত্মহত্যাকারীদের ৫৭ শতাংশ নারী ছিলেন। এ পরিসংখ্যান আতঙ্ক তৈরি করার মতো। গবেষকদের মতে, পারিবারিক, সম্পর্কজনিত, আর্থিক টানাপোড়েন, পড়াশোনাসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ আত্মহত্যা করছে।
ভারত ও বাংলাদেশে নারীর আত্মহত্যা বাস্তবে যতটা ভয়াবহ, সাহিত্যে তা উপস্থাপিত হয়েছে কমই। উপন্যাসে আত্মহত্যার ঘটনা, এর কারণ ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ যতটা তুলে ধরা হয়েছে, আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীর বিষয়টি সেভাবে আসেনি। এমনকি দোষী চরিত্রগুলোকে সত্যিকারের অনুশোচনা কিংবা অপরাধের গভীরতা উপলব্ধি করতেও দেখা যায়নি। সাহিত্যে এ বিষয়গুলোর যথার্থ উপস্থাপন হোকÑএটিই আমাদের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মতো নানাবিধ বিষয় আরও সূক্ষ্মতার সঙ্গে সাহিত্যে ফুটিয়ে তোলার জন্য সাহিত্যিকদের প্রতি আহ্বান জানাই।তথ্যসূত্র :
১. মো. জসিম খান, ‘আত্মহত্যা ও কৃপাহত্যা : ডুরখেইম ও পিটার সিঙ্গারের সমালোচনার পর্যবেক্ষণ’, ঢাকা : বাংলা একাডেমি পত্রিকা, এপ্রিল-জুন ২০২৩, পৃ. ১৭৭।
২. তরুণ ঘোষ (সম্পা.), ‘বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা, কলকাতা : রত্নাবলী, অক্টোবর ১৯৫৯, পৃ. ৫২।
৩. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘বিষবৃক্ষ’, কলকাতা : বেঙ্গল পাবলিশার্স (প্রা.) লিমিটেড, ডিসেম্বর ১৯৬৫, পৃ. ১০৭-১০৮।
৪. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘অপরাজিত’, কলকাতা : মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, ১৯৩১, পৃ. ৩৪৭।
৫. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, কলকাতা : বেঙ্গল পাবলিশার্স প্রা. লি., ষষ্ঠ সংস্করণ, আশ্বিন ১৩৬৬, পৃ. ৪৭৬।
৬. মুরতজা আলী, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যাদব পণ্ডিত’, ঢাকা : ‘কালি ও কলম’, মে ২০২৪।
৭. শওকত ওসমান, ‘জননী’, ঢাকা : সময় প্রকাশন, ৯ম মুদ্রণ ২০১৭, পৃ. ২০৬।
৮. হুমায়ূন আহমেদ, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন, ঢাকা : সময় প্রকাশন, ১১তম মুদ্রণ ২০১২, পৃ. ১৫৭।
৯. হুমায়ূন আহমেদ, ‘অপেক্ষা’, ঢাকা : আফসার ব্রাদার্স, অষ্টাদশ মুদ্রণ ২০১২, পৃ. ১৪৪।
১০. হুমায়ূন আহমেদ, ‘আমার আছে জল’, ঢাকা : শিখা প্রকাশনী, ২০তম মুদ্রণ ২০১৬, পৃ. ৬৪।
১১. হরিশংকর জলদাস, ‘দহনকাল’, ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৫, পৃ. ১৫০।
১২. মো. কামরুল হাসান খান (সংকলন ও গ্রন্থন), ‘সেলিম আল দীন নাটকসমগ্র ১’, ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, পৃ. ৫০০।








