বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ২২:৩৬

নারী: মানুষ নাকি প্রমাণের গোলকধাঁধায় বন্দি এক সত্তা?

শেফাতুন নূর
নারী: মানুষ নাকি প্রমাণের গোলকধাঁধায় বন্দি এক সত্তা?

জন্মের প্রথম শ্বাস থেকে কবরের মাটি পর্যন্ত; নারীর জীবন যেন এক অন্তহীন বিচারসভা, যেখানে সে নিজেই আসামি, নিজেই সাক্ষী, আবার কখনো নিজেই নিজের বিচারক।

আমার প্রশ্ন হলো, একজন নারীকে সমাজ কি আদেও ‘মানুষ’ হিসেবে গ্রহণ করেছে? নাকি তাকে তৈরি করা হয়েছে এক নিরন্তর ‘যোগ্যতা প্রমাণের যন্ত্র’ হিসেবে?

আমার জানা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্য হলো, নারী কখনো পূর্ণ ‘পাস’ হয় না। তার জীবনে কোনো ফাইনাল সফলতা নেই, কোনো সার্টিফিকেট নেই, কোনো স্বীকৃতিও নেই। শুধু আছে অনন্ত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চাপ। কথাটা অদ্ভুত লাগছে? আসুন তাহলে বিষয়টা সহজ করে দিই।

লিঙ্গীয় সামাজিকীকরণ: খাঁচায় বন্দি শৈশব

মনোবিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ‘এবহফবৎ ঝড়পরধষরুধঃরড়হ’, আমাদের সমাজে তা আসলে নারীর স্বাভাবিকতা কেড়ে নেওয়ার প্রথম ধাপ। ছেলেদের দৌড়ঝাঁপ যখন ‘প্রাণবন্ততা’, মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ‘অবাধ্যতা’। শৈশব থেকেই তার ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় ‘ভদ্র হওয়ার’ অদৃশ্য সিলমোহর। তার হাসি কতটুকু উঁচু হবে, তার কান্না কতটুকু শব্দ করবে ‘সবই কি সমাজ ঠিক করে দেবে?’

শিক্ষার মঞ্চে নতুন দ্বৈরথ

আজকের নারী শিক্ষিত হচ্ছে, গবেষণাগারে যাচ্ছে, মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার ডিগ্রিকে সমাজ কেবল তার ‘পারিবারিক মূল্য’ (গধৎৎরধমব গধৎশবঃ ঠধষঁব) বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে দেখে। কর্মক্ষেত্রে একজন পুরুষের সাফল্য যেখানে তার মেধার স্বীকৃতি, নারীর সাফল্য সেখানে প্রায়ই ‘কোটা’ বা ‘বিশেষ সুবিধা’র তকমা পায়। তাকে প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করতে হয় সে মেধাবী বলেই আজ এই অবস্থানে।

সাংসারিক ‘সুপার-ওম্যান’ সিনড্রোম

এ যেনো এক চতুর ফাঁদ। বিবাহিত জীবনে নারীকে একটি অলিখিত ‘পারফেকশন’-এর নেশায় বুঁদ করে রাখা হয়। তাকে হতে হবে:

-নিখুঁত রাঁধুনি: স্বাদে যেন কোনো ত্রুটি না থাকে।

-আদর্শ মা: সন্তানের প্রতিটি ভুল যেন মায়েরই ব্যর্থতা।

-ধৈর্যশীল পুত্রবধূ: নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে হলেও শান্তি বজায় রাখা। এই ‘সুপার-ওম্যান’ তকমাটি আসলে একটি ফাঁদ, যাতে নারী ক্লান্ত হয়েও বলতে না পারে “আমি আর পারছি না।”

অসংজ্ঞায়িত শ্রম এবং অস্তিত্বের বিলোপ

নারী ঘর সামলায়, সন্তান বড় করে, পরিবারকে আগলে রাখে,যার কোনো আর্থিক মূল্যায়ন বা জিডিপিতে স্বীকৃতি নেই। এই ‘ওহারংরনষব খধনড়ৎ’ বা অদৃশ্য শ্রম তাকে দিনশেষে একজন ‘নির্ভরশীল’ মানুষে পরিণত করে। অথচ সে-ই পুরো কাঠামোর মেরুদণ্ড। সমাজ তাকে ‘প্রমাণের যন্ত্র’ বানাতে গিয়ে তার ভেতরের রক্ত-মাংসের মানুষটিকে মেরে ফেলে।

তাহলে নারীর জীবন চক্রে চূড়ান্ত রায় কি কখনো আসবে?

সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য হলো, নারীর জীবনে কোনো ‘ঋরহধষ ঠবৎফরপঃ’ নেই। সে কখনো ১০০-তে ১০০ পায় না। শৈশবেই শুরু হয় আদর্শ মানুষ হওয়ার পরীক্ষা, যৌবনে শিক্ষা ও রূপের পরীক্ষা, মাঝবয়সে সংসারের পরীক্ষা, আর বৃদ্ধ বয়সে আদর্শ মা হওয়ার পরীক্ষা। এই অন্তহীন বিচারসভায় সে কেবল একজন ক্লান্তিহীন যোদ্ধা।

যেদিন নারীকে আর প্রমাণ করতে হবে না যে, সে “সংসার এবং ক্যারিয়ার” দুটোই সামলাতে পারে, যেদিন সমাজ তাকে কেবল একজন ‘মানুষ’ হিসেবে তার ভুলভ্রান্তিসহ গ্রহণ করবে-সেদিন বুঝবো আমরা সভ্য হয়েছি। তবে সমাজের দেওয়া ‘সার্টিফিকেট’ দিয়ে নিজের যোগ্যতা মাপবেন না। আপনার অস্তিত্বই আপনার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

নারীর প্রতিটি নীরবতা আসলে এক একটি জমাটবদ্ধ আগ্নেয়গিরি। এই এক এক জন নারী হচ্ছে নীরব বিপ্লবী, যারা প্রতিদিন লড়ে যাচ্ছেন শুধু বাঁচার জন্য নয়, মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য। এটাই তার গল্প। এটাই আমাদের গল্প।

শেফাতুন নূর : প্রভাষক (ইংরেজি), পুরান বাজার ডিগ্রি কলেজ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়