মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাড. সলিম উল্লা সেলিম!

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০০

হৃদয়বতী

মিজানুর রহমান রানা
হৃদয়বতী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

একুশ.

রাত প্রায় ১টা বাজে। রুবিনা ভেবেই চলছে আজ কেন তুষার বাসায় আসছে না। গত এক সপ্তাহ যাবত সে এটা করে চলছে, কিন্তু কী কাজে এতো দেরি করে বাসায় ফিরে তার কোনো সদুত্তর দেয় না। ধীরে ধীরে তুষারের প্রতি রুবিনার সন্দেহ বাড়তে থাকে। সে আস্তে আস্তে দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। হাঁটতে হাঁটতে তুষারের অফিসের কাছাকাছি গিয়ে মনে মনে ভাবে, এতো রাতে তার অফিসে যাওয়া কি ঠিক হবে?

এ সময় তুষার অফিস থেকে বেরোয়। তার সাথে এক সুদর্শনা। মেয়েটির অনেক রূপ। সে তুষারের পেছনে পেছনে অফিস থেকে নামে। তারপর তুষারের সাথে করমর্দন করে গাড়িতে উঠে চলে যায়। এ সময় তুষার বলে উঠে, ‘ভালো থেকো ঋতাভরী।’

ঋতাভরীও হাত নেড়ে কৃতজ্ঞতা জানায়। তারপর ছুটে চলে যায় তার গাড়িটি।

তুষার সামনে দশ কদম হাঁটতেই রুবিনার সাথে হঠাৎ সামনাসামনি দেখা হয়ে যায়। সে রুবিনাকে দেখেই যেনো আঁতকে উঠে বলে, ‘রুবিনা তুমি এতো রাতে এখানে?’

‘গত সপ্তাহখানেক ধরে তুমি বাসায় লেট করে ফিরো, জানতে চাইলে জবাব মিলে না। আজকে তাই নিজেই নেমে পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে পড়লাম। ভালো, খুব ভালো। মেয়েটি অসম্ভব রূপবতী। নাম ঋতাভরী, তোমার সাথে ভালোই মানাবে।’

তুষার হতভম্ভ হয়ে পড়ে। কী বলবে বুঝতে পারছে না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রুবিনাকে বললো, ‘চলো বাসায় ফেরা যাক। ঋতাভরীর কাহিনী তোমাকে পরে শোনাবো, যখন সময় হবে।’

বেশ সাজগোজ করছে অনন্যা। এ সময় প্রবেশ করলো ইরফান। আজ অনন্যাকে ইরফানের জীবনের সেরা নারী মনে হলো। বিয়ে হয়েছে প্রায় দু’বছর, কিন্তু নিজের অফিসিয়াল দায়িত্বে মশগুল থাকায় অনন্যার দিকে ভালোভাবে নজর দেওয়ার সময়ই সে পায়নি। আজকে অফিস থেকে একদিনের ছুটি নিয়ে এসেছে। আর সেটা আগেই জানতো অনন্যা।

স্বামীর জন্যে আজকে তার সাজসজ্জা তাকে আরো মোহনীয় করে তুললো। পেছন ফিরে ইরফানকে দেখেই প্রশ্ন করলো, ‘কখন ফিরছো? আর আমার দিকে একদৃষ্টে এভাবে তাকিয়ে কী দেখছো?’

‘সত্যিই, যেদিন তোমার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়, যেদিন বিয়ে হয় তখনও তুমি এতো সাজোনি। আজকে তোমাকে দেখে আমার মনে হলো, পৃথিবীর সেরা একজন ভালোবাসার মানুষকে আমি কাছে পেয়েছি। সত্যিই তুমি অনন্যা।’

‘প্রতিটি মানুষ যাকে যত বেশি ভালোবাসে, তাকে ততোই বেশি অনন্য মনে হয়।’ জবাব দিলো অনন্যা। তুমি আমাকে যতো বেশি ভালোবাসবে ততোই আমাকে তোমার ততোবেশি সুন্দর মনে হবে।’

তুষার গতকাল রাতে শুয়ে পড়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ছিলো। সকালে রুবিনা নাস্তার টেবিলে ডাকলো। তারপর দু’জনে নাস্তা খেতে খেতে কথা শুরু করলো। সে সুদর্শনা ঋতাভরী সম্পর্কে প্রশ্ন করলো।

কিন্তু কোনো উত্তর দিলো না তুষার। সে নিরুত্তর। কিন্তু এতে রুবিনার সন্দেহ আরও বাড়তে থাকে। সে গম্ভীর স্বরে বললো, তুষার কী হয়েছে আমাকে বলো। যদি ওই সুদর্শনা মেয়েটি পছন্দ হয়ে থাকে তাহলে ...।’

‘রুবিনা, থামো তো। তোমার মতো সুন্দরী ভালোবাসার মানুষ থাকতে আমি আর কাউকে আমাদের জীবনে প্রত্যাশা করি না। আসলে তুমি যা ভাবছো তা-না। বিষয়টি অন্য। যা তোমাকে এখনই বলতে পারছি না। সময় হলো বলবো। বিষয়টা খুবই গোপনীয়।’

‘তাই তো। সুন্দরী নারীর সান্নিধ্য অতি গোপনীয়ই হয়ে থাকে। কিন্তু এক সময় সেই গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যায়। সেই ক্ষণের জন্য তুমি প্রস্তুত আছো তো?’

তুষার নির্বাক। সে ভাবছে অন্যকথা। ইরফানের নির্দেশেই কাজটি সে করছে। আশা করছে শীঘ্রই বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাবে, আর রুবিনা তখন নিজের প্রতি ঘৃণায় মুখ লুকোবে।

‘কী ভাবছো?’ তাড়া দেয় রুবিনা। ‘আজকে তোমার ওয়্যারড্রোবে একটা জিনিস পেলাম। জিনিসটা দেখলে তুমি সত্য বলতে বাধ্য হবে নিশ্চয়ই।’

তুষার বুঝতে পারছে তাদের সংসারে ভালোবাসায় ফাটল ধরা শুরু হচ্ছে। কিন্তু সত্যটা এখনও বলার সময় আসেনি। তাই সে নিশ্চুপ থাকে। এ সময় রুবিনা চলে যায় আবার কিছুক্ষণ পর ফেরত আসে। তার হাতে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ। সে এটা তুষারের সামনে মেলে ধরে। তারপর প্রশ্ন করে, ‘এটা নিশ্চয়ই ওই সুন্দরী মেয়েটার, তাই না?’

নাদের সাহেব বললেন, ‘চেঙ্গিস তুমি জামশেদকে খতম করেছো। সেই সাথে তোমার বাহিনীর লোকদেরও খতম করেছো। এখন তুমি কী করতে চাও?’

‘আমি আমার মতো চলতে চাই। আর পুলিশ তাদের কাজ করবে। যেদিন ধরা পড়বো সেদিন অবশ্যই জেলে যাবো। তবে তার আগে আমার বাকি মিশন শেষ করতে হবে। আমি ইরফান সাহেবের সাথে কথা বলেছি, তিনি সাংবাদিক তুষার সাহেবকে এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে আমাকে জানাতে বলেছেন। তুষার আমাকে বিস্তারিত জানালেই ওই চক্রটাকে ধরতে পারবো। তারপর তাদেরকে ধরে পুলিশে দিয়ে আমার কাজ শেষ করবো।’

‘তুষার কি বিষয়টা নিয়ে কাজ করছে?’

‘হ্যাঁ, সে তার অফিসের এক সুদর্শনাকে কাজে লাগিয়েছে হানিটোপ হিসেবে। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে পালের গোদাটা টোপ গিলবে। তারপর আমাদের কাজ শুরু হবে।’

‘সাব্বাশ। এই দেশটাকে মাদক ব্যবসায়ী, অসৎ রাজনীতিবিদ আর দুর্নীতিবাজমুক্ত করাই আমাদের মিশন। এর আগে আমরা থামতে চাই না।’ উৎফুল্ল হলেন নাদের সাহেব।

‘আমি আর তোমার সাথে থাকছি না মি. তুষার আহমেদ। তোমাকে বিশ্বাস করেই ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু আর শেষ রক্ষা হলো না। তোমার নির্বাক শক্তি আমাকে আরও খেপিয়ে তুলেছে। আমি এখনই বাবার সাথে কথা বলছি। তারপর সিদ্ধান্ত নিবো।’ রুবিনা বেশ উত্তেজিত রাগী কণ্ঠে তুষারকে বললো।

তুষার চুপচাপ। সে কোনো কথা বলছে না। এতে রুবিনার রাগ আরও বেড়ে গেলো। সে বললো, ‘কিছু একটা বলো, যাতে তুমি নির্দোষ প্রমাণিত হতে পারো। নাকি তুমি বোবা হয়ে গেছো?’

‘দেখো রুবিনা। ভালোবাসা তারপর সংসার। আমরা বিবাহিত দু’জন মানুষ। আমাদের মধ্যে সন্দেহের বীজ শয়তান ঢুকিয়ে দিয়েছে। তুমি এ থেকে বিরত হও। তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো চোখ বন্ধ করে।’

‘তাহলে ওই মেয়েটা, আর তার ভ্যানিটি ব্যাগ! এগুলোও কি মিথ্যা?’

তুষার হাসলো। হাসতে হাসতে তার দম বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। এ সময় পানি নিয়ে এলো রুবিনা, তারপর তুষারকে দিয়ে বললো, নাও পানি খাও। না হলে দম বন্ধ হয়ে যাবে।’

‘আমি কখনই পানি খাই না, পান করি। তুমি কি পানি খাও— চিবিয়ে?’

রুবিনা হেসে উঠলো। তারপর বললো, ‘শাক দিয়ে মাছ ঢেকো না তুষার। আমি জানি না তুমি কি লুকোচ্ছো। তবে তোমাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তুমি বিষয়টি প্রকাশ করছো না। ঠিক আছে, আমি বাবার সাথেই কথা বলি।’

‘না না।’ বাধা দিলো তুষার। তোমার বাবার সাথে কথা বলার দরকার নেই। তিনি হয়তো বিষয়টা মাইন্ড করতে পারেন। তার চেয়ে ক’টা দিন অপেক্ষা করো, তোমার বাবাই তোমাকে হয়তো সত্যটা জানাবেন।’

‘তাহলে তো এখনই জানা ভালো। অন্তরে বিষের আগুন পুষে আর কতোদিন তুমি আর আমি একই বিছানায় ঘুমাবো?’

‘এখন পুরো বিষয়টা তোমার বাবাও জানেন না। অচিরেই তিনি জানতে পারবেন। তখন তুমি না হয় তার কাছ থেকে জেনে নিবে।’

‘ওহ, তাহলে তুমি আরেকটা বিয়ে করছো! সেই খবরটা বাবা জানেন না। তুমি বিয়েটা করে ফেললেই তিনি জানাবেন এবং আমাকে জানাবেন, তাই না।’

ঠিক সেই সময়টাতেই রুবিনার মুঠোফোন বেজে উঠলো। রুবিনা মুঠোফোনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, ‘বাহ, বাবার নাম মুখে আনতেই কল চলে এলো। তাহলে বিষয়টা এখনই জানা যাবে।’

তুষার তার চোখ নামিয়ে ফেললো, দু হাত দিয়ে একত্র করে মুঠি পাকালো। তারপর ধপাস করে সোফায় বসে পড়লো।

কাঁপা কাঁপা হাতে কল রিসিভ করলো রুবিনা। তারপর বললো, ‘বাবা! অনেকদিন পর তোমার কল পেলাম। নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে?’

‘হ্যা, মা। একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে, তাই তোমাকে কল দিলাম।’ বাবা নাদের সাহেবের গলা কাঁপছে? রুবিনার মনে হলো তিনি কি কোনো বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছেন?

তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে দেখার জন্য আসছি, আমাদের কথা বলা জরুরি।’

রাত তিনটা। সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে বসে আছেন মেজর ইরফান, পাশে তুষার আহমেদ। গাড়িটা ছুটে চলছে গভীর জঙ্গলের পথ ধরে। এ সময় ভাবছে তুষার। তাদের অফিসের সেই সুন্দরী ঋতাভরীই দলটিকে ফাঁদে ফেলেছে। সে অনেক প্রচেষ্টার পর জানতে পেরেছে, ওরা এই জঙ্গলেই ঘাঁটি গেড়েছে এবং নাগাল্যান্ড নামক একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্যে বাংকারে অস্ত্রশস্ত্র মজুদ রেখেছে। আগামীকালই তারা ওই অঞ্চলের নিরীহ মানুষের ওপর হামলা করে তাদের বাড়িঘর লুটপাট করবে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিবে।

ঋতাভরীর কথা অনুসারে একটা টিলার পাদদেশে চরমপন্থীদের বাংকার আছে। কিন্তু তারা ৩০ মিনিট খুঁজেও সেটা না পেয়ে ঋতাভরীর কাছে বার্তা দিলো। ঋতাভরীর উত্তর এলো, ‘প্রিয় কমান্ডার। মেজর ইরফান। তুষারসহ আপনাদের আজ শেষ দিন। আপনারা অন্যদের ফাঁসাতে গিয়ে নিজেরাই ফেঁসে গেছেন। দয়া করে আপনাদের অস্ত্রগুলো ফেলে সামনে তিরিশ কদম এগিয়ে আসুন। না হলে আপনাদের সোর্স ঋতাভরীর প্রাণ যাবে।

সবাই মেজর ইরফানের দিকে তাকিয়ে আছে। মেজর ইরফানকে বিচলিত দেখা গেলো না। সে মুচকি হাসলো। তারপর আদেশ করলো, ‘সবাই অস্ত্র ফেলে সামনে ত্রিশ কদম এগোও।’

সামনে এগুতেই দেখা গেলো চাইনিজ ম্যানদের মতো খর্বকায় কিছু মানুষকে। সবার হাতে কলাশনিভ রাইফেল। ঋতাভরীকে ওরা টানিয়ে রেখেছে শূন্যে। যে কোনো মুহূর্তে দড়ি ছিড়ে পড়ে যেতে পারে। তার মুখ স্কচটেপ দিয়ে প্যাঁচানো। ইরফান বাহিনীকে দেখেই সে ওপর থেকে নড়েচড়ে উঠলো। এ সময় দেখতে পেলো, চারজন মানুষ এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। মেজর ইরফান তাদেরকে দেখে চিনতে পারলো।

এই চারজন পলাতক জঙ্গি। মোস্ট ওয়ান্টেড। তাদের সাথে একজন আছে বিপুল রায়। আর অন্য তিজন আবদুর রহিম, পলাশ ও সাদামুনি।

সাদামুনি পাহাড়ের লোক। এখানে সেই সবকিছু পরিচালনা করে। নাগাল্যান্ডের স্বপ্ন তার চোখে। সাথে যোগ দিয়েছে জঙ্গিরা।

প্রথমে সাদামুনি এসে মেজর ইরফানের সাথে কথা বললো, ‘আপনারা পুরো বাহিনী এখন আমাদের কব্জায়। আর কখনোই যেতে পারবেন না। আমাদেরকে ধরতে গিয়ে আপনারাই নিজের জালে ধরা পড়লেন। এখন আমাদের সাথে কাজ করলে ভালো, না হলে আপনাদের পুরো বাহিনীকেই মাটিচাপা দেওয়া হবে। ওই দেখুন ওদিকে মাটি কেটে আপনাদের জন্য কবর বানিয়ে রাখা হয়েছে। সবাইকে একটিমাত্র কবরে চাপা দেওয়া হবে, জীবন্ত।

সাদামুনির কথায় হেসে উঠলেন মেজর ইরফান। তুষার ও চেঙ্গিসখানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কবর তো আমাদের জন্মগত অধিকার। মৃত্যুর পর তো কবরে যেতেই হবে। কিন্তু আমার প্রশ্ন তুমি কেনো বাংলাদেশকে ভাগ করতে চাইছো? পাহাড়িদের মাঝে কেনো বিভ্রান্তি তৈরি করছো? এই দেশটা তো আমাদের সবারই, সবাই মিলেমিশে থাকলেইতো হয়।’

‘নাগাল্যান্ড আমার চোখে শুধু একটা স্বপ্ন নয়, এটা আমাদের জন্মগত অধিকার।’ উচ্চারণ করলো সাদামুনি।’ যে কোনো মূল্যেই হোক, আমরা আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবোই।’

সাদামুনির লোকজন ধীরে ধীরে কলাশনিভ রাইফেল হাতে তুষার আহমেদ ও মেজর ইরফানের বাহিনীর দিকে এগিয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা অস্ত্র তাক করলো। তারপর একজন সাদামুনির ইঙ্গিতের ইশারার দিকে তাকিয়ে রইলো।

সাদা মুনি বললো, ‘একটু অপেক্ষা করো। ওপরের ওই পাখিটাকে নামিয়ে একসাথেই সবাইকে ঝাঁঝরা করে দিবে, তারপর ওইখানে মাটিচাপা দিয়ে দিবে।’

কথা বললো মেজর ইরফান। সে সাদা মুনিকে বললো, ‘আমরা মাটিচাপা পড়ার জন্য আসিনি, বরং ইতিহাস গড়তে এসেছি! তোমরা যেমন ইতিহাস গড়তে চাও, তেমনি আমরাও চাই। এখন দেখার পালা কে বিজয়ী হবে?’

সাদা মুনি অবাক হলো, বলে কী? তাহলে পেছনে কী...? ঠিক যখন সাদামুনি ভাবছে সে বিজয়ী, তখন পেছন থেকে চেঙ্গিস খান ও নাদের বাহিনীসহ গোপনে প্রস্তুত থাকা বাহিনী দিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালায়। এটা সেনাবাহিনী ও নাদের-চেঙ্গিস বাহিনী আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছে! সাদামুনি যখন ভাবছে ইরফানরা অসহায়, ঠিক তখনই একটি বিস্ফোরণ হয়। তারপর হঠাৎ ইরফানের রেডিওতে একটা সংকেত আসে- ‘তোমরা যেখানে আছো, তোমাদের সাহায্য আসছে। সময়মতো লড়াই করো!

হঠাৎ করেই এগিয়ে আসে নাদের ও চেঙ্গিস। মেজর ইরফানদের পেছনে ফেলে আসা অস্ত্রগুলো দিয়েই শুরু হয় অ্যাকশন। তুমুল লড়াই।

এ লড়াইয়ে সাদামুনির পুরো বাহিনী খতম হয়ে যায়। আর সাদামুনির লোকদের একটিমাত্র বুলেট চেঙ্গিস খানের বুকটা ভেদ করে চলে যায়। রক্তে মাটি ভেসে যায়। নাদের দ্রুত তার কাছে আসে, তাকে কোলে নিয়ে কপালে চুমু খায়। তারপর বলে, ‘তোমার শহীদ হওয়ার শখ ছিলো একাত্তরের যুদ্ধে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তোমাকে আজকের দিনে দেশের পক্ষে যুদ্ধ করে শহীদ হওয়ার সুযোগ দিলেন। তোমার আশা পূর্ণ হয়েছে চেঙ্গিস। তুমি খুশি তো?’

অনেক কষ্টেও চেঙ্গিস হাসলো, চোখ দুটি নাদের খানের দিকে। সেই দুটি চোখে নাদের দেখতে পেলো, চেঙ্গিস তার ইচ্ছেপূরণ হওয়ার খুশিতে অন্যজগতে যাবার জন্য পেরেশান হয়ে আছে।

‘খোদা হাফেজ চেঙ্গিস।’ নাদের খান কান্নাভেজা চোখে নাদেরকে বিদায় জানালো, এরপরই চেঙ্গিসখানের চোখ দুটি বন্ধ হলো। কিন্তু তার মুখে ফুটে রইলো সুন্দর একটি হাসি।

সবকিছু শুনে রুবিনা বললো, ‘তুমি যদি আমাকে ঋতাভরীর বিষয়টা জানাতে তাহলে আমি অযথা এতো টেনশন করতাম না। তাহলে তুমি ঋতাভরীকে নিয়ে কোনো তথ্য ফাঁস করতে চাওনি বলেই আমার কাছে নীরব থেকেছো?

‘তুমি কীভাবে জানলে এতোসব?’

‘বাবাই আমাকে বলেছেন। আচ্ছা, তুমি রিস্ক নিতে গেলে কেনো? তাদের সাথে গিয়ে তুমি তো মারাও যেতে পারতে?’

‘মৃত্যু তো ঘরেও হতে পারে। তবে দেশের জন্যে মৃত্যু যে কোনো মানুষের জন্যেই সম্মানের।’ উত্তর দিলো তুষার।

‘বেশ। বেশ। চেঙ্গিস চাচাকে কবর দেওয়া হবে কোথায়?’

‘তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানের সাথে কবরস্থ করা হবে। কারণ তিনি জীবনে দু বার মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, একবার একাত্তরে আর দ্বিতীয়বার আজকের দিনে। এমন মুক্তিযোদ্ধা দেশের ভাগ্যে কমই মিলে।’

‘সত্যিই তো। কথাটা আমি আগে ভেবে দেখিনি। মানুষ নিজ জীবন দিয়ে কীভাবে দেশের উপকার করে যায়, মৃত্যুটা কিছু কিছু মানুষের কাছে তুচ্ছ বিষয়।’

গভীর শ্বাস নিলো তুষার, তারপর বললো, ‘আমরা সবাই মরবো, কিন্তু কেউ কেউ মরার পরেও বেঁচে থাকে। চেঙ্গিস চাচা সেই মানুষের মধ্যে একজন- যার মৃত্যু তাকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।’

‘ঠিক, দেশের জন্যে লড়াই কখনও শেষ হয় না। কোনো মানুষ যখন সত্যের জন্য দাঁড়ায়, তখনই সে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠে।’ তুষারের কথায় সমর্থন করলো রুবিনা। সে ভাবতে থাকে মুক্তির যুদ্ধ শুধু অতীতের বিষয় নয়, এটি এখনো চলমান।

এ সময় হঠাৎ করেই তুষারের মুঠোফোন বেজে উঠলো। রুবিনা দেখলো ঋতাভরীর নামটা ভেসে উঠেছে। সে তুষারকে বললো, ‘ধরো, ঋতাভরীর কল। কথা বলো।’

তুষার বললো, ‘তুমি কলটা রিসিভ করে কথা বলো, আমি পরে কথা বলছি।’

রুবিনা কল রিসিভ করে নিজের পরিচয় দিলো। এ সময় ঋতাভরীর হাসি শোনা গেলো। সে রুবিনাকে বললো, ‘তোমার সাথে কথা বলতে মন চাইছে। আসলে তুষারের কাছে শোনলাম তুমি খুবই হৃদয়বতী নারী, তোমাকে ভালোবেসে সে বিয়ে করেছে। তাই না।’

‘হ্যাঁ, তবে বিয়েটা পারিবারিকভাবেই হয়েছে।’

‘যাই হোক, তুষারকে বলবে, আজকে হোটেল সানডেতে আমরা একসঙ্গে লাঞ্চ করবো। নতুন কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ আছে।’

হোটেল সানডেতে নির্ধারিত কক্ষে প্রবেশ করেই ভড়কে গেলো তুষার। ঋতাভরীর চারপাশে অস্ত্রধারী চার-পাঁচ যুবক। ঋতাভরী তুষারকে দেখেই অভ্যর্থনা জানালো। তারপর ভণিতা করে বসতে বললো।

তুষার বসলো না। সে প্রশ্ন করলো, ‘ঋতাভরী এরা কারা?’

ঋতাভরীর মুখে জটিল হাসি।

‘হাসছ কেনো? জবাব দাও এরা কারা?’

‘শোনো তুষার এই পৃথিবীতে ভালোবাসা কখনও নিঃশেষ হয় না। ফুরোয় না। তাই আমি ভাবছি তোমাকে কিছু ভালোবাসা বিনিময় করবো। তুমি কি প্রস্তুত? নাকি ভালোবাসার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড নিতে চাও।’

আজ তুষারের কাছে মনে হচ্ছে ঋতাভরী যেনো অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে। সে তার কলিগ হওয়া সত্ত্বেও যে আচরণ করছে, তা তার সাথে যায় না। ঋতাভরীর দিকে সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

‘শোনো তুষার। তোমরা হয়তো মনে করছো যুদ্ধটা সেদিন শেষ হয়ে গেছে। আসলে সেদিন মাত্র নাটকের কিছু অংশ পরিবেশিত হয়েছে। এরা, এই চারজন কুকি চিনের সদস্য। এরাই আমাকে নাগাল্যান্ডের সদস্যদের বিষয়ে খবর দেয়। আর কুকি চিনের সদস্যরাও চাইতো নাগাল্যান্ডের সাদামুনিসহ সব জঙ্গিরা তোমাদের ফাঁদে পড়ে যাতে নিঃশেষ হয়ে যায়। তাতে তারা নিরাপদে তাদের কাজ করতে পারবে। সেদিন সেই অংশটা সফল হয়েছে। এখনও বাকি অংশ দৃশ্যায়ন জরুরি।’

‘আমাকে এখানে কেনো ডেকেছো?’

‘তুমি সহযোগিতা করবে। তোমাকে অপহরণ করলেই মেজর ইরফান ও তার দলবল ছুটে আসবে। আর তাদেরকে এমন স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে যেখানে গিয়ে কুকি চিনের শত্রুদের সমূলে বিনাশ করবে তারা।’

‘কুকি চিনের শত্রু কারা?’

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) ও কুকি চিন (কেএনএফ)-এর সাথে তাদের সংঘাত হয়েছে, এমনকি ২০২২ সালে একটি হামলায় তিনজন নিহত হয়। এছাড়াও জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়া-একটি ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠী, যারা অস্ত্রের জন্য কেএনএফ-কে অর্থ দিয়েছে, কিন্তু পরবর্তীতে তাদের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। এখন কুকি চিনের সদস্যরা চায় এই পিসিজেএসএস ও জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়া এই দু বাহিনীকে সমূলে ধ্বংস করে দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করবে। আর তুমি হবে তাদের দাবার ঘুটি।’

তুষার জীবনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় কয়েকবার পুরস্কার অর্জন করেছে। সে জানে পরিস্থিতি জটিল না ভেবে সহজে কীভাবে সামলাতে হয়। তাই সে ভয় না পেয়ে সাবলীলভাবে বললো, ‘তোমরা ভাবছো, তোমরা জিততে যাচ্ছো? তোমরা কি সাদামুনিসহ তাদের বাহিনীর পরাজয় দেখোনি?’

ঋতাভরী ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তারপর বললো, ‘কিন্তু কুকি চিনের খেলায় তোমরা জিততে পারবে না। তুষার, তুমি কি জানো, তোমাকে ব্যবহার করেই আমরা শেষ চাল খেলবো?’ ঋতাভরীর চোখে সেই গভীর ধূর্ত হাসি।

‘আমার জন্যে মৃত্যু কি খুব সহজ হবে?’ তুষার ধীর গলায় বললো। ‘নাকি তোমরা এখনো জানো না, আমি কাকে বিশ্বাস করি?’

‘তুমি জানো না, তুষার, ঋতাভরী ধীরে হাসলো। ‘এই খেলায়, আমরা সবাই দাবার গুটি মাত্র। প্রশ্ন হলো—তুমি কি রাজা, নাকি সৈনিক?’

তুষার ভাবছে পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বেশ জটিল। ঋতাভরী আসলে কি নিজেই এসব করছে নাকি বাধ্য হয়েছে আগের মতোই। সে একটা চাল চাললো, ঋতাভরীকে বললো, ‘শোনো ঋতাভরী। তুমি আমার দীর্ঘদিনের কলিগ, তুমি কবে এসবের সাথে যুক্ত হয়েছো তা আমার জানা নেই। তবে আমি তোমার খুশির জন্যে সাহায্য করতে পারি। তবে যদি পেছনের ওই চারজনের কারণে তুমি ফেঁসে গিয়ে থাকো তাহলে মৃত্যুই আমার কাম্য। এখন বলো, তুমি কী চাও, মৃত্যু নাকি সহযোগিতা।’

ঋতাভরী চূড়ান্ত চমক দেয়— সে তুষারকে বলে, ‘তুমি কি জানো, এই সিদ্ধান্ত আজ তোমার একার নয়?’

ঠিক তখনই বাইরের দরজা ধীরে খুলে যায়। সেখানে ধীরে ধীরে মেজর ইরফানের ছায়ামূর্তি ভেসে উঠে। অবাক হলো তুষার। ‘মেজর ইরফান!’

‘তুষার, তুমি কি মনে করছো, এই যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের? কখনো কখনো, সত্যিকারের যুদ্ধ মন আর বিশ্বাসে লড়া হয়। আমরা কুকি চিনের সদস্যদের সহযোগিতা করবো অন্য দুটি দলকে ধ্বংস করতে। তাই আর কোনো দ্বিধা নয়। কুকি চিনের সদস্যদের সহযোগিতা করে তাদের সাথে একসাথে যুদ্ধ করে কেএনএফ আর জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়ার জঙ্গিদেরকে ধ্বংস করতে চাই। কারণ তারা পূর্বে আমাদের একজন মেজরকে হত্যা করেছে আর ক’জন আর্মি সদস্যকেও খুন করেছে।’

‘কিন্তু কুকি চিনও তো...।’

‘কুকি চিন ন্যায্যতার মধ্যে আছে। তোমার সেটা ভাবার বিষয় নয়। আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করবো এবং অন্য দুটি চরমপন্থী দলকে বিনাশ করবো।’

এ কোন্ মেজর ইরফান। ভাবছে সে। ঋতাভরীকেও সে আজ চিনতে পারছে না। তার মস্তিষ্কের ভেতর ঝড় বইছে। এক সময় তার মস্তিস্ক তাকে এমন একটা বার্তা দিলো, যা তাকে সবকিছু বুঝে নিতে সাহায্য করলো। সে চেয়ার থেকে উঠে বসলো, তারপর বললো, ‘মেজর আপনি মহান। কিন্তু আমি যুদ্ধের জন্য নই, আমি সত্যের জন্য লড়ছি। সত্যকে চাপা দেওয়া যায় না, ঠিক যেমন অন্ধকার কখনো আলোকে ঢেকে রাখতে পারে না।’

এ সময় পাশের দরজাটা খুলে গেলো। তাকে দেখে চমকে উঠলো তুষার আহমেদ। তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ‘নাথান বম! কুকি চিনের প্রতিষ্ঠাতা?’

‘হ্যাঁ, তাই। তবে এই যুদ্ধ তুমি যা ভাবছো, তার চেয়েও গভীর।’ (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়