বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১২

আশেকে রাসূল (দ.) আল্লামা খাজা আবু তাহের (রহ.) এক উজ্জ্বল জীবন

আয়মান উদ্দীন আফ্রিদী
আশেকে রাসূল (দ.) আল্লামা খাজা আবু তাহের (রহ.) এক উজ্জ্বল জীবন

পীরে কামেল, ইমামে আহলে সুন্নাত, মুর্শিদে বরহক্ব, আশেকে রাসূল (দ), সুলতানুল ওয়ায়েজিনÑহযরতুল আলহাজ্ব আল্লামা শাহ্সূফী খাজা আবু তাহের (রহ.) ছিলেন তাঁর সময়ের এক অনন্য আলেমে দ্বীন, প্রজ্ঞাবান সূফী সাধক ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের এক বলিষ্ঠ অভিভাবক। তাঁর জীবন ছিল ইলম, আমল, নবীপ্রেম, মানবিক দয়া ও সমাজসংস্কারের এক দীপ্তিময় সমন্বয়। তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই অসংখ্য আশেকের হৃদয়ে জেগে ওঠে গভীর রুহানি আবেগÑকারণ তিনি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং নিজের পুরো জীবনকে কুরআন-সুন্নাহ, তরিকত ও নেক আমলের আলোয় আলোকিত করেছিলেন।

আল্লামা খাজা আবু তাহের (রহ.) ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে চাঁদপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী ইসলামপুর গাছতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল প্রাচীন রুহানি পরম্পরায় সমৃদ্ধ। পিতৃকুল ও মাতৃকুল উভয় দিক থেকেই তিনি পেয়েছিলেন সূফী সাধনা, তাকওয়া ও নবীপ্রেমে গঠিত এক মহান উত্তরাধিকার।

শৈশবকাল থেকেই তিনি এমন এক পরিবেশে লালিত হনÑযেখানে দ্বীনি শিক্ষা, তরিকতের আদব এবং রাসূলপ্রেম ছিল জীবনের প্রধান ভিত্তি। তাঁর পিতা ছিলেন কুতুবুল ইরশাদ, মহিউস সুন্নাহÑহযরতুল আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী সূফীজি আল্লামা খাজা আহমাদ শাহ নক্বশবন্দী মুজাদ্দেদী (রহ.)। তিনি নিজেও ছিলেন যুগের একজন কামেল শায়খ ও পরিপূর্ণ মুর্শিদ। এই মহান পিতার তত্ত্বাবধানেই খাজা আবু তাহের (রহ.) দ্বীনি ও তরিকতী শিক্ষায় গভীরতা অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি কেবল স্থানীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং দ্বীনি ও আধুনিকÑউভয় ধারার শিক্ষায় সমানভাবে কৃতিত্ব অর্জন করেন। মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা থেকে কামিল (হাদীস) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামী শিক্ষায় অনার্স সম্পন্ন করেন। এই সমন্বিত শিক্ষা তাঁকে একদিকে তরিকতের গভীর অন্তর্দৃষ্টি দান করে, অন্যদিকে সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে ইসলামের বাস্তব প্রয়োগ অনুধাবনে সহায়তা করে। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মসজিদে খেদমতে নিয়োজিত হন। বিশেষভাবেÑশহীদবাগ জামে মসজিদ, কমলাপুর রেলওয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ-এ দীর্ঘ সময় খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর খুতবা ও দরদভরা নসিহতের মাধ্যমে অগণিত মানুষ ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যের সন্ধান লাভ করে।

আল্লামা খাজা আবু তাহের (রহ.) উপলব্ধি করেছিলেনÑইসলামের দাওয়াত কেবল বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা ও ঐক্যবদ্ধ কাঠামো।

১৯৮৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেনÑ“আঞ্জুমানে আশেকানে মোস্তফা (দ.)”। যার মূল লক্ষ্য ছিল নবীপ্রেম জাগ্রত করা, তাকওয়া বৃদ্ধি এবং মানবিক সমাজ গঠন। ১৯৮৫ সালে দেশের প্রখ্যাত আহলে সুন্নাত ওলামা-পীর-মাশায়েখদের ঐক্যবদ্ধ করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেনÑবাংলাদেশ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত। এই সংগঠন তৎকালীন ভ্রান্ত মতবাদ ও বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সুন্নি আকিদা রক্ষায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যা এবং ১৯৯১ সালের প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনি নিরবে মানুষের পাশে দাঁড়ান। খাদ্য, ত্রাণ, সহযোগিতা ও সান্ত্বনার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেনÑইসলাম কেবল বক্তব্য নয় ইসলাম মানবতার নাম। তাঁর জীবনের এক গৌরবময় অধ্যায় ছিল সুন্নি ঐক্য ও নবীপ্রেমভিত্তিক গণআন্দোলন। ঢাকায় প্রথমবারের মতো বিশ্ব সুন্নি সম্মেলন আয়োজন করেন। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে জশনে জুলুস রাজধানীতে প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে তাঁর এই উদ্যোগ সারাদেশের সুন্নি দরবার ও সংগঠনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর ওয়াজ ছিল হৃদয়স্পর্শী, আবেগপূর্ণ ও অশ্রুসিক্ত। কথায় থাকত নবীপ্রেমের আগুন, কণ্ঠে থাকত দরদ, আর বক্তব্যে থাকত আখিরাতের ডাক। অসংখ্য মানুষ তাঁর ওয়াজ শুনে তওবা করেছেন, গুনাহ ত্যাগ করেছেন এবং নতুন জীবন শুরু করেছেনÑযার সাক্ষী তাঁর অগণিত মুরিদ ও অনুসারী।

১৯৯২ সালে তিনি ঢাকার উত্তর শাহজাহানপুরে প্রতিষ্ঠা করেনÑ“রেলওয়ে হাফেজিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদরাসা।” এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল তাঁর হৃদয়ের খুব নিকটবর্তী। তিনি বলতেনÑ“এই মাদরাসা নূহ (আ.)-এর নৌকার মতোÑযে আঁকড়ে ধরবে, সে নাজাত পাবে।” এছাড়া তিনি প্রকাশ করেন মাসিক সাময়িকীÑ “সোনার মদিনা”, যার মাধ্যমে নবীপ্রেম, সহীহ আকিদা ও নৈতিক শিক্ষার আলো সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি কখনো খ্যাতি বা সম্মানের পেছনে ছোটেননি। ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, উদার ও দরদী। আলেমদের সম্মান, ছাত্রদের স্নেহ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ তাঁকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছিল।

অবশেষে এই মহান সাধক দুনিয়ার খেদমত শেষ করে মহান রবের দরবারে উপস্থিত হন। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা, সংগঠন, দাওয়াতি কাজ ও নবীপ্রেমভিত্তিক আন্দোলন আজও জীবন্ত রয়েছে। তিনি রেখে গেছেন এক আলোকবর্তিকাÑযা অনুসরণ করে আজও হাজারো মানুষ সুন্নাহর পথে চলছেন।

আল্লামা খাজা আবু তাহের (রহ.) ছিলেন এমন এক মহামানবÑযিনি নিজের জীবন, ইলম, মেধা ও রুহানীয়তা সম্পূর্ণরূপে দ্বীনের খেদমতে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর জীবন ছিল শিক্ষা, সেবা, ত্যাগ ও নবীপ্রেমের এক অনুপম দৃষ্টান্তÑযা চিরকাল সুন্নি সমাজের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। এই মহান আল্লাহর ওলি, আশেকে রাসূল (দ.)-এর পবিত্র দরবারের ফয়েজ ও নূর যেন আমাদের অন্তরে অন্তরে পৌঁছে যায়। তাঁদের ইখলাস, আদব ও নবীপ্রেমের ছায়ায় আমাদের জীবন আলোকিত হওয়ার তাওফিক আল্লাহ তাআলা সবাইকে নসিব করুনÑআমিন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়