বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৬

‘কৃষিকণ্ঠে’র অনুপ্রেরণায় বদলে যাওয়া জীবন ও কৃষি উদ্যোগ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে উদ্যোক্তা ও কৃষকদের কৃতজ্ঞতা

কৃষিকণ্ঠ প্রতিবেদক
‘কৃষিকণ্ঠে’র অনুপ্রেরণায় বদলে যাওয়া জীবন ও কৃষি উদ্যোগ

কৃষিই বাংলাদেশের প্রাণ। আর সেই কৃষিকে আধুনিক, লাভজনক ও মর্যাদাশীল পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের মাসিক বিশেষ আয়োজন ‘কৃষিকণ্ঠ’। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কৃষিকণ্ঠ শুধু সংবাদ পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মাঠ পর্যায়ে কৃষক, খামারি ও উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহস জুগিয়েছে, দিকনির্দেশনা দিয়েছে এবং সফলতার গল্প তুলে ধরেছে।

কৃষিকণ্ঠের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন প্রান্তের সফল কৃষি উদ্যোক্তা ও খামারিরা তাদের অর্জনের পেছনে ‘কৃষিকণ্ঠে’র অবদানের কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

ডেইরি শিল্পে আইকন বিসমিল্লাহ ডেইরি ফার্ম

চাঁদপুর শহরের কোড়ালিয়া রোডস্থ বিসমিল্লাহ ডেইরি ফার্মের স্বত্বাধিকারী মো. হাবিবুর রহমান বেপারী ২০১৪ সালে ছোট পরিসরে ডেইরি খামার দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। সময়ের ব্যবধানে তিনি আজ একজন সফল ও পরিচিত ডেইরি উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন।

নিজস্ব খামার থেকে উৎপাদিত বিশুদ্ধ খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে তিনি দই, মিষ্টি, ছানা সহ নানা ধরনের দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করছেন। শহরের একটি মহল্লায় অবস্থিত তার দোকানে প্রতিদিন ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে।

হাবিবুর রহমান বেপারী বলেন, “কৃষিকণ্ঠ’ আমাকে বারবার সাহস দিয়েছে, উজ্জীবিত করেছে। ‘কৃষিকণ্ঠ’ না থাকলে হয়তো এই পথচলাটা এত সহজ হতো না।” ‘কৃষিকণ্ঠে’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিনি মাওলানা মো. আবদুর রহমান গাজীসহ ‘কৃষিকণ্ঠে’র সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শুভ কামনা জানান।

ছাদ কৃষিতে দৃষ্টান্ত : পৌর কর্মী আরিফুর রহমান ঢালী

চাঁদপুর পৌরসভার কার্য সহায়ক মো. আরিফুর রহমান ঢালী প্রমাণ করেছেন—ইচ্ছাশক্তি থাকলে কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝেও কৃষিকে আপন করে নেওয়া যায়। ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিলো। সেই আগ্রহ থেকেই নিজ বাড়ির ছাদে গড়ে তুলেছেন এক ব্যতিক্রমী সবজি ও ফলের বাগান, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘চাঁদবাগান’।

প্রায় কয়েক বছর ধরে ছাদে দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফলগাছ রোপণ করে তিনি ফলসহ চারা উৎপাদন ও বিক্রি করছেন। এতে একদিকে যেমন পারিবারিক চাহিদা মিটছে, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে বাড়তি আয়ের সুযোগ। তার বাগানে রয়েছে চায়না কমলা, পাকিস্তানি কমলা, থাই টু কমলা, জায়ান্ট দার্জিলিং কমলা, মাল্টা, মুসাম্বি, বাইনুকুর আঙ্গুর, আম, খেজুর, জাম্বুরা, আমড়া, পেঁপে ও ছবেদাসহ নানা জাতের ফলগাছ। পাশাপাশি পুঁইশাক, লাউ, কুমড়া, আখ, কাঁচা মরিচ ও ধনিয়ার মতো শাকসবজিও চাষ হচ্ছে।

আরিফুর রহমান বলেন, “অফিসের কাজের পাশাপাশি বাগান পরিচর্যা করা আমার নেশা। এতে মানসিক শান্তি পাই, আবার বাড়তি আয়ও হয়।”

ফলসহ গাছ কিনতে আগ্রহীরা ০১৮৫৫-৯৫৮৯৯৬ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।

‘কৃষিকণ্ঠে’র মাধ্যমে কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরামর্শ পাওয়ায় তিনি আরও এগিয়ে যেতে পেরেছেন বলে জানান এবং কৃষিকণ্ঠের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

কোয়েল খামারে আত্মকর্মসংস্থান : তুহিন খানের সাফল্য

চাঁদপুর পৌরসভার মির্জাপুর এলাকার তরুণ উদ্যোক্তা মো. তুহিন খান কোয়েল পাখি পালনের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ছাত্রজীবনেই মাত্র ২০টি কোয়েল পাখি নিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়। ধৈর্য, পরিশ্রম ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় আজ তার খামারে রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি কোয়েল পাখি। এই খামার থেকে প্রতিদিন ডিম ও মাংস বিক্রি করে তিনি নিয়মিত আয় করছেন। এখান থেকেই নিজের পড়ালেখা ও সংসারের খরচ চালাচ্ছেন এবং একজন কর্মীকেও নিয়োগ দিয়েছেন।

তুহিন খান বলেন, “কৃষিকণ্ঠ আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে, সাহস দিয়েছে। তাদের উৎসাহেই আজ আমি স্বাবলম্বী।”

তার এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকায় আরও কয়েকজন যুবক কোয়েল খামার গড়ে তুলছেন।

দক্ষিণ কোরিয়া ফেরত জসিম গাজীর ডেইরি ও পোল্ট্রিতে স্বনির্ভরতা

দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে দেশে ফিরে মো. জসিম উদ্দিন গাজী চাঁদপুর সদর উপজেলার তরপুরচণ্ডী ইউনিয়নে গড়ে তুলেছেন গাজী ডেইরি খামার ও গাজী পোল্ট্রি খামার। তার খামার থেকে নিয়মিত দুধ, গরুর মাংস ও মুরগি সরবরাহ হওয়ায় এলাকাবাসীর নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা মিটছে স্থানীয়ভাবেই।

প্রতি সপ্তাহে তার খামার থেকে গরু জবাই করে বিক্রি করা হয়। ফলে মানুষকে আর শহরমুখী হতে হচ্ছে না।

তিনি বলেন, কৃষিকণ্ঠের পরামর্শ ও নৈতিক সমর্থন তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।

স্বল্প আয় থেকে সফল উদ্যোক্তা

ওসমান গনির পল্লী এগ্রো ফার্মের নানামুখী কার্যক্রম

ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৫ নং রূপসা উত্তর ইউনিয়নের গাব্দেরগাঁও গ্রামের মৎস্য চাষী ও সফল উদ্যোক্তা ওসমান গনি। স্বল্প আয়ের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে আজ তিনি নিজ এলাকায় একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত ওসমান গনির পল্লী এগ্রো ফার্ম বর্তমানে মৎস্য, ডেইরি ও কৃষিখাতে নানামুখী কার্যক্রমের মাধ্যমে এগিয়ে চলেছে।

শুরুতে সীমিত পুঁজি নিয়ে মৎস্য চাষে হাত দেন ওসমান গনি। নানা প্রতিকূলতা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন দক্ষ মৎস্য উদ্যোক্তা হিসেবে। বর্তমানে তার খামারে আধুনিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারে চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মৎস্য চাষের পাশাপাশি তিনি ডেইরি কার্যক্রমও চালু করেছেন। খামারে উন্নত জাতের গরু লালন-পালনে দুধ উৎপাদন করে তা বাজারজাত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ফার্মের আওতায় কৃষিকাজও পরিচালিত হচ্ছে। ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে খামারের খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ও অর্জন করছেন তিনি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—ওসমান গনি শুধু নিজেই খামারের কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত নন, তার অধীনে বহু শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। ফলে এই পল্লী এগ্রো ফার্মটি এলাকার মানুষের জন্যে কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে। মৎস্য চাষ, ডেইরি ও কৃষিকাজে যুক্ত শ্রমিকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ওসমান গনি জানান, পরিশ্রম, সততা ও ধৈর্য থাকলে অল্প আয় থেকেও বড়ো কিছু করা সম্ভব। তিনি ভবিষ্যতে খামারের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান।

ওসমান গনির পল্লী এগ্রো ফার্ম তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্যে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে—সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়েও টেকসই উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব।

প্রান্তিক কৃষক বিল্লাল গাজীর মুখে হাসি

তরপুরচণ্ডী এলাকার প্রান্তিক কৃষক বিল্লাল গাজী দেশীয় শাকসবজি উৎপাদনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আগাম সবজি উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি স্থানীয় বাজারে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করছেন।

‘কৃষিকণ্ঠে’র সহায়তায় কৃষি অফিসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ফলে তিনি বিনামূল্যে সার, বীজ ও সরকারি প্রণোদনা পেয়েছেন। এতে তার জীবনে এসেছে স্বস্তি।

তিনি বলেন, “কৃষিকণ্ঠ আমার মতো গরিব কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছে—এটাই আমার সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি।”

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়