প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৮
ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় কচুয়ার কাউছারের মৃত্যু
বাবার লাশের জন্যে সন্তানদের অপেক্ষা

নিষ্পাপ চাহনি, বাবার অপেক্ষায় সন্তানেরা। তবে জীবিত নয়—শেষবারের মতো বাবার মরদেহটি দেখার অপেক্ষা। আহাজারি করতে করতে বলছে, ‘আমার বাবাকে আইন্না দেন; আমার বাবা মইরা গেছে; বাবা… ও বাবা।’ মুহূর্তেই চোখের কোণে জমে পানি। চোখ মুছে আবারও বাবাকে ডাকে ছোট্ট সন্তানেরা।
|আরো খবর
অবুঝ শিশু ওজিহা বাবার স্নেহ-স্পর্শই পায়নি। তার জন্মের আগেই সংসারের অভাব ঘোচাতে প্রবাসে পাড়ি জমান কাউছার হোসেন। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। ওমানে গত ১৮ মার্চ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। পরে ২৫ মার্চ ওমানের একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। এখন ওজিহার হাতে বাবার ছবি, যা শুধুই স্মৃতি। ওজিহা সেই ছবি বুকে আগলে রাখে।
চাঁদপুরের কচুয়া পৌরসভার কড়ইয়া গ্রামের বাসিন্দা, তিন সন্তানের জনক প্রবাসী কাউছার হোসেন (৪০)। তিনি নুর মিয়া সওদাগর বাড়ির আমির হোসেনের মেজো ছেলে। তার মরদেহ বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে সোমবার (৬ এপ্রিল ২০২৬) রাত সাড়ে ৭টায় এ প্রতিবেদককে জানান তার জেঠাতো ভাই সুমন। তিনি আরো জানান, মঙ্গলবার সকাল ৮টায় হয়তো মরহুমের জানাজা হতে পারে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে প্রবাসে পাড়ি জমান কাউছার। কথা ছিলো কোরবানির ঈদে বাড়িতে ফিরবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—তার মৃত্যুতে সাজানো সংসারে নেমে এসেছে দুঃখের ছায়া। তার তিন ছোট্ট মেয়ে বাবাকে একনজর দেখার জন্যে অঝোরে কাঁদছে।
নিহতের স্ত্রী জান্নাত আক্তার চাঁদপুর কণ্ঠকে বলেন, আমার ছোট্ট বাচ্চা বারবার তার বাবাকে এনে দিতে বলছে। আমি ঋণ করে, অন্যের কাছে হাত পেতে দু লাখ টাকা জোগাড় করে স্বামীর লাশ দেশে আনার ব্যবস্থা করেছি। এখন কীভাবে আমি এ ঋণ পরিশোধ করবো? আমার স্বামী একটি বসতঘর করে দিয়ে যেতে পারেননি। আমার তিনটি অবুঝ সন্তান, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে এ চিন্তায় আছি। আমি প্রশাসনের সহযোগিতা চাই। পাশেই তার অবুঝ সন্তান মাইশা ও মীম বারবার বলছে, ‘আমার বাবাকে আইন্না দেন, আমার বাবা মইরা গেছে, বাবাকে একটিবারের মতো দেখবো।’ তাদের আহাজারি থামছেই না।
এদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দিশেহারা বাবা-মা। নিহতের বাবা আমির হোসেন ও মা মাহফুজা বেগম বলেন, প্রায় ৫ লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। এখন আবার ঋণ করে ছেলের মরদেহ দেশে আনতে হয়েছে। আমাদের ছেলের সাজানো-গোছানো সংসারটি তছনছ হয়ে গেলো। আমরা এখন কী করবো, জানি না। এসব কথা বলেই তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সরকার ও বিত্তশালীদের অসহায় এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো জরুরি বলে মনে করেন প্রতিবেশী ও স্বজনরা। পাশাপাশি অবুঝ তিন শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে সরকারের প্রতি দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান অসহায় পরিবারটিকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠকে তিনি বলেন, কচুয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার পরিবারটির সাথে যোগাযোগ করেছেন। ইউএনও পরিবারটিকে আর্থিক সহযোগিতা করার ব্যবস্থাগ্রহণ করেছেন। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অসহায় পরিবারটিকে সহযোগিতা করা হবে।
রোববার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাউছার হোসেনের বাড়িতে ভাঙ্গাচুরা বসতঘরটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সচ্ছল জীবনের আশায় প্রবাসে গেলেও স্ত্রী-সন্তানদের জন্যে আলাদা কোনো ঘর করে যেতে পারেননি তিনি। বর্তমানে তার স্ত্রী-সন্তানরা পৈত্রিক ভিটার একটি ছোট ঘরে বসবাস করছে।








