শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ১৭:০১

মূলস্রোতের পথে বেদে জনগোষ্ঠী—সরকারি সহায়তায় বদলে যাচ্ছে জীবনচিত্র

আমেনা আক্তার:
মূলস্রোতের পথে বেদে জনগোষ্ঠী—সরকারি সহায়তায় বদলে যাচ্ছে জীবনচিত্র

বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বেদে সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলা, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার। নদী-নির্ভর যাযাবর জীবন, অনিরাপদ বসবাস এবং শিক্ষার অভাবে তারা সমাজের মূলধারা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগে এই চিত্রে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় গৃহীত বিভিন্ন ভাতা ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বেদে জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকার বরাদ্দ দেয় ৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এই বরাদ্দের আওতায় বিশেষ বয়স্ক ভাতা পেয়েছেন ৫,০৬৬ জন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যারা কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, তাদের জন্য এই ভাতা এক ধরনের নিরাপত্তার আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ৩,৯৯৮ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা উপবৃত্তির আওতায় এসেছে, যা তাদের শিক্ষাজীবন চালিয়ে যেতে উৎসাহ জুগিয়েছে। এছাড়া ৪০০ জনকে বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যা তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিচ্ছে।

অন্যদিকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৫২ লাখ টাকায়। নতুন অর্থবছরে বিশেষ বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৫,৬০০ জনে উন্নীত করা হয়েছে। শিক্ষা উপবৃত্তির আওতায় আসবে ৪,৩৪৮ জন শিক্ষার্থী। যদিও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উপকারভোগীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখনও নির্ধারিত হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বেদে শিশুদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে সরকার বিশেষ উপবৃত্তি চালু করেছে। স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা মাসিক সর্বনিম্ন ৭০০ থেকে সর্বোচ্চ ১,২০০ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছে। এতে করে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছে। আগে যেখানে বেদে শিশুদের বড় একটি অংশ পেশাগত কারণে পড়াশোনা থেকে দূরে থাকত, এখন সেখানে শিক্ষার হার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একই সঙ্গে ৫০ বছরের নিচে অস্বচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা প্রদান করা হচ্ছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় নির্বাহে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। আর ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে অস্বচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে প্রশিক্ষণ বাবদ এককালীন ১০,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা। এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে অনেকেই ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প বা বিকল্প পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

সরকারি এই উদ্যোগগুলো শুধু আর্থিক সহায়তা প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মাধ্যমে বেদে জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তাদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে একটি টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করা হচ্ছে।

তবে বাস্তবতা হলো, এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অনেক বেদে পরিবার এখনও স্থায়ী আবাসনের বাইরে, নদী বা খালের পাড়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়মিতভাবে গ্রহণ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্যের কারণে তারা অনেক সময় মূলধারার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকর করতে হলে মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা ও কমিউনিটির মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বেদে জনগোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনে আশার আলো জাগিয়েছে। ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এবং সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও একদিন দেশের উন্নয়নের মূলস্রোতে সম্পৃক্ত হয়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে সক্ষম হবে।

লেখক : আমেনা আক্তার, অনার্স চতুর্থ বর্ষ (ইংরেজি) কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়