শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ০৮:৩৪

আমার মা

রাজীব কুমার দাস
আমার মা

মা ছোট্ট একটা শব্দে লুকিয়ে থাকা মমতার অসীম অনুভবের নাম। সকল কষ্টের বিপরীতে এক পরম প্রশান্তির স্থান। মা হলো সন্তানের প্রথম শব্দ, প্রথম সাহস। মা জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু। শৈশব থেকে বার্ধক্য নারীর বহুরূপের মাঝে এটি এমন এক রূপ যে রূপে সে মানব থেকে হয়ে ওঠে দেবী। মা পৃথিবীর সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা যার তুলনা করার জন্য পৃথিবীতে কোনো উপাদান পাওয়া যায় না। মানুষের মধ্যে বহু বিভেদ আমরা দেখে থাকি। জাতিগত, প্রথাগত, সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি বহু বিভাজনে বিভক্ত হলেও সকল বিভক্তিতে মা অবিভক্ত এক সত্তা। অসুস্থতা বা ব্যাথা পাওয়ার পর বেদনায় কাতারানো প্রথম শব্দটা আচমকাই বেড়িয়ে আসে মা। মা বিষয়টা মানুষের মাঝে শুধু সীমাবদ্ধ নয় সকল প্রাণীতে মা বিরাজমান। সেদিন একটি মা মুরগীকে উঠোনে তার ছানাদের নিয়ে ঘুরতে দেখলাম। বাচ্চারা কাছাকাছি কিন্তু ছড়ানো ছিটানো এদিক-ওদিক। হঠাৎ একটা কাক শব্দ তুলে উড়ে এলো। কাক কাছে আসছে দেখে মুরগীটা ভয় উপেক্ষা করে কাকটাকে তেড়ে গেল মারতে। কাকটা নাছোড়বান্দা দেখে মা মুরগীটা তার সব ছানাগুলোকে কাছে এনে পাখায় আগলে ধরে বসে রইল।

পাড়ার মোড়ে ক্ষুধার্থ কুকুরছানা যখন বৃষ্টিতে ভিজে কাতরাচ্ছে তখন মা কুকুরটা কোথা থেকে যেনো ছুটে এসে বাচ্চাকে মুখে তুলে নিয়ে পরিত্যাক্ত ম্যানহোলটায় চলে গেল। কাছাকাছি গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি সে প্রথমে সন্তানের গা চেঁটে তাকে পরিষ্কার করার চেষ্ঠা করছে। তারপর পেটের নিচে জড়িয়ে ধরে বসে বাচ্চাকে শরীরের উত্তাপ দিতে লাগলো।

প্লাটফরমে পড়ে থাকা ভিখেরী মেয়েটা এক কন্যা সন্তানের জননী। একদিন দেখি রেললাইনের পাশে জঙ্গল থেকে জংলী ফুল কুড়িয়ে এনে মালা বানিয়ে তার কোলের বাচ্চাকে সাজাচ্ছে আর বলছে হেসে হেসেÑ‘ওরে আমার রাজকন্যা, আমার রানী’। রেলওয়ে বস্তিতে গেলে প্রায়ই দেখা যায় বাচ্চাদের নিয়ে মা বসেছে খাবার খেতে। সারাবেলায় সংগ্রহ করা খাবার যেখানে অপ্রতুল সেখানে তার ভাগেরটাও সন্তানের মুখে তুলে দিচ্ছে সানন্দে। নিজে খেতে না পারার কোনো কষ্ট নেই বরং সন্তানের মুখে তুলে দিতে পারাটাই যেনো তার সার্থকতা, সন্তুষ্টি।

সেদিন টিভিতে একটি চ্যানেলে দেখলাম ডলফিন মাছদের জীবন প্রণালী। সেখানেও দেখি মা ডলফিন তার বাচ্চাদের ভরনপোষন ও রক্ষায় বেশ সোচ্চার। প্রাণীকূলকে বিভিন্ন ভাগে বিভাজন করা যায় যেমনÑপশু, পাখি, মাছ কিংবা মানুষ কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে মাকে বিভাজন করা যায় না দেখছি। প্রাণ থাকলে যেমন প্রানী তেমনি সন্তান থাকলেই মা। মা বিষয়টাকে ভাবলে দেখা যায় সে সকল কিছুতেই মিশে আছে ঈশ্বরের মতো আশীর্বাদী হয়ে। কোলের সন্তানটা বিছানায় রেখে দিলে কাঁদে অথচ যখনই তার মা কোলে তুলে নেয় অনায়াসেই সে তার কান্না থামিয়ে নেয় কারণ সে বুঝতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল এটা। মায়ের কোন জাত নেই, কোন বর্ণ নেই, কোন বিভাজন নেই। যা আছে তা হলো একটি দৃঢ় সত্তা একটি নির্দিষ্ট পরিচয়। একটা নারীর মাঝে মায়ের রূপটা মহান যেখানে সে তার সন্তানের জন্য উদার, নিঃস্বার্থ, পূণ্যবান। পশু কিংবা মানুষ মা সকলের মাঝে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ হয়ে বিরাজমান। ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য এই সকল কিছুর ঊর্ধ্বের মা একটি চেতনা। গুণিজনেরা বলতো, শুনতামÑমা হলো প্রতিটি মানুষের প্রথম গুরু, যেখানে মানুষটা তার বাক্য শ্রবণ করে কথা বলার প্রথম প্রকাশ করে। মা হচ্ছে সেই শিক্ষক যে তার সন্তানকে হাত ধরে চলতে, প্রথম বলতে ও বুঝতে শিখায়। এজন্যই হয়তো মণীষিরা মাকে দেবীর স্থানে রেখেছেন। সৃষ্টিকর্তা যদি মাকে সন্তানের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব দিত তাহলে এ পৃথিবীতে কোনো সন্তান অভাগা হতো না। কেউ যদি বলে ‘তুমি ঈশ্বর দেখেছ কী?’ তাহলে বলবো ‘আমি এ পৃথিবীতে আমার মাকে দেখেছি।’

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়