শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ০৮:২৮

মায়ের দেয়া শেষ উপহার

হাসান আলী
মায়ের দেয়া শেষ উপহার

মায়ের ফোন বাজতেই ধরলাম, তুই কবে আসবি চিটাগাং? আমার একলা একলা ভালো লাগে না। কেউ নাই, সারাদিনই বলতে গেলে একা থাকি। তোর ভাইকে মাঝে মধ্যে খাবার টেবিলে দেখি। কথা বলার একটা মানুষ নাই। তুই ব্যস্ত তোর নাতিকে নিয়া। সবাই তোরা ব্যস্ত তোদেরকে নিয়া। আমি একজন মানুষ এইটা তোদের মাথায় নাই। তোরে এতো করে বললাম আমারে একটু ফরিদপুর নিয়া যা। তুই সময় করতে পারলি না। আমি একটু বাড়িতে যামু।কয়দিন থাইকা আসি।তোর মামী যাবার জন্য কেবল ফোন করে।

আমি বললাম, মা, আপনার শরীরটা ভালো না। এই অবস্থায় বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না।অনেক দূরের পথ, ৫/৬ ঘন্টার জার্নি।

মা বিরক্ত হয়ে বললেন, আমি এখন গোসল করতে যাই, ফোন রাইখা দে। পরে কথা কমু।

পরদিন ফোনে মাকে না পেয়ে ভীষণ বিরক্ত হয়ে ছোট বোনকে ফোন করে জানলাম, মা নজিরকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গেছেন।

বার বার ফোন করে মাকে না পেয়ে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লাম। মায়ের ফোন বাজতেই ধরলাম, বাবা মোবাইলে চার্জ ছিলো না আর মোবাইলটার জানি কী হইছে, ফোন আসলে রিংটোন বাজে না। আমি বললাম, মা আমি পরশু মঙ্গলবার বাড়িতে আসবো।

ফরিদপুর থেকে ঢাকা হয়ে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। ঘন্টা খানেক পরই মায়ের ফোন, তুই এখন কোন্ পর্যন্ত আসছিস?সাবধানে আসিস বাবা।দিনকাল ভালো না।

আমি সন্ধ্যার সময় বাড়ি পৌঁছে গেলাম। মায়ের উচ্ছ্বসিত হাসিতে মনটা জুড়িয়ে গেলো। গোসল করে খেতে বসলাম। খাবার টেবিলে ছোট মাছ, বড়ো মাছ, মুরগী, সবজি, ডাল দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললাম, এতো কিছু রান্নার কী দরকার ছিলো? মা বললেন, এগুলো মনোরা রান্না করছে। আমি না করছি এতো কিছু রান্না করার দরকার নাই। কে শুনে কার কথা। মনোরা কয়, কাকা অনেক দিন পর বাড়িতে আসতেছে, একটু বেশি রান্না করলে অসুবিধা কী? উনি না খাইলে আমরা খামু।

খাবার শেষে মায়ের বিছানায় বসলাম। বাড়ির কথা উঠলো, নারকেল, সুপারি, কাঁঠাল, আমড়া, জলপাই, জাম্বুরা

গাছগুলোর যত্ন হয় না বলে দুঃখ করলেন। বিয়ের পর এই বাড়িতে যখন আসলেন তখনকার স্মৃতিচারণ করলেন। শ্বশুর শাশুড়ির গল্প বললেন।

বললেন, ১৯৬১ সালে তোর বাপের বেতন ছিলো ৭৫ টাকা। কতো কষ্ট করে কম বয়সে এই বাড়ির অংশ ওয়ারিশানদের কাছ থেকে কিনছে।

মা বললেন, তোর ভাই আর তোর ভাতিজা অনলাইনে কতো কিছু কিনে। পছন্দ না হইলে ঘরে ফেলে রাখে। এবার আমি অনেকগুলো শার্ট, গেঞ্জি, পাঞ্জাবি বাড়িতে নিয়ে আসছি। গ্রামের মানুষকে দিয়া দিমু। তোর জন্যে একটা হাফশার্ট আর একটা ফতুয়া নিয়া আসছি। গায়ে দিয়ে দেখ লাগে কিনা। মা’র ৬৩ বছরের বুড়ো ছেলের জন্যে এমন আকুলতা আমার চোখে পানি এনে দিলো। আমি বললাম, মা আমার তো অনেক জামা কাপড় আছে। এগুলো অন্য কাউকে দিয়ে দিন। মুহূর্তে মায়ের মুখখানি কালো হয়ে উঠতে দেখে তাড়াতাড়ি ফতুয়াটা গায়ে দিলাম। মা’র মুখখানি হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ফতুয়া খুলে হাফশার্ট পরলাম। মা জোরে হেসে উঠে বললেন, তোরে শার্টটা অনেক মানাইছে। আমার ওপর কারো বদ নজর লাগবে এই ভয়ে মা আমার গায়ে হালকা থুথু ছিটিয়ে দিলেন। মা’র সাথে শুয়ে শুয়ে কথা বলতে বলতে মায়ের বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে নাস্তা খাবার সময় মা চিন্তিত মুখে বললেন, তোর শরীর ভার দিয়ে গেছে, আর নাক ডাকে। মায়ের দেয়া উপহার নীল রংয়ের শার্ট পরে নিলাম। বাড়ি থেকে রওয়ানা হবার সময়ে দরজায় দাঁড়িয়ে বরাবরের মতো মা আমার জন্যে দোয়া করলেন। আমি হাতের মোবাইল দিয়ে মায়ের একটা ছবি আর একটা সেলফি তুললাম। এটাই ছিলো মায়ের সাথে শেষ স্মৃতি।

লেখক পরিচিতি : হাসান আলী, ফ্ল্যাট ৬-ডি/৬, নাভানা প্রবাণী রিজডেল, ব্লক -এফ, মিরপুর -১১,ঢাকা। ফোন : ০১৭১১৪৬৮১৮৮

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়