শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ১৩:৩৫

স্মৃতির বারান্দা

নাহিম হোসেন
স্মৃতির বারান্দা

নিভৃত পল্লীর এক প্রান্তে জীর্ণ ছোট একটি ঘর। সেখানে বাস করেন বৃদ্ধ রহমত আলী। তাঁর একমাত্র ছেলে আকাশ এখন শহরের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। কাজের প্রচণ্ড ব্যস্ততায় আকাশ খুব একটা বাড়ি আসতে পারে না, তবে প্রতি মাসে টাকা আর চিঠি পাঠিয়ে বাবার প্রতি কর্তব্যে কোনো কমতি রাখে না সে।

​এক হাড়কাঁপানো শীতের সন্ধ্যা। রহমত আলী বারান্দায় বসে থরথর করে কাঁপছিলেন। হঠাৎ সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। দরজা খুলতেই রহমত আলী অবাক। সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং আকাশ। কোনো খবর না দিয়ে হুট করে ছেলেকে এভাবে দেখে তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন।

​আকাশ পরম মমতায় বাবার হাত ধরে বলল, বাবা, তোমার শরীরটা ভালো নেই শুনে মনটা মানল না। তাই সব কাজ ফেলে দৌড়ে চলে আসলাম। রহমত আলীর চোখে জল চলে এলো। ধরা গলায় বললেন, আরে পাগল আমি তো ঠিকই ছিলাম। এই ঠান্ডায় মিছেমিছি এত কষ্ট করে আসলি।

​পরদিন ভোরে আকাশ দেখল, প্রচণ্ড শীতে কাঁপতে কাঁপতে বাবা রান্নাঘরে কাজ করছেন। আকাশ গিয়ে বাবার হাত থেকে খুন্তিটা কেড়ে নিয়ে বলল, বাবা আমি থাকতে তুমি কেন কষ্ট করছ চলো ভেতরে গিয়ে বিশ্রাম নাও। রহমত আলী হেসে বললেন, শহরে তো তুই অনেক দামী দামী খাবার খাস। কিন্তু আমি জানি, তুই আমার হাতের দেশি মুরগির ঝোলটা খুব পছন্দ করিস। তাই নিজের হাতে তোর জন্য রাঁধতে ইচ্ছে হলো।

​আকাশ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে অনুভব করল, তার দামী ডিগ্রি আর অর্থ দিয়ে কেনা উপহারগুলো বাবার এই সামান্য রান্নার স্নেহের কাছে কত নগণ্য।

রহমত আলীর মতো বাবারা সাধারণত নিজের কষ্ট প্রকাশ করেন না। তাদের একমাত্র তৃপ্তি সন্তানের উপস্থিতিতে এবং তার পছন্দের কাজগুলো করার মাঝে।

হৃদয়ঘেঁষা উপলব্ধি

​আমরা যখন শহরের ইট-পাথরের খাঁচায় নিজেদের সুখ খুঁজে বেড়াই, দিন শেষে আমাদের প্রকৃত শান্তি মেলে সেই পুরনো জীর্ণ পিতৃভূমিতেই। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল আর দূষণে যখন মন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে, তখন অস্থির মনটা একটু প্রশান্তি খোঁজে। শান্তির খোঁজে আমরা দেশ-বিদেশের কত জায়গায় ঘুরে বেড়াই, কিন্তু নিজ ভিটেমাটির গন্ধ আর শেকড় ছোঁয়ার মধ্যে যে তৃপ্তি, তা আর কোথাও নেই।

​বাবা-মায়ের ভালোবাসা এক নিঃস্বার্থ সমুদ্র। তাঁরা হয়তো তাঁদের আকাঙ্ক্ষার কথা মুখে প্রকাশ করেন না, কিন্তু দিন শেষে রহমত আলীর মতোই সন্তানের পথ চেয়ে বসে থাকেন। রহমত আলী কেবল একটি চরিত্র মাত্র আমাদের সবার জীবনেই এমন একজন বাবা আছেন।

​দুর্ভাগ্যবশত, আমরা অনেক সময় থাকতে তাঁদের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারি না। যখন তাঁরা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, তখন ঘরের কোণে বসে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তখন মনে হয়—যদি আর একটিবার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারতাম, বাবা আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি,কিন্তু ততক্ষণে সময় ফুরিয়ে যায়, থেকে যায় শুধু এক বুক হাহাকার আর বৃথা প্রচেষ্টা।

বাবার প্রতি সন্তানের এই চিরন্তন আকুতি আর বিচ্ছেদের বেদনা পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী পাথরগুলোর একটি। যখন মাথার ওপরের ছায়াটা সরে যায়, তখন এই বিশাল পৃথিবীটাও হঠাৎ বড্ড অচেনা আর অনিরাপদ মনে হয়।

নিরাপদ ঘুম: বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর সময় আমরা জানতাম কাল সকালে পৃথিবীটা যেমনই হোক না কেন, এই মানুষটা আমাদের ঠিক আগলে রাখবে। সেই অঘোর ঘুমে কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না, ছিল কেবল অগাধ বিশ্বাস।

অভাবটা স্নেহের: ছেলের বড় ডিগ্রি বা দামী গাড়ি বাবার কাছে কেবল লোকদেখানো গর্বের বস্তু হতে পারে, কিন্তু বাবার তৃপ্তি মেলে যখন ছেলেটি সেই আগের মতো তার পাশে বসে গল্প করে।

বাবার আড়াল করা কষ্ট: বাবারা সন্তানের সাফল্যের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেন, কিন্তু বিনিময়ে তারা কেবল একটু শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা চান। তারা চান তাদের বৃদ্ধ বয়সে সন্তান যেন কেবল দায়িত্ব নয়, বরং পরম মমতায় পাশে দাঁড়ায়।

টাকা নয়, সময় চান: একজন বাবার কাছে সন্তানের পাঠানো হাজার টাকার চেয়েও দামি হলো তার সাথে কাটানো দশটি মিনিট। টাকা দিয়ে হয়তো ওষুধ কেনা যায়, কিন্তু বাবার একাকীত্ব দূর করা যায় না।

টাকা কেবল জীবনের প্রয়োজন মেটায়, কিন্তু বাবার মন ভরায় সন্তানের আন্তরিকতা। আমরা যখন ব্যস্ততার অজুহাতে কেবল টাকা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করি, ঠিক তখনই বাবারা নির্জনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। গল্পের রহমত আলীর চোখে জল টাকার অভাবে আসেনি, এসেছিল ছেলের হাতের ছোঁয়া পেয়ে।

একটি উপলব্ধি:

আমরা বড় হয়ে গেলে লজ্জা বা সংকোচে বাবাকে আর জড়িয়ে ধরতে পারি না। অথচ সেই মানুষটি আজও হয়তো একান্তে মনে করেন—সেই ছোট্ট ছেলেটি যদি আর একটিবার এসে তাঁর বুকে মাথা রাখত।

শূন্য সিংহাসন :

​শহরের কোলাহলে আজ আমি ভীষণ একা,

ভিড়ের মাঝেও তোমার মুখটি পায় না আর দেখা।

বাড়ি ফিরলে হঠাৎ মনে হয়, সেই চেনা ডাক কই?

স্মৃতিরা আজ ভীড় করে সব , নিথর হয়ে রই।

​এখনও ভোরের আলোয় খুঁজি তোমার ছবি,

তোমার হাসির রোদে আমার উঠত ফুটে রবি।

কষ্টের মেঘ জমলে পরে মাথায় রাখতে হাত,

তোমার সাথেই ফুরিয়ে যেত আমার সকল রাত।

​আজও আমি পথ চেয়ে রই গ্রামের মেঠো পথে,

কল্পনাতে হাতটি ধরি তোমার সাথে সাথে।

ভালোবাসি হলো না বলা , সময় গেল ফুরিয়ে,

দূর আকাশে আছো তুমি , মেঘের ডানায় উড়িয়ে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়