বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৫

ভ্যানবাজারই তো চাঁদপুর শহরে যানজটের বড়ো কারণ

অনলাইন ডেস্ক
ভ্যানবাজারই তো চাঁদপুর শহরে যানজটের বড়ো কারণ

চাঁদপুর শহরের প্রধান সড়ক মিজান চৌধুরী সড়ক (সাবেক কুমিল্লা রোড), জেএম সেনগুপ্ত রোড, পালবাজার ব্রিজের গোড়া, রেলওয়ে হকার্স মার্কেট এলাকা এবং সরকারি কলেজের সামনের সড়কে ভ্যানগাড়িতে করে কঁাচামাল ও শাকসবজি বিক্রির প্রবণতা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এসব এলাকায় গড়ে ওঠা অস্থায়ী ভ্যানবাজারে পালবাজার ও বিপণীবাগ বাজারের তুলনায় বেশি দামে পণ্য বিক্রি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারির অভাবে সাধারণ মানুষ হঁাটার পথে বাধ্য হয়ে এসব ভ্যান থেকেই পণ্য কিনছেন। বিশেষ করে নারী ক্রেতারাই তাদের টার্গেটে। এতে একদিকে ভোক্তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে প্রতিদিন ভ্যানবাজারে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব রাস্তার দু পাশে সারি সারি ভ্যানগাড়ি দঁাড়িয়ে থাকে নানা রকমের পণ্য নিয়ে। রেলওয়ে হকার্স মার্কেটের সামনে এবং সরকারি কলেজের সামনে, মিজান চৌধুরী সড়কসহ শহরের প্রধান প্রধান সড়কে ভ্যানবাজারের বিক্রেতারা সড়কের একাংশ দখল করে সবজি, মাছ, ফলমুলসহ যাবতীয় কঁাচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য বিক্রি করছেন। অনেক সময় ভ্যানের সঙ্গে ক্রেতাদের ভিড় জমে পুরো সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভ্যানবাজারের কারণে গাড়ি চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। দুপুর ও সন্ধ্যার দিকে যানজট এতোটাই তীব্র হয় যে, সংক্ষিপ্ত সড়কে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। ভ্যানগাড়ির বিক্রেতারা সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান নিয়ে পাল বাজার ও বিপণীবাগ বাজারের তুলনায় অনেক বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে দেখা গেছে, পাল বাজারে প্রতি কেজি আলু যেখানে ২৫ টাকা, সেখানে ভ্যানে বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। একইভাবে পিঁয়াজ, কঁাচা মরিচ, বেগুন ও শাকসবজির দামও বাজারের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি নেওয়া হচ্ছে। একজন ক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাজারে গেলে দাম কম পাওয়া যায়, কিন্তু হঁাটার পথে অনেক সময় ভ্যান থেকেই কিনতে হয়। তারা সুযোগ বুঝে বেশি দাম রাখে। ভোক্তারা বলছেন, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভ্যানগাড়ির বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দাম হঁাকাচ্ছেন। নির্দিষ্ট কোনো মূল্য তালিকা বা কোনো নিয়ম না থাকায় ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি করেও সঠিক দাম নিশ্চিত করা যায় না। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একজন কলেজ শিক্ষার্থী জানান, ক্লাসশেষে বাজারে যাওয়ার সময় পাই না। বাধ্য হয়ে কলেজের সামনের ভ্যান থেকে সবজি কিনি। কিন্তু দাম এতো বেশি যে, মাস শেষে বাজেট মিলাতে কষ্ট হয়।

চঁাদপুর শহরের মিজান চৌধুরী সড়ক (সাবেক কুমিল্লা রোড) ও কালীবাড়ি মোড় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ট্রাক, সিএনজি ও অটোরিকশা চলাচল করে। কিন্তু ভ্যানবাজারের কারণে সড়কের একাংশ দখল হওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা চেষ্টা করলেও ভ্যান সরাতে না পারায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।একজন ট্রাফিক পুলিশের ভাষ্য, আমরা প্রতিদিনই ভ্যান সরানোর চেষ্টা করি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার তারা ফিরে আসে। স্থায়ী সমাধান না হলে যানজট কমানো সম্ভব নয়। পালবাজার ও বিপণীবাগ বাজারে নির্দিষ্ট জায়গা, ইজারা ও নিয়ম-কানুন থাকলেও ভ্যানবাজারের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে একদিকে বৈধ বাজারের ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে শহরের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, আমরা নিয়ম মেনে খাজনা দিই, অথচ ভ্যানওয়ালারা রাস্তা দখল করে ব্যবসা করছে। এতে আমাদের বিক্রি কমে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী নয়। ক’দিন পর আবার ভ্যানবাজার ফিরে আসে আগের অবস্থায়। এতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। চঁাদপুর পৌরসভার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভ্যান গাড়ির বিক্রেতাদের পুনর্বাসনের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় সমস্যা সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ভ্যানবাজারের বিক্রেতাদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ নয়, বরং নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসনই হতে পারে কার্যকর সমাধান। পাশাপাশি নিয়মিত বাজার তদারকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো যানজটমুক্ত রাখতে হলে ভ্যানবাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় জনভোগান্তি আরও বাড়বে।

চঁাদপুর শহরের মিজান চৌধুরী সড়ক, রেলওয়ে হকার্স মার্কেট ও সরকারি কলেজ এলাকার ভ্যানগাড়ির সবজি বাজার এখন যানজটের বড়ো কারণ ও জনদুর্ভোগের উল্লেখযোগ্য কারণ হয়ে দঁাড়িয়েছে। চড়া মূল্য ও তীব্র যানজট-এই দু সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। কথা হলো, এ দাবি পূরণে সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ, সচেতন নাগরিকবৃন্দ, সর্বদলীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ একত্রে বৈঠকে বসে ঐকমত্যে পেঁৗছে ভ্যানবাজার বন্ধে সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে। এ বৈঠক আয়োজনে পৌরসভাকেই নিতে হবে উদ্যোগ। ভ্যানবাজার উচ্ছেদে মানবিকতার প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে, কিন্তু মানবিকতার চেয়ে যানজটে নিত্য দুর্ভোগে ভোগার কষ্টটুকু যে কতোটা অমানবিক, সেটাও বিবেচনায় রাখা দরকার।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়