প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৫
যখন স্বপ্নের চেয়ে সংগ্রাম বড় হয়ে যায়
তখন জীবনের পথ কঠিন হলেও, স্বপ্নের আলো নিভে যায় না

স্বপ্ন মানুষের জীবনের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি। মানুষ প্রথমে স্বপ্ন দেখে নিজের ভেতরে, তারপর সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে তার চিন্তা, কর্ম এবং জীবনযাত্রাকে পরিচালিত করতে শুরু করে। কেউ নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, কেউ পরিবারের, কেউ সমাজের, আবার কেউ একটি পুরো জাতির ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।
কিন্তু জীবনের এক পর্যায়ে এসে মানুষ উপলব্ধি করে, স্বপ্ন দেখা সহজ হলেও সেই স্বপ্নের দায়িত্ব নেওয়া কঠিন। কারণ বড় স্বপ্ন শুধু আনন্দ নিয়ে আসে না, সঙ্গে নিয়ে আসে পরীক্ষা, ত্যাগ, অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং কখনো কখনো এমন এক নিঃসঙ্গ পথ, যেখানে নিজের বিশ্বাসই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আমার জীবনেও এমন একটি সময় এসেছিল, যখন আমি শুধু নিজের জন্য ভাবিনি। আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম একটি সুন্দর বাংলাদেশের।
এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে দুর্নীতি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, যেখানে লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহার সাধারণ মানুষের অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। এমন একটি দেশ, যেখানে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও অমানবিকতার পরিবর্তে মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক সম্মান হবে সমাজের ভিত্তি।
আমি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যে বাংলাদেশকে আমরা ছোটবেলায় কবিতায় পড়েছি, গানে অনুভব করেছি, হৃদয়ে ধারণ করেছি। সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা সেই দেশ, যেখানে মাঠে ধান দোলে, প্রকৃতি ফুলে-ফলে ভরে ওঠে, আর প্রতিটি পরিবার ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে জীবন কাটাতে পারে।
আমার কাছে একটি দেশের উন্নতি শুধু রাস্তা, সেতু বা বড় বড় স্থাপনার সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করার বিষয় নয়। একটি দেশের প্রকৃত উন্নতি তখনই হয়, যখন তার মানুষ সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে, যখন একটি শিশু নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারে, যখন একজন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে রাষ্ট্র তার অধিকার রক্ষার জন্য পাশে আছে। এই স্বপ্ন হয়তো অনেক বড় ছিল। কিন্তু বড় স্বপ্ন ছাড়া বড় পরিবর্তনের পথও তৈরি হয় না। আমি বিশ্বাস করতাম, পরিবর্তন সবসময় দূরে কোথাও শুরু হয় না। পরিবর্তন শুরু হয় একজন মানুষের চিন্তা থেকে, একটি পরিবারের মূল্যবোধ থেকে, একটি সমাজের আচরণ থেকে। একটি ভালো রাষ্ট্র গড়ার আগে ভালো মানুষ এবং ভালো সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হয়।
এই বিশ্বাস থেকেই আমি নিজের অবস্থান থেকে কিছু করার চেষ্টা করেছি। হয়তো আমার হাতে কোনো বড় ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু ছিল একটি বিশ্বাস, ছিল কথা বলার সাহস, ছিল লেখার শক্তি এবং ছিল একটি স্বপ্ন। তখন বুঝিনি, একটি বড় স্বপ্নের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলো অনেক সময় বাইরের পৃথিবী থেকে আসে না। কখনো কখনো সেই পরীক্ষা আসে সবচেয়ে কাছের মানুষদের মধ্য দিয়েই। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়, যেখানে স্বপ্ন শুধু একটি আদর্শের বিষয় ছিল না, হয়ে উঠেছিল ব্যক্তিগত সংগ্রামেরও একটি নাম।
জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেয়। কিছু আঘাত শরীরে লাগে না, লাগে বিশ্বাসে। আর সেই আঘাত সবচেয়ে গভীর হয় তখনই, যখন তা আসে এমন জায়গা থেকে, যেখান থেকে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা, বোঝাপড়া ও সহযোগিতা আশা করে। আমি ভেবেছিলাম, একটি সুন্দর সমাজ ও একটি উন্নত দেশের স্বপ্নের যাত্রা শুরু হবে নিজের ঘর থেকেই। কারণ পরিবারই মানুষের প্রথম শিক্ষা, প্রথম মূল্যবোধ এবং প্রথম আশ্রয়। আমি বিশ্বাস করতাম, একটি পরিবার যদি পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং বৃহত্তর চিন্তার ওপর দাঁড়াতে পারে, তাহলে সেই পরিবার থেকেই একটি ভালো সমাজের বীজ জন্ম নিতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম। যে স্বপ্নকে আমি সবার স্বপ্ন হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম, সেটি ধীরে ধীরে ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে লাগল। মানুষের চিন্তা, অগ্রাধিকার ও জীবনদর্শন এক নয়। প্রত্যেক মানুষ তার নিজের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের হিসাব অনুযায়ী পথ বেছে নেয়, এটিও জীবনের একটি স্বাভাবিক সত্য। তবুও একজন মানুষ যখন কোনো আদর্শকে গভীরভাবে ধারণ করে, তখন কাছের মানুষদের সঙ্গে সেই চিন্তার দূরত্ব তৈরি হওয়া সহজে মেনে নেওয়া কঠিন হয়।
কারণ অপরিচিত মানুষের ভিন্নমতকে গ্রহণ করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু আপনজনের সঙ্গে স্বপ্ন ও মূল্যবোধের দূরত্ব তৈরি হলে সেই কষ্ট অনেক বেশি নীরব এবং গভীর হয়। সেই সময় আমি নিজেকে অনেক প্রশ্ন করেছি--
আমি কি খুব বেশি আশা করেছিলাম?
আমি কি মানুষের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতাকে বুঝতে পারিনি? নাকি বড় কোনো স্বপ্নের পথে হাঁটলে এমন পরীক্ষার মধ্য দিয়েই যেতে হয়?
সময়ের সঙ্গে আমি একটি উপলব্ধিতে পৌঁছেছি। মানুষকে জোর করে একই স্বপ্ন দেখানো যায় না। মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়া যায় না। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব উপলব্ধি, নিজস্ব পথ এবং নিজস্ব সময় আছে। কিন্তু নিজের বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। আমি শিখেছি, ভালো কিছু করার ইচ্ছা থাকলেই সবাই একইভাবে পাশে থাকবে, এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। কখনো কখনো একজন মানুষকে নিজের বিশ্বাসের পথেই একা হাঁটতে হয়। তবে একা হাঁটা মানে পরাজিত হওয়া নয়। বরং অনেক সময় সেই নীরব পথচলাই মানুষকে নিজের ভেতরের শক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি গভীর শিক্ষা দিয়েছে। একটি দেশ বদলানোর আগে মানুষকে নিজের ভেতরের যুদ্ধ জয় করতে হয়। নিজের কষ্ট, হতাশা, অভিমান এবং একাকীত্বকে অতিক্রম করতে হয়। কারণ যে মানুষ নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে সামলাতে পারে না, সে বাইরের পৃথিবীতে স্থিরভাবে আলো ছড়ানোর শক্তিও হারিয়ে ফেলে।
আজও আমি সেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি।
কারণ আমার স্বপ্ন কোনো ব্যক্তি, কোনো পরিস্থিতি বা কোনো সাময়িক হতাশার ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হয়েছে একটি বিশ্বাস থেকে, মানুষ চাইলে ভালো কিছু সৃষ্টি করতে পারে। এই বিশ্বাসই আমাকে সামনে এগিয়ে চলার শক্তি দিয়েছে। আর ঠিক তখনই জীবন আমাকে আরেকটি বড় শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করছিল। সেই শিক্ষা এসেছিল আমার সন্তানের জীবনের মধ্য দিয়ে।
একটি নতুন স্বপ্ন, একটি নতুন সংগ্রাম এবং একজন অভিভাবকের নীরব সহযাত্রার গল্প।
জীবন কখনো কখনো এমন কিছু শিক্ষা দেয়, যা কোনো বই পড়ে শেখা যায় না। আমার জন্য তেমনই একটি গভীর শিক্ষা এসেছে আমার সন্তানের স্বপ্নের পথ ধরে। একজন ক্রীড়াবিদের জীবন বাইরে থেকে যতটা উজ্জ্বল মনে হয়, তার ভেতরের পথ ততটাই কঠিন। মানুষ সাধারণত দেখে সাফল্যের মুহূর্ত, দেখে বিজয়ের ছবি, দেখে করতালি ও আলো। কিন্তু সেই আলোর পেছনে লুকিয়ে থাকে বছরের পর বছর কঠোর অনুশীলন, আত্মনিয়োগ, অনিশ্চয়তা এবং অসংখ্য অদৃশ্য লড়াই।
আমার ছেলে স্বপ্ন দেখেছিল টেনিসের জগতে নিজের একটি পরিচয় তৈরি করার। এই স্বপ্ন তার নিজের। এই পথচলার মূল যোদ্ধাও সে নিজেই। টেনিস তার কাছে শুধু একটি খেলা ছিল না, এটি ছিল তার ভালোবাসা, তার পরিশ্রম এবং নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর এক নিরন্তর চেষ্টা। কিন্তু কোনো বড় স্বপ্নের পথই সহজ হয় না। একজন ক্রীড়াবিদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার শরীর। অথচ সেই শরীরই যখন বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন শুরু হয় প্রকৃত পরীক্ষা। ইনজুরি এসেছে, এসেছে একাধিকবার। অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। দীর্ঘ পুনর্বাসনের কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। কখনো কখনো আবার শুরু করতে হয়েছে প্রায় শূন্য থেকে। যে খেলোয়াড় প্রতিদিন নিজের সীমাকে অতিক্রম করার জন্য প্রস্তুত হয়, তার জন্য দীর্ঘ সময় কোর্টের বাইরে থাকা কতটা কঠিন, তা কেবল একজন ক্রীড়াবিদই গভীরভাবে অনুভব করতে পারে। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি আসে মানসিক প্রশ্ন। আবার কি আগের অবস্থায় ফেরা সম্ভব? স্বপ্ন কি এখনো জীবিত আছে?
--এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়েও সে থেমে যায়নি। প্রতিটি বাধার পর তাকে নতুন করে শুরু করতে হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই সে ফিরে আসার চেষ্টা করেছে। কারণ তার ভেতরে এখনো সেই স্বপ্ন বেঁচে আছে। আর একজন বাবা হিসেবে আমি ছিলাম সেই যাত্রার পাশে। এই স্বপ্ন আমার নয়, কিন্তু সন্তানের স্বপ্ন যখন সত্যিকারের হয়, তখন একজন অভিভাবকের হৃদয়ও সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। সন্তানের আনন্দে আনন্দিত হওয়া, তার কষ্টে কষ্ট পাওয়া, অনিশ্চয়তার সময় সাহস জোগানো, এটাই একজন বাবা-মায়ের স্বাভাবিক ভালোবাসা। আমি চেষ্টা করেছি আমার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে তার পাশে থাকতে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা, উৎসাহ, বিশ্বাস এবং মানসিক শক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কখনো পথ দেখানোর চেষ্টা করেছি, কখনো শুধু নীরবে পাশে থেকেছি। কিন্তু একটি বিষয় সবসময় মনে রেখেছি। পথটি তার। পরিশ্রমটি তার। লড়াইটিও তার। আমি শুধু সেই দীর্ঘ যাত্রার একজন সহযাত্রী।
জীবনের একটি কঠিন সত্য হলো, ভালোবাসা, ত্যাগ এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা সব সময় সঙ্গে সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দেয় না। আজও সেই বড় সাফল্যের অপেক্ষা শেষ হয়নি। আজও সেই মুহূর্ত আসেনি, যখন দীর্ঘ কষ্টের পর সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যাবে। তবুও এই যাত্রা আমাকে একটি গভীর শিক্ষা দিয়েছে। সাফল্য শুধু শেষ ফলাফলের নাম নয়। সাফল্য হলো প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা।
যে তরুণ বারবার আঘাত পেয়েও আবার কোর্টে ফিরে আসে, সে শুধু একটি খেলার জন্য লড়াই করে না; সে নিজের মানসিক শক্তির পরিচয় দেয়। একজন বাবা হিসেবে আমি আজ বুঝি, সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার সব সময় একটি বিজয় নয়। সবচেয়ে বড় উপহার হলো তাকে বিশ্বাস করা, তাকে সাহস দেওয়া এবং তাকে শেখানো যে জীবনের পথে বাধা আসবেই, কিন্তু বাধার কাছে আত্মসমর্পণ করা যাবে না।
ব্যর্থতা একটি ঘটনা। কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়া একটি সিদ্ধান্ত। আর যতদিন মানুষ হাল ছেড়ে দেয়নি, ততদিন তার গল্প শেষ হয়নি। আমার ছেলের গল্পও শেষ হয়নি। তার টেনিস র্যাকেট এখনো কথা বলে। তার স্বপ্ন এখনো জীবিত। আর সেই স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শিখেছি, কখনো কখনো একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো সামনে দাঁড়িয়ে পথ তৈরি করা নয়, বরং সন্তানের নিজের পথ চলার শক্তি হয়ে পাশে থাকা।
জীবনের দিকে ফিরে তাকালে আমি দুটি ভিন্ন ধরনের স্বপ্ন দেখতে পাই। একটি ছিল একটি দেশের স্বপ্ন, আরেকটি ছিল একটি তরুণের নিজের পরিচয় গড়ে তোলার স্বপ্ন। একটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং একটি সুন্দর সমাজের আকাঙ্ক্ষা। অন্যটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একজন ক্রীড়াবিদের ব্যক্তিগত লক্ষ্য, আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছানোর লড়াই।
দেখতে গেলে এই দুটি পথ সম্পূর্ণ আলাদা। একটি বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের স্বপ্ন, অন্যটি একজন মানুষের নিজের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, তাদের ভেতরের সত্যটি একই। দুটো স্বপ্নের পথেই এসেছে পরীক্ষা। দুটো পথেই এসেছে অনিশ্চয়তা। দুটো পথেই প্রয়োজন হয়েছে ধৈর্য, বিশ্বাস এবং দীর্ঘ অপেক্ষার। তখন আমি নিজেকে একটি প্রশ্ন করেছি--স্বপ্নের চেয়ে কি সত্যিই সংগ্রাম বড় হয়ে যায়? আজ আমার উত্তর হলো, না।
সংগ্রাম কখনো স্বপ্নের চেয়ে বড় নয়। আমাদের কাছে সংগ্রাম বড় মনে হয়, কারণ সংগ্রাম বর্তমানের কষ্ট নিয়ে আসে, আর স্বপ্ন থাকে ভবিষ্যতের আশায়। আমরা আজকের ব্যথা অনুভব করি, কিন্তু আগামী দিনের সম্ভাবনা সব সময় স্পষ্ট দেখতে পাই না। একটি বীজের কথা ভাবুন। মাটির নিচে তাকে অন্ধকারের মধ্যে থাকতে হয়। তাকে চাপ সহ্য করতে হয়। তার চারপাশে থাকে মাটি, কিন্তু সেই চাপই একদিন তাকে অঙ্কুরিত হওয়ার শক্তি দেয়।
মানুষের জীবনও অনেকটা তেমন।
প্রতিকূলতা সব সময় মানুষকে ভেঙে দিতে আসে না। অনেক সময় প্রতিকূলতাই মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা শক্তিকে প্রকাশ করার সুযোগ তৈরি করে।
আমার জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, বড় স্বপ্ন দেখার সবচেয়ে বড় মূল্য হলো ধৈর্য। কারণ স্বপ্ন যদি সত্যিই মূল্যবান হয়, তাহলে তার পথও সব সময় সহজ হবে না। যে মানুষ একটি উন্নত সমাজের স্বপ্ন দেখে, তাকে হতাশার মধ্যেও নিজের বিশ্বাস ধরে রাখতে হয়। যে তরুণ নিজের প্রতিভার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে চায়, তাকে আঘাতের পরও আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। যে অভিভাবক সন্তানের স্বপ্নের পাশে দাঁড়ায়, তাকে ফলাফলের নিশ্চয়তা ছাড়াই ভালোবাসা ও সমর্থন দিয়ে যেতে হয়। এখানেই জীবনের একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে।
আমরা প্রায়ই সাফল্যকে শুধু ফলাফল দিয়ে বিচার করি। কে কতদূর পৌঁছাল? কে কত পুরস্কার পেল? কে কত পরিচিত হলো? কিন্তু জীবন শুধু শেষ ফলাফলের হিসাব রাখে না। জীবন মনে রাখে মানুষ কতটা সততার সঙ্গে পথ চলেছে, কতবার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়িয়েছে, কত কঠিন সময়েও নিজের মূল্যবোধ ধরে রেখেছে।
আজ আমি মনে করি, কোনো স্বপ্নের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু তার পূর্ণতা নয়। সেই স্বপ্নের পথে চলতে চলতে একজন মানুষ কী হয়ে উঠল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি একটি স্বপ্ন একজন মানুষকে আরও মানবিক করে, আরও দায়িত্বশীল করে, আরও সাহসী করে, তাহলে সেই স্বপ্ন কখনো ব্যর্থ হয় না। হয়তো সব যুদ্ধের ফল আমরা নিজের চোখে দেখতে পাই না। হয়তো কিছু স্বপ্নের পূর্ণতা আমাদের জীবনের সময়সীমার বাইরেও চলে যায়। কিন্তু একটি সত্য থেকে যায়। যে মানুষ ভালো কিছুর জন্য চেষ্টা করে, সে শুধু নিজের জন্য একটি পথ তৈরি করে না, সে অন্যদের জন্যও একটি উদাহরণ রেখে যায়।
আর সম্ভবত এটাই সংগ্রামের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
সংগ্রাম শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম নয়। সংগ্রাম মানুষকে এমন একজন মানুষে পরিণত করে, যে একদিন অন্যের পথেও আলো জ্বালাতে পারে। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি, জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলো কোনো সহজ সময় আমাকে দেয়নি। শিক্ষা এসেছে কঠিন সময় থেকে।
যে সময়ে মনে হয়েছে পথ অনেক দীর্ঘ, সেই সময়ই ধৈর্যের মূল্য শিখিয়েছে। যে সময়ে মনে হয়েছে পাশে মানুষ কমে যাচ্ছে, সেই সময়ই নিজের বিশ্বাসের শক্তি চিনতে শিখিয়েছে। যে সময়ে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসেনি, সেই সময়ই বুঝিয়েছে, মানুষের মূল্য শুধু তার অর্জনে নয়, তার যাত্রার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।
তাই আজ নবপ্রজন্মের কাছে আমার কোনো সহজ প্রতিশ্রুতি নেই। আমি বলব না, স্বপ্ন দেখলেই সব স্বপ্ন পূরণ হবে। আমি বলব না, কঠোর পরিশ্রম করলেই জীবনের সব দরজা খুলে যাবে। কারণ জীবন এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। কিন্তু আমি এটুকু বলতে পারি, সত্যিকারের স্বপ্ন মানুষকে কখনো শূন্য হাতে ফেরায় না। হয়তো সে সব সময় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেয় না, কিন্তু সে মানুষকে এমন কিছু দেয়, যা কোনো পুরস্কার দিয়ে মাপা যায় না। সে মানুষকে শক্ত করে, ধৈর্য শেখায় এবং নিজের সীমার বাইরে যেতে শেখায়।
আজকের পৃথিবীতে আমরা অনেক সময় শুধু বিজয়ীদের গল্প শুনি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রতিটি বিজয়ের পেছনে থাকে অসংখ্য অদৃশ্য পরাজয়, অসংখ্য ব্যর্থ চেষ্টা এবং অসংখ্যবার আবার শুরু করার সাহস। তাই তরুণদের বলব, ব্যর্থতাকে ভয় পেয়ো না।
ব্যর্থতা তোমার পরিচয় নয়। তুমি কতবার পড়ে গেছো, সেটি তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয় নয়। তুমি কতবার উঠে দাঁড়িয়েছো, সেটিই তোমার আসল পরিচয়।
নিজের স্বপ্নকে ভালোবাসো, কিন্তু শুধু ফলাফলের সঙ্গে নিজের মূল্যকে বেঁধে রেখো না। কারণ কখনো কখনো পথ চলার মধ্যেই এমন শিক্ষা লুকিয়ে থাকে, যা গন্তব্যে পৌঁছেও পাওয়া যায় না।
একটি ভালো বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন হোক, অথবা নিজের জীবনে বড় কিছু অর্জনের স্বপ্ন হোক, সব বড় স্বপ্নের জন্য প্রয়োজন একই শক্তি: সততা, অধ্যবসায়, ধৈর্য এবং কঠিন সময়েও নিজের মানবিকতা ধরে রাখার ক্ষমতা। আমি আজও বিশ্বাস করি, একটি সুন্দর সমাজ তৈরি হয় শুধু বড় বড় পরিকল্পনা দিয়ে নয়; তৈরি হয় অসংখ্য মানুষের ছোট ছোট ভালো কাজের মাধ্যমে। একজন তরুণ যখন সততার সঙ্গে নিজের কাজ করে, তখন সে দেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করে।
একজন অভিভাবক যখন সন্তানের স্বপ্নকে সম্মান করেন, তখন তিনি শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করেন। একজন নাগরিক যখন অন্যায়ের কাছে নীরব না থেকে সত্যের পক্ষে দাঁড়ান, তখন তিনি সমাজের বিবেককে জাগিয়ে রাখেন।
আমার জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে একটি কথাই শিখিয়েছে--স্বপ্নের পথ কখনো সম্পূর্ণ মসৃণ হবে না। কখনো কখনো এমন দিন আসবে, যখন মনে হবে সব চেষ্টা বৃথা যাচ্ছে। সেই মুহূর্তেই নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে, বড় গাছও একদিন ছোট একটি বীজ ছিল। কিন্তু সে মাটির অন্ধকারকে ভয় পায়নি। তাই যদি কোনো দিন মনে হয়, তোমার স্বপ্নের চেয়ে সংগ্রাম বড় হয়ে গেছে, তাহলে থেমে যেয়ো না। নিজেকে প্রশ্ন করো--আমি কি শুধু জয়ের জন্য পথ চলছি?
নাকি একজন ভালো মানুষ হওয়ার জন্য?
যদি উত্তর হয়, আমি সত্য, সৌন্দর্য ও মানুষের কল্যাণের জন্য এগিয়ে চলছি, তাহলে মনে রেখো, তোমার পথ এখনো মূল্যবান। কারণ সব স্বপ্নের শেষ অধ্যায় আমরা নিজের চোখে দেখতে পাই না। কিন্তু প্রতিটি সৎ চেষ্টা পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একটি আলো জ্বালিয়ে যায়।
আজ আমার সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হলো--
স্বপ্ন মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে শেখায়, আর সংগ্রাম মানুষকে সেই পথের যোগ্য করে তোলে। স্বপ্ন পূরণ হলে মানুষ সফল হয়। কিন্তু সংগ্রামের মধ্যেও যদি সে নিজের সততা, সাহস এবং মানবিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে সে অন্যের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
আর হয়তো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বিজয় এটাই। নিজের আলো জ্বালিয়ে এমন একটি পথ তৈরি করা, যেখান দিয়ে অন্যরাও এগিয়ে যেতে পারে।
রহমান মৃধা : গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন







