সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০৯:৩০

আন্তঃনগর মেঘনায় চরম ভোগান্তি : ইঞ্জিন বিকল, বিলম্ব ও নিরাপত্তাহীনতায় অতিষ্ঠ চাঁদপুরের যাত্রীরা

উজ্জ্বল হোসাইন
যেটুকু আছে, সেটুকু যেনো অন্তত ঠিকভাবে চলে

চাঁদপুরবাসীর রেলপথে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান ভরসা আন্তঃনগর মেঘনা এক্সপ্রেস এখন যেনো ভোগান্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। রেলপথে চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর রুটে চলাচলকারী এই আন্তঃনগর ট্রেনটি নিয়মিত সময়সূচি মেনে চলতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইঞ্জিন বিকল, দীর্ঘ বিলম্ব, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী, ট্রেনটি প্রতিদিন ভোর ৫টায় চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। স্বাভাবিকভাবে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার এই যাত্রা সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও নানা সমস্যার কারণে তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টায়। এতে করে যাত্রীরা যেমন শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে, তেমনি সময়সূচিভিত্তিক অন্যান্য যাতায়াত ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হচ্ছে।

গত ২০ জুন ট্রেনটিতে ভ্রমণ করা এক ব্যাংক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চাঁদপুর থেকে আসার সময় ট্রেনটি নির্ধারিত সময়েই চট্টগ্রাম পৌঁছেছিলো। কিন্তু ফেরার পথে মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে, যার কারণে প্রায় ৯ ঘণ্টা লেগেছে গন্তব্যে পৌঁছাতে। এতো দীর্ঘ সময় ট্রেনের ভেতরে বসে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর ও দুর্ভোগপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, এই ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষ প্রতিদিন চলাচল করে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এই সেবা দিন দিন নিম্নমুখী হচ্ছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্যে চাঁদপুর-৩ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

শুধু বিলম্ব বা যান্ত্রিক ত্রুটিই নয়, নিরাপত্তাহীনতাও এখন বড়ো উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাধিক যাত্রী অভিযোগ করেছেন, ট্রেনে প্রায়ই চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এছাড়া চলন্ত ট্রেনে বাইরে থেকে ইট পাথর নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে, যা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

এক যাত্রী আক্ষেপ করে বলেন, ট্রেনে উঠলেই এখন ভয় কাজ করে। কখন কে মোবাইল বা ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়, কিংবা জানালায় ইট এসে লাগে—এই আতঙ্কে থাকতে হয়। কিছুদিন আগে ইটের আঘাতে এক যাত্রীর মৃত্যুর ঘটনাও শুনেছি। আমরা নিরাপদ যাত্রা চাই। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা, যারা ট্রেনে করে চাঁদপুর এসে লঞ্চযোগে বরিশাল-ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে যাতায়াত করেন। ট্রেন দেরিতে পৌঁছানোর কারণে তারা লঞ্চ মিস করছেন, ফলে তাদেরকে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। 

চাঁদপুরের সচেতন মহল বলছে, মেঘনা এক্সপ্রেস শুধুমাত্র একটি ট্রেন নয়—এটি এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এই সেবা দিন দিন অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ট্রেনটির ইঞ্জিন ও কোচের মানোন্নয়ন করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি চাঁদপুর থেকে সরাসরি কক্সবাজারগামী নতুন ট্রেন চালুর দাবিও জোরালো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে এবং দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে আধুনিক ট্রেন সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চাঁদপুর থেকে সরাসরি কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চালু হলে তা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা কামনা করছেন যাত্রীরা। তারা বলছেন, একটি জেলার মানুষের একমাত্র ট্রেন-সেবাকে অবহেলা করা মানে পুরো অঞ্চলের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা।

এদিকে রেলওয়ের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে যাত্রীদের প্রত্যাশা—দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান করা হবে এবং মেঘনা এক্সপ্রেসকে একটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও সময়ানুবর্তী সেবায় পরিণত করা হবে। চাঁদপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি—যেটুকু আছে, সেটুকু যেনো অন্তত ঠিকভাবে চলে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই দাবি কতোটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং বাস্তবায়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়