সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ১৩:৪০

ব্যতিক্রমী তদারকি, সুরক্ষিত অধিকার: চাঁদপুরে রাজনীতির চেনা বৃত্ত ভাঙার গল্প

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
ব্যতিক্রমী তদারকি, সুরক্ষিত অধিকার: চাঁদপুরে রাজনীতির চেনা বৃত্ত ভাঙার গল্প
ক্যাপশন : একটি ফোনকল, অসংখ্য বার্তা—প্রান্তিক মানুষের প্রাপ্য সুরক্ষায় সরাসরি তদারকিতে শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি দীর্ঘস্থায়ী বেদনা হলো—নির্বাচনের আগে জনগণ ক্ষমতার উৎস, আর নির্বাচনের পরে তারা অনেক সময় ক্ষমতার প্রান্তিক দর্শকে পরিণত হয়। ভোটের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যকার এই দূরত্বই আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্যতম বড় সংকট। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু ঘটনা সেই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে, রাজনীতির গতানুগতিক বৃত্তকে ভেঙে নতুন এক সম্ভাবনার জানালা খুলে দেয়। চাঁদপুর-৩ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক সম্প্রতি ঠিক তেমনই এক নজির স্থাপন করেছেন, যা কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; বরং জবাবদিহিমূলক রাজনীতির এক বিরল ও অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত।

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত আর্থিক অনুদান বিতরণের বিষয়টি তিনি যে পদ্ধতিতে সরাসরি তদারকি করেছেন, তা আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায় ব্যতিক্রমী। সাধারণত অনুদান বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছানোর আগেই নানা স্তরে অভিযোগ, অনিয়ম এবং মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের দৌরাত্ম্যের খবর শোনা যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাপকের অধিকার হয়ে ওঠে দালালচক্রের উপার্জনের ক্ষেত্র। এই বাস্তবতায় একজন সংসদ সদস্য যখন নিজেই সুবিধাভোগীদের কাছে ফোন করে খোঁজ নেন, তখন বিষয়টি নিছক আনুষ্ঠানিকতা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে জনগণের অধিকারের ওপর সরাসরি রাজনৈতিক পাহারাদারি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ফোনালাপের ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সুবিধাভোগীদের কাছে জানতে চাইছেন—তারা সরকারি অনুদানের অর্থ সঠিকভাবে পেয়েছেন কি না। কিন্তু এই আলাপচারিতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল একটি প্রশ্ন, যা প্রকৃতপক্ষে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য সতর্কসংকেত হিসেবে কাজ করে—“টাকা তুলতে গিয়ে কাউকে কোনো বকশিস, কমিশন কিংবা অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে কি?” এই প্রশ্নটি কেবল একটি অনুসন্ধান নয়; এটি দুর্নীতির অন্ধকার করিডোরে নিক্ষিপ্ত এক তীব্র আলোকরশ্মি। কারণ বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রশাসনিক বাস্তবতায় ‘কমিশন সংস্কৃতি’ বহুদিন ধরে এক নীরব সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অনেক দরিদ্র মানুষ নিজেদের প্রাপ্য পাওয়ার জন্যও অবৈধ অর্থ প্রদানকে যেন নিয়তির অংশ বলে মেনে নিয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে যখন সুবিধাভোগীরা জানান যে তাদের একটি টাকাও কাউকে দিতে হয়নি, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত স্বস্তির বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

চাঁদপুরের ভৌগোলিক বাস্তবতা এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। নদীভাঙন, চরাঞ্চলের uncertainty, মৌসুমি দুর্যোগ এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের জন্য ঈদের মতো উৎসবে সামান্য আর্থিক সহায়তাও অনেক বড় স্বস্তি বয়ে আনে। এই সহায়তা যেন বিনা বাধায় প্রকৃত প্রাপকের হাতে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি মানবিক ও নৈতিক কর্তব্যও বটে। শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক সেই দায়িত্ব পালনে যে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই উদ্যোগ রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। সাধারণ মানুষ যখন অনুভব করে যে তাদের প্রাপ্ত অনুদানের হিসাবও সরাসরি একজন জনপ্রতিনিধির নজরদারির আওতায় রয়েছে, তখন রাষ্ট্র তাদের কাছে দূরবর্তী কোনো শক্তি নয়; বরং দায়িত্বশীল অভিভাবকে পরিণত হয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত शक्ति এখানেই—ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক মানুষের দরজায় জবাবদিহিতার উপস্থিতি নিশ্চিত করা।

ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে নানা স্বপ্ন ও স্লোগান শুনে আসছি। কিন্তু প্রযুক্তির প্রকৃত সার্থকতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা সুশাসনের কার্যকর হাতিয়ারে রূপ নেয়। একজন সংসদ সদস্য যখন নিজের উদ্যোগে মোবাইল ফোনকে জবাবদিহিতার মাধ্যম বানান, তখন পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে যায়—জনগণের প্রাপ্য নিয়ে কারসাজি করার সুযোগ আর আগের মতো অবাধ নয়। এই বার্তা যত শক্তিশালী হবে, ততই দুর্নীতির পরিসর সংকুচিত হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো জনসম্পৃক্ততা, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি। নির্বাচনের সময় জনগণের কাছে যাওয়া সহজ; কিন্তু নির্বাচনের পরও জনগণের পাশে থাকা, তাদের প্রাপ্য নিশ্চিত করা এবং সরাসরি তাদের জবাবদিহিতার আওতায় রাখা অনেক কঠিন। শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের এই উদ্যোগ সেই কঠিন path-কেই বেছে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। চাঁদপুরে শুরু হওয়া এই ব্যতিক্রমী তদারকি যদি দেশের অন্যান্য নির্বাচনী এলাকাতেও অনুসৃত হয়, তাহলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে শুরু করে সরকারি সহায়তা বণ্টনের পুরো ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা ঘটতে পারে।

কারণ সুশাসন কেবল আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এটি প্রতিষ্ঠিত হয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর নজরদারি এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে। রাজনীতির আসল সৌন্দর্য ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়, মানুষের অধিকার সুরক্ষায়। আর সেই অর্থে চাঁদপুরে দেখা এই উদ্যোগ নিছক একটি অনুদান তদারকির ঘটনা নয়; এটি জনকল্যাণমুখী রাজনীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জনগণের আস্থা অর্জনের সবচেয়ে বড় পথ হলো তাদের অধিকারকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়