রবিবার, ১০ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬, ০১:৫৮

প্রভাবশালী নেতৃত্বের জেলায় প্রত্যাশিত উন্নয়ন এখনও অধরা!

১৬ মে প্রধানমন্ত্রী চাঁদপুরের উন্নয়নে এমন ঘোষণা দেবেন, যাতে অধরা উন্নয়নগুলো সহসাই ধরা দেবে এবং জেলাবাসীর প্রত্যাশা পূরণ হবে

মোহাম্মদ সানাউল হক
প্রভাবশালী নেতৃত্বের জেলায় প্রত্যাশিত উন্নয়ন এখনও অধরা!
ক্যাপশন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক।

স্বাধীনতার পর থেকে চাঁদপুর জেলার প্রায় দশের অধিক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। এদের মধ্যে চাঁদপুর সদরের মিজানুর রহমান চৌধুরী অন্যতম প্রভাবশালী নেতা, যিনি ১৯৮৬ সালের ৯ জুলাই থেকে ১৯৮৮ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি স্বাধীনতোত্তর শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রীসভাতেও তথ্য ও বেতার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের অধীনে এসে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন।

এছাড়াও, চাঁদপুর জেলা থেকে যেসব রাজনীতিবিদ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে চাঁদপুর-৩ (সদর) আসনের ডা. দীপু মনি একাধারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীসমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া কচুয়ার ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শাহরাস্তির মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম) তিনি মূলত মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, পরে রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৯০–৯১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তিনি উপদেষ্টা হিসেবে নৌপরিবহন ও বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

অন্যান্যের মধ্যে হাজীগঞ্জের এম. এ. মতিন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্বসহ আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিলেন। অন্যদিকে কচুয়ার আ.ন.ম. এহসানুল হক মিলন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, বর্তমানে (২০২৬) সালে তিনি শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে আছেন। এছাড়াও মতলব উত্তরে বিএনপির বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল হুদা এবং আওয়ামী লীগের মোফাজ্জল হোসেন মায়া বীর বিক্রম বিভিন্ন সময়ে এমপি, মন্ত্রীপ্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি সাবেক সচিব, মতলব উত্তরের ড. শামসুল আলম পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে জাতীয় পার্টি নেতা, ফরিদগঞ্জের মাওলানা আবদুল মান্নান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মন্ত্রিসভায় ধর্মমন্ত্রীত্রাণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ফরিদগঞ্জের উন্নয়নে কম-বেশি কাজ করলেও পুরো জেলার ব্যাপারে নজর দিতে পারেন নি।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল হলো চাঁদপুর জেলা। ১৯৮৪ সালে বৃহত্তর কুমিল্লার অংশ থেকে এটি পূর্ণাঙ্গ জেলায় গঠিত হয়। তথ্যমতে, আয়তনের দিক থেকে চাঁদপুর বাংলাদেশের ৪১তম ও জনসংখ্যার দিক থেকে ২২তম (২০২২) বৃহৎ জেলা। প্রশাসনিকভাবে চাঁদপুর ৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এবং উপজেলার সংখ্যানুসারে চাঁদপুর বাংলাদেশের একটি 'এ' শ্রেণিভুক্ত জেলা। পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলে এ জেলা অবস্থিত। তিন নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত চাঁদপুর নদী বন্দরটি প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ নদী বন্দর হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। ইলিশ মাছের অন্যতম প্রজনন অঞ্চল হিসেবে এই জেলা 'ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর' হিসেবে পরিচিত।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরবর্তী সময়ে ১৯৬০ সালের ১ অক্টোবর ত্রিপুরা জেলার নামকরণ করা হয়েছিল কুমিল্লা। ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি (মতান্তরে ১ ফেব্রুয়ারি) প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে কুমিল্লার দুটি মহকুমা চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে পৃথক জেলা হিসেবে পুনর্গঠন করা হলে চাঁদপুর স্বতন্ত্র জেলায় উন্নীত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের অংশ হওয়ায় বাংলাদেশের দূরবর্তী জেলার মানুষ চাঁদপুরকে এখনো বৃহত্তর কুমিল্লার অংশ হিসেবে চেনে।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী চাঁদপুর জেলার মোট জনসংখ্যা ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৭৪৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ২৮ হাজার ৭৭৪ জন এবং নারী ১৪ লাখ ৫ হাজার ৬৮২ জন। জেলায় মোট পরিবার রয়েছে ৬ লাখ ৩৫ হাজার ৪৫৮টি। সাক্ষরতার হার ৬৮.০৫ শতাংশ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে ১,৬০০ জনেরও বেশি মানুষের বসবাস—যা জনঘনত্বের দিক থেকে জেলাটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে এতো বিশাল জনসংখ্যা ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চাঁদপুরের অর্থনীতি এখনো মূলত প্রবাসী আয়, কৃষি, মৎস্য—বিশেষ করে ইলিশ এবং ক্ষুদ্র বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। বড়ো শিল্পকারখানা বা বহুমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো এখানে এখনো গড়ে ওঠেনি। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চাঁদপুরের বাবুরহাট এলাকায় একটি শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠিত হলেও, দুই দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও সেটি প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হয়নি। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, নীতিগত জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে এই শিল্পনগরী এখনো নানা সমস্যায় জর্জরিত।

স্থানীয়রা মনে করেন, এর প্রধান কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে শিল্প বিনিয়োগের ঘাটতি, পর্যাপ্ত শিল্পাঞ্চল বা ইকোনমিক জোন না থাকা এবং দক্ষ শ্রমশক্তিকে ধরে রাখার মতো স্থানীয় কর্মসংস্থানের অভাব। ফলে শিক্ষিত ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড়ো অংশ ঢাকামুখী অথবা বিদেশে পাড়ি জমায়। বিদেশে খুব কম সংখ্যক শিক্ষিত মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সফল হয়, বেশিরভাগই তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে যাওয়ার আগেই ব্যর্থ হয়। যার ফলে স্থানীয় অর্থনীতি অনেক ক্ষেত্রেই গড়ে উঠতে অসহযোগী হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের তুলনামূলক ছোট বা কম জনসংখ্যার জেলা যেমন বগুড়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ—এসব জায়গায় শিল্পায়ন দ্রুত হয়েছে মূলত উন্নত সড়ক-যোগাযোগ, শিল্পজোন এবং রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত অর্থনৈতিক করিডোরের কারণে। এসব জেলায় কৃষির পাশাপাশি উৎপাদনশিল্প গার্মেন্টস ও সেবা খাত একসাথে বিকশিত হয়েছে, ফলে অর্থনীতি বহুমুখী হয়েছে। বিপরীতে চাঁদপুরে সড়ক অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি মানসম্মত নয় এবং বড়ো শিল্পের জন্যে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, গ্যাস, লজিস্টিক সাপোর্ট পর্যাপ্ত নয়। যদি এখানে পরিকল্পিতভাবে শিল্পপার্ক, আইটি প্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতো, তাহলে বিশাল জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করা সম্ভব হতো এবং জেলার অর্থনীতি বহুমুখী শিল্প অর্থনীতিতে রূপ নিতো—যার ফলে স্থানীয় মানুষের আয়, কর্মসংস্থান এবং জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারতো।

দেশ-বিদেশে চাঁদপুরকে বিশেষভাবে উপস্থাপনের জন্যে ২০১৫ সালে জেলা ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম শুরু করেন চাঁদপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুস সবুর মন্ডল। চাঁদপুর জেলার ব্র্যান্ডিং নাম দেয়া হয় 'ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর'। এর মাধ্যমে ২০১৭ সালে চাঁদপুর বাংলাদেশের প্রথম ব্র্যান্ডিং জেলা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ব্র‍্যান্ডিং লোগোটি অঙ্কন করেন বাংলাদেশের খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী, ফরিদগঞ্জের কৃতী সন্তান হাশেম খান। 'ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর'-এর রূপকার হিসেবে স্বীকৃতি পান তৎকালীন (২০১৫-২০১৮) জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সবুর মন্ডল।

ব্র্যান্ডিং কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা ব্র্যান্ডিং বুকথিম সং প্রকাশ করা হয়। এছাড়া ২০১৭ সালের ২৭ জানুয়ারি চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির আয়োজনে এবং চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ঢাকার বসুন্ধরা সিটি কনভেনশন সেন্টারে জেলা ব্র্যান্ডিং ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিলো চাঁদপুরের সুস্বাদু রূপালি ইলিশকে দেশি-বিদেশিদের কাছে তুলে ধরা এবং পর্যটনসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনার কথা জানানো।

এই জেলার রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসপ্রভাবশালী নেতৃত্বের উত্তরাধিকার। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত চাঁদপুর থেকে বহু প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের নেতৃত্ব উঠে এসেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এসব ব্যক্তিত্ব দেশের নীতিনির্ধারণে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই রাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাব কি জেলার উন্নয়নে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে? স্থানীয়দের একটি বড়ো অংশের মতে, বাস্তব চিত্র সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, জেলার উন্নয়ন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। নদীপথ, মৎস্যসম্পদ, কৃষি এবং ভৌগোলিক অবস্থান—সব মিলিয়ে চাঁদপুর অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে বিকশিত হতে পারতো। শুধুমাত্র প্রবাসী আয়ের ওপর স্থিতিশীল হয়ে থাকলেই ভবিষ্যৎ উন্নতি সাধিত হবে না। পরিকল্পিত শিল্পায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে ধারাবাহিক উদ্যোগের স্পষ্ট অভাব দূর করতে হবে। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের জন্যে উপযুক্ত চাকরির সুযোগ তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে। এতে করে জেলার সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ ধীরে ধীরে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

চাঁদপুর থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকলেও স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাঁদের প্রত্যক্ষ বা কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেকেই একাধিকবার মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু জেলার জন্যে টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁদের দৃশ্যমান অবদান কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে নেই বললেই চলে। এই পরিস্থিতি স্থানীয়দের মাঝে এক ধরনের হতাশা এবং অভিমানের প্রতিফলন ঘটিয়েছে , যেখানে তারা মনে করেন—ব্যক্তিগত সাফল্য থাকলেও সামষ্টিক উন্নয়ন উপেক্ষিত হয়েছে।

চাঁদপুর জেলায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। জেলা সদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এখনো আধুনিক সড়কব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। চাঁদপুর-কুমিল্লা চার লেনের সড়ক যেখানে সময়ের দাবি, সেখানে এখনও দু লেনের রাস্তা বিদ্যমান। ফলে যানজট, দুর্ঘটনা এবং দৈনন্দিন ভোগান্তি চাঁদপুরবাসীর নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি ঘনবসতিপূর্ণ জেলার জন্যে এই অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা পরিকল্পনার দুর্বলতাকেই ইঙ্গিত করে।

শিল্পায়নের ক্ষেত্রে চাঁদপুর অনেক পিছিয়ে। বড়ো ধরনের কোনো সরকারি বা আধা-সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি, যা স্থানীয়দের জন্যে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারতো। ছোটখাট ব্যবসা বা কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থাকলেও তা আধুনিক অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের অনেকেই রাজধানী বা বিদেশমুখী হচ্ছেন, যা জেলার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্যে নেতিবাচক সংকেত

ঢাকার বাইরে বাংলাদেশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইটি পার্ক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেগুলো দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে বিকেন্দ্রীকরণে ভূমিকা রাখছে। যেমন—যশোর জেলার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, চট্টগ্রামের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, আগ্রাবাদ, খুলনার কুয়েট এলাকায় আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার, নাটোরের আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার, রাজশাহীর হাই-টেক পার্ক (নির্মাণাধীন) এবং সিলেটের সিলেট ইলেকট্রনিক সিটি (হাই-টেক পার্ক) উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক অথরিটি, যারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইটি অবকাঠামো গড়ে তুলছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০টির বেশি হাই-টেক পার্ক/আইটি পার্ক অনুমোদিত বা নির্মাণাধীন রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড়ো ধরনের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করছে। চাঁদপুরের হাই-টেক পার্কটির কাজ মতলবে স্থবির অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

শিক্ষার হার তুলনামূলক ভালো হলেও সেই শিক্ষার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে পাস করা তরুণরা কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশ হয়ে পড়ছেন। দক্ষ মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও তাদের জন্যে কোনো প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, আইটি পার্ক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় সম্ভাবনাগুলো অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক সমস্যাও তৈরি করছে।

এই অবস্থার পেছনে পরিকল্পনার ঘাটতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং সমন্বয়হীন উন্নয়ন কৌশলকে দায়ী করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প গ্রহণ হলেও তা বাস্তবায়নে ধীরগতি, দুর্নীতি কিংবা অদক্ষতা বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন রোডম্যাপের অভাবও একটি বড়ো কারণ, যেখানে জেলাভিত্তিক বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি ছিলো। শুধু ব্যক্তিগত বা দলীয় অর্জন নয়, বরং সমন্বিত জেলা উন্নয়নই হওয়া উচিত ছিলো মূল লক্ষ্য।

ইলিশের বাড়ি চাঁদেরবাসীর মনে প্রশ্নটি থেকেই যায়—এই দায়ভার কার? রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, নাকি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা—সবারই কিছু না কিছু দায় রয়েছে। চাঁদপুরের মতো সম্ভাবনাময় জেলা যেন আর পিছিয়ে না থাকে, তার জন্যে প্রয়োজন বাস্তবমুখী পরিকল্পনা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর উদ্যোগ। উন্নয়ন কেবল প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই এখন সময়ের দাবি।

অধিকাংশ সুধী-পর্যবেক্ষকের মন্তব্য : চাঁদপুরের বাস্তব চিত্র দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়—সম্ভাবনার কোনো ঘাটতি নেই, ঘাটতি আছে সঠিক পরিকল্পনাবাস্তবায়নের। জেলাটির ভৌগোলিক অবস্থান, নদীপথ, শিল্পায়ন ও পর্যটন-সম্ভাবনা, মৎস্যসম্পদ—সবকিছুই একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করার মতো সক্ষমতা রাখে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মতো শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরেই অনুপস্থিত। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের জন্যে কোনো টেকসই কর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে ঢাকামুখী বা বিদেশমুখী হচ্ছে।

বিগত সময়গুলোতে চাঁদপুর জেলা থেকে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেলেও, সেই সুযোগকে জেলার টেকসই উন্নয়নশিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। ফলে এটি শুধু মানবসম্পদের অপচয়ই নয়, জেলার সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যেও বড়ো ক্ষতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আশার বাণী হচ্ছে, চাঁদপুর-৩ (সদর) আসনের এমপি শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের প্রচেষ্টায় চাঁদপুরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ, ইকোনোমিক জোন, সড়কের ব্যাপক সংস্কার, পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণপূর্ক কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই এমপি মহোদয়ের প্রচেষ্টায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাঁদপুরে আসছেন ১৬ মে শনিবার । উপরোল্লিখিত কাজগুলো পূর্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ আরো আগে সম্পন্ন করলে চাঁদপুর জেলাটি আজ আরো উন্নত জেলায় রূপ নিতে পারতো। আশা করা যায়, ১৬ মে প্রধানমন্ত্রী চাঁদপুরের উন্নয়নে এমন সব ঘোষণা দেবেন, যাতে অধরা উন্নয়নগুলো সহসাই ধরা দেবে এবং চাঁদপুরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ হবে।
ডিসিকে/ এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়