প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২১
ক্ষমতার উগ্রতা ও ভূলুণ্ঠিত নাগরিক মর্যাদা: মাঠ প্রশাসনের দায়বদ্ধতা কতদূর?

প্রজাতন্ত্রের সংবিধানে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে—“রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।” কিন্তু বাস্তবতার নির্মম আয়নায় বারবার প্রতিফলিত হয় এর বিপরীত এক চিত্র—যেখানে জনগণই হয়ে ওঠে ক্ষমতার নির্মম প্রদর্শনের শিকার। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে এক তরুণকে জনসমক্ষে চড় মারার অভিযোগ সেই চিরচেনা অসুস্থ বাস্তবতারই আরেকটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
|আরো খবর
এটি নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ‘অপ্রীতিকর ঘটনা’ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক দম্ভ এবং নাগরিক মর্যাদার চরম অবমূল্যায়নের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ—যা আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এক ভয়ংকর ব্যাধির লক্ষণ।
ক্ষমতার অপপ্রয়োগ বনাম আইনের শাসন: রাষ্ট্র নাকি ব্যক্তির খেয়ালখুশি?
একজন মেকানিক তরুণ—যিনি অসুস্থ শিক্ষকের প্রতিনিধি হয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন—তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যদি থেকেও থাকে, তবে সেটির বিচার করার জন্য রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো। প্রশ্ন হলো, সেই আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে একজন কর্মকর্তা কোন অধিকারে ‘তাৎক্ষণিক শাস্তিদাতা’ হয়ে উঠলেন?
আইনের শাসন যেখানে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে কোনো ব্যক্তি—সে যত উচ্চপদস্থই হোক না কেন—নিজেকে বিচারক, জল্লাদ এবং আইন প্রয়োগকারী হিসেবে একত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, কিছু ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসন আইনের শাসনের ধারক না হয়ে বরং ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার প্রদর্শক’-এ পরিণত হচ্ছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আইনের শাসন থেকে সরে গিয়ে ‘ব্যক্তির শাসন’-এর দিকে ধাবিত হবে—যেখানে ন্যায়বিচার নয়, বরং ক্ষমতাই চূড়ান্ত সত্য।
সত্য গোপনের সংস্কৃতি: দায় এড়ানোর পুরনো কৌশল
অভিযুক্ত কর্মকর্তার পক্ষ থেকে ঘটনাটি অস্বীকার করা—এ যেন এক চিরায়ত প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে সত্যকে গোপন করা আর ততটা সহজ নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সেই অস্বীকারের ভিত্তিকে ভেঙে দিয়েছে।
প্রশাসনের ভেতরে দায় স্বীকার না করার সংস্কৃতি যে গড়ে উঠেছে, তা কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। ‘চাবি নেওয়ার’ মতো দুর্বল যুক্তি তুলে ধরা কেবল একটি ঘটনার ব্যাখ্যা নয়—এটি সত্যকে আড়াল করার এক ব্যর্থ ও নিন্দনীয় প্রয়াস।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ঘটনার এক ঘণ্টা পর সত্যতা যাচাই করে ওই তরুণকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, শুরু থেকেই পদক্ষেপটি ছিল আবেগপ্রসূত, অযৌক্তিক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন।
আমলাতান্ত্রিক অহংকার ও শ্রেণিগত বৈষম্য: কার ওপর চলে এই ‘ক্ষমতার হাত’?
এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একই পরিস্থিতিতে যদি ভুক্তভোগী ব্যক্তি কোনো প্রভাবশালী পরিবার থেকে আসতেন, তবে কি একই আচরণ করা হতো?
বাস্তবতা আমাদের জানায়, উত্তরটি সম্ভবত ‘না’।
শ্রমজীবী, নিম্নআয়ের বা প্রান্তিক মানুষের প্রতি প্রশাসনের একটি অংশের মধ্যে যে অবচেতন অবজ্ঞা ও শ্রেণিগত দূরত্ব রয়েছে, এই ঘটনাটি তারই প্রতিফলন। যখন একজন কর্মকর্তা নিজেকে ‘জনগণের সেবক’ হিসেবে না দেখে ‘ক্ষমতার মালিক’ হিসেবে ভাবতে শুরু করেন, তখনই এই ধরনের অপমানজনক আচরণ জন্ম নেয়।
এটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি মানসিকতার সংকট—যেখানে মানবিকতা হারিয়ে যায়, আর তার জায়গা দখল করে নেয় ক্ষমতার উদ্ধত প্রদর্শন।
প্রশাসনিক সংস্কৃতির সংকট: সুশাসনের বদলে ভয়ভীতি
রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল আইন, ন্যায় এবং মানবিকতার সমন্বয়ে। কিন্তু যখন প্রশাসনের একটি অংশ ভয় প্রদর্শনকে কার্যকারিতার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন তা সুশাসনের পরিপন্থী হয়ে ওঠে।
এই ধরনের আচরণ সাধারণ মানুষের মনে প্রশাসনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়, সৃষ্টি করে ভয়, ক্ষোভ এবং বিচ্ছিন্নতা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক—কারণ জনগণের আস্থা হারালে রাষ্ট্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রতিকারহীনতা মানেই প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা
এই ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও বিচার না হলে এর পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী। এটি কেবল একটি ঘটনার বিচার না হওয়া নয়; বরং এটি একটি বিপজ্জনক বার্তা দেবে—যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করেও দায়মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি একসময় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, যেখানে অন্য কর্মকর্তারাও একই ধরনের আচরণে উৎসাহিত হন। ফলে অন্যায় একসময় ‘স্বাভাবিক আচরণ’-এ পরিণত হয়।
প্রত্যাশা: জবাবদিহিতার স্পষ্ট বার্তা
এখন সময় এসেছে এই ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার। শুধু বিভাগীয় তদন্ত নয়, বরং স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে—রাষ্ট্রের দেওয়া ক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি একটি দায়িত্ব, একটি অর্পিত কর্তব্য। সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে সংযম, মানবিকতা এবং আইনের সীমার মধ্যে থেকে।
উপসংহার: আমরা কোন পথে?
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রে নয়, তার নাগরিকদের মর্যাদায়। যখন একজন সাধারণ নাগরিক জনসমক্ষে অপমানিত হন এবং তার ন্যায়বিচার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—আমরা কি সত্যিই আইনের শাসনে বিশ্বাসী একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি এখনও আমরা সেই অন্ধকার আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির বেড়াজালে আবদ্ধ, যেখানে ক্ষমতাই শেষ কথা?
যদি এই প্রশ্নের উত্তর আমরা এখনই খুঁজে না পাই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাব দিতে হবে—কেন আমরা ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিলাম।
রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই সময়—ক্ষমতার উগ্রতা নয়, ন্যায় ও মানবিকতাই হোক প্রশাসনের প্রকৃত পরিচয়।
লেখক: অধ্যাপক মোঃ জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি, সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।
ডিসিকে/ এমজেডএইচ








