শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০৯:৪২

মর্যাদাহানির উৎসব ও সমাজের ভবিষ্যৎ

হাসান আলী
মর্যাদাহানির উৎসব ও সমাজের ভবিষ্যৎ

বর্তমান সমাজে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে—মর্যাদাহানি। কে কাকে কতোটা ছোট করতে পারে, কে কাকে কতোটা অপমান করতে পারে, কে কাকে সামাজিকভাবে বিব্রত করতে পারে—এ যেন এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যেও এই প্রবণতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে।

মর্যাদা মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। অর্থ, ক্ষমতা কিংবা পদমর্যাদা হারিয়েও মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু সম্মানহানি মানুষের অন্তরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। বিশেষ করে দুর্বল, অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের ওপর যখন মর্যাদাহানির আঘাত নেমে আসে, তখন তা শুধু একজন ব্যক্তিকেই নয়, পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।

আজকাল অনেকেই মনে করেন, কাউকে ছোট করতে পারা যেন নিজের বড়ত্বের প্রমাণ। সামাজিক মাধ্যমে বিদ্রূপ, ট্রল, কটাক্ষ ও অপমানমূলক মন্তব্যের বন্যা এই মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অনেক সময় নিজেদের অবস্থান ব্যবহার করে দুর্বলদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের ভিন্ন শিক্ষা দেয়।

মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো মজলুম বা নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর অন্যায়ভাবে জুলুম করা হয়, তখন ধীরে ধীরে মানুষের সহানুভূতি তাদের দিকে প্রবাহিত হয়। প্রথমে নীরব সমর্থন, পরে প্রকাশ্য সহমর্মিতা এবং একসময় তা প্রতিবাদে রূপ নেয়। এই প্রতিবাদই মজলুমকে শক্তিশালী করে তোলে।

জুলুম কখনো স্থায়ী হয় না। অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষের মনে জমে থাকা ঘৃণা, ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদ একসময় বিস্ফোরিত হয়। তখন যারা দীর্ঘদিন অন্যদের মর্যাদাহানি করে আনন্দ পেয়েছে, তারাই সমাজের কঠিন বিচারের মুখোমুখি হয়। ইতিহাসে এমন উদাহরণ অসংখ্য। ক্ষমতা ও প্রভাবের দম্ভে যারা নিজেদের অপরাজেয় ভেবেছিলো, সময়ের স্রোতে তারাই একদিন বিচ্ছিন্ন ও পরাজিত হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি সমাজের চরিত্র গঠনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাজ করে। একটি অসুস্থ সংস্কৃতি রাতারাতি পরিবর্তন হয় না। যদি দীর্ঘদিন ধরে অপমান, অবজ্ঞা ও শক্তির অপব্যবহার সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সেই সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব বহু বছর ধরে বহমান থাকে। ফলে সমাজে এক ধরনের ঘোলা পানির সৃষ্টি হয়, যেখানে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, সম্মান-অপমানের পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়।

তবে আশার কথাও আছে। সমাজের বিবেক কখনো পুরোপুরি মরে যায় না। মানুষ ভুল থেকে শিক্ষা নেয়। এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মকে সতর্ক করে। দুই বা তিন প্রজন্ম ধরে যদি মানুষ অপমান ও জুলুমের পরিণতি প্রত্যক্ষ করে, তবে ধীরে ধীরে সমাজে পরিবর্তন আসে। ঘোলা পানির ময়লা নিচে জমতে শুরু করে। তখন নতুন প্রজন্ম মর্যাদা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূল্য উপলব্ধি করতে শেখে।

কিন্তু এই পরিবর্তন সহজ নয়। একটি সত্যিকার ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে সময় লাগে। হয়তো পঞ্চাশ বছর, হয়তো তারও বেশি। কারণ সমাজের নৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন কোনো স্বল্পমেয়াদী প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘ সামাজিক যাত্রা।

এই যাত্রায় আইনের শাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। যখন আইন দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা নিরপেক্ষতা হারায়, তখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব সমাজের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। ক্ষমতা তখন ন্যায়ের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে এবং সমাজে অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। আইনের কার্যকারিতা কমে গেলে মর্যাদাহানি, বৈষম্য ও নিপীড়ন আরও বৃদ্ধি পায়।

অন্যদিকে একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা মানুষকে আস্থা দেয়। সেখানে শক্তিশালী ও দুর্বল সবাই সমানভাবে আইনের সুরক্ষা পায়। তখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়বিচার বড়ো হয়ে ওঠে। সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্যে এর কোনো বিকল্প নেই।

আমাদের তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি মর্যাদাহানির উৎসবে অংশ নেবো, নাকি সম্মান ও মানবিকতার সংস্কৃতি গড়ে তুলবো? আমরা কি অপমানকে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করবো, নাকি ভিন্নমত ও ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের মর্যাদা রক্ষায় সচেতন হবো?

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার অট্টালিকা, সড়ক বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়, বরং মানুষ মানুষের প্রতি কতোটা সম্মান প্রদর্শন করে, তার মধ্যেই নিহিত। মর্যাদা দেওয়া দুর্বলতার নয়, বরং শক্তির পরিচয়। আর যে সমাজ মর্যাদার মূল্য বোঝে, সেই সমাজই শেষ পর্যন্ত টেকসই উন্নতি ও শান্তির পথে এগিয়ে যায়।

সময় হয়তো দীর্ঘ, পথ হয়তো কঠিন। তবুও বিশ্বাস রাখতে হবে—জুলুমের চেয়ে ন্যায়, অপমানের চেয়ে সম্মান এবং ঘোলা পানির চেয়ে স্বচ্ছ জলই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়