শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৯

ভূতুড়ে রিপোর্ট ও স্বাস্থ্য খাতের নৈতিক ধস: এটি অবহেলা, নাকি নীরব হত্যাকাণ্ড?

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
ভূতুড়ে রিপোর্ট ও স্বাস্থ্য খাতের নৈতিক ধস: এটি অবহেলা, নাকি নীরব হত্যাকাণ্ড?
ছবি : প্রতীকী

মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন তার প্রথম ও শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে চিকিৎসা ব্যবস্থা। একজন চিকিৎসক কী ওষুধ লিখবেন, কোন পথ্য দেবেন কিংবা রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কতটুকু—তার অনেকটাই নির্ভর করে রোগ নির্ণয়ের সঠিক ফলাফলের ওপর। রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা তাই আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার মেরুদণ্ড। কিন্তু সেই মেরুদণ্ডেই যদি পচন ধরে, তবে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাই একসময় ভেঙে পড়তে বাধ্য

সম্প্রতি চাঁদপুরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের যৌথ অভিযানে যে অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে, তা শুধু উদ্বেগের নয়; বরং জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে গভীর আতঙ্কেরও কারণ। রোগী আসার আগেই আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট প্রস্তুত করে রাখা, মেয়াদোত্তীর্ণ কেমিক্যাল বা রিএজেন্ট ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নমুনা সংরক্ষণ—এসব কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি বা অসাবধানতা নয়। বরং এগুলো রোগ নির্ণয় ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি ভয়ংকর অনৈতিক ও প্রতারণামূলক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করে।

একটি ভুল রিপোর্ট, একটি জীবনের বিপর্যয়

একটি ভুল বা ভিত্তিহীন রিপোর্ট কীভাবে একজন মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে, তা ভুক্তভোগী পরিবার ছাড়া অন্য কারও পক্ষে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। একটি ভুল রিপোর্টের ভিত্তিতে যখন চিকিৎসা শুরু হয়, তখন প্রকৃত রোগটি চিকিৎসার বাইরে থেকে আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। অন্যদিকে ভুল ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কিডনি, লিভার কিংবা শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে এর পরিণতি মৃত্যুতেও গড়াতে পারে

অন্যদিকে, একজন সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষকে যদি ভুল পরীক্ষার মাধ্যমে গুরুতর বা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত বলে জানানো হয়, তাহলে সেই মানসিক আঘাত, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তার জীবনকে মুহূর্তেই ওলটপালট করে দিতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং একটি পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়

না জেনে ভুল করা আর আর্থিক লাভের আশায় জেনেশুনে রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া—এই দুটি বিষয় কখনোই এক নয়। নৈতিকতার বিচারে চিকিৎসাসেবার নামে এ ধরনের প্রতারণা এক ধরনের 'নীরব হত্যাকাণ্ডের' শামিল। কারণ এখানে অস্ত্রের ব্যবহার নেই, কিন্তু একটি ভুল রিপোর্টের মাধ্যমে ধীরে ধীরে একজন মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়ে।

আইনের দুর্বলতা ও অপরাধের পুনরাবৃত্তি

অভিযানে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। প্রশাসনের উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকে যায়—লাখ লাখ টাকার ব্যবসা পরিচালনাকারী একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কয়েক হাজার টাকার জরিমানা আদৌ কতটা কার্যকর?

যখন অপরাধ থেকে অর্জিত মুনাফা শাস্তির তুলনায় বহুগুণ বেশি হয়, তখন আইন তার প্রতিরোধমূলক শক্তি হারিয়ে ফেলে। বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ক্ষেত্রে কেবল নামমাত্র জরিমানা করে দায়িত্ব শেষ করলে অসাধু চক্রের মধ্যে ভয়ের পরিবর্তে এক ধরনের প্রশ্রয়ই তৈরি হয়। ফলে একই অপরাধ বারবার ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়।

জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে আইনকে শুধু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এটি হতে হবে জীবন ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষার কার্যকর হাতিয়ার

প্রতিকারের পথ ও আমাদের প্রত্যাশা

স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখনই কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

প্রথমত, রোগী না দেখেই রিপোর্ট তৈরি করা, পরীক্ষার ফল জালিয়াতি করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া রিপোর্ট প্রদানকে কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম হিসেবে নয়, মানুষের জীবন বিপন্ন করার গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, যেসব প্রতিষ্ঠান এ ধরনের গুরুতর অনিয়মে জড়িত প্রমাণিত হবে, তাদের লাইসেন্স সাময়িক নয়, প্রয়োজনে স্থায়ীভাবে বাতিলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যসেবা কোনো সাধারণ ব্যবসা নয়; এটি মানুষের জীবন ও বিশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তৃতীয়ত, জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে সারা বছরজুড়ে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন পরিচালনা করতে হবে। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, প্রতিরোধমূলক তদারকিই হতে পারে এ ধরনের অনিয়ম রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়

জনস্বাস্থ্য নিয়ে কোনো ধরনের আপস বা শিথিলতার সুযোগ নেই। চাঁদপুরসহ সারা দেশের স্বাস্থ্য খাতকে নীতিহীন ও প্রতারক চক্রের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং আইন-প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে 'শূন্য-সহনশীলতা' (Zero Tolerance) নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

একটি ভুয়া বা ভুল রোগ নির্ণয় কেবল একটি চিকিৎসাগত ত্রুটি নয়; এটি একটি মানুষের জীবন, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার ওপর আঘাত। সেই আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। তাই এমন অপরাধের বিচারও হতে হবে দৃষ্টান্তমূলক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো প্রতিষ্ঠান মানুষের জীবন নিয়ে এমন নিষ্ঠুর ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়। কারণ, একটি ভুল রিপোর্টের মূল্য কখনো কয়েক হাজার টাকার জরিমানায় পরিশোধ করা যায় না—তার মাশুল অনেক সময় দিতে হয় একটি তাজা প্রাণ, একটি ভেঙে পড়া পরিবার এবং একটি জাতির স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস দিয়ে।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়