বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ২১:২০

ভার্চুয়াল ভালোবাসা বনাম বাস্তবতার বৃদ্ধাশ্রম

অনলাইন ডেস্ক
ভার্চুয়াল ভালোবাসা বনাম বাস্তবতার বৃদ্ধাশ্রম

পিকলো সরকার

বর্তমান যুগ হলো উত্তরাধুনিক ও প্রযুক্তি জ্ঞানসমৃদ্ধ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগ। আমাদের সকাল শুরু হয় ফেসবুকের নোটিফিকেশন দেখে আর রাত শেষ হয় স্ক্রল করতে করতে। এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আমরা নিজেদের প্রতিনিয়ত এক একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় মহড়া দেখা যায় বছর ঘুরে যখন ‘মা দিবস’ কিংবা ‘বাবা দিবস’ আসে। সেদিন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের নিউজফিড ভরে যায় বাবা-মায়ের সাথে হাসিমুখে তোলা সেলফিতে। সুদীর্ঘ আবেগঘন ক্যাপশনে প্রকাশ পায় তঁাদের প্রতি আমাদের অগাধ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা। কিন্তু এই ভার্চুয়াল আদিখ্যেতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তব সমাজটা কি আসলেই এতটা সুন্দর?

যদি অনলাইনে প্রকাশ করা এই শ্রদ্ধাবোধ আর ভালোবাসার সামান্য অংশও আমাদের বাস্তব জীবনে থাকত, তবে আজ সমাজ থেকে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নামক নির্মম প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত হয়ে যেত। বৃদ্ধাশ্রমগুলো আজ কোনো জীবন্ত কষ্টের আখড়া না হয়ে, মানব ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের স্মারক হিসেবে জাদুঘরে স্থান পেত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একদিকে অনলাইনে বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসার জোয়ার বইছে, অন্যদিকে প্রতি বছর বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা এবং সেখানে আশ্রয় নেওয়া অসহায় বাবা-মায়ের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

যা বিখ্যাত বিট্রিশ অর্থনীতিবিদ টমাস রবার্ট ম্যালথাস এর জনসংখ্যা তত্ত্বের মত হয়ে যাচ্ছে।

এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের প্রকাশ করা ভালোবাসাটা অনেকাংশেই নিরর্থক এবং লোক দেখানো। এটি আসলে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ফঁাদ, যেখানে আমরা সমাজকে দেখাতে চাই আমরা কতটা দায়িত্বশীল সন্তান। অথচ যে মা নিজের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে সন্তানকে বড় করেছেন, কিংবা যে বাবা নিজের সমস্ত যৌবন আর স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে, তঁাদের শেষ বয়সের প্রাপ্য কেবল একটুখানি সময়, একটুখানি যত্ন আর মানসিক শান্তি। কোনো দামি রেস্তোরঁার খাবার কিংবা বছরে একদিনের ফেসবুক পোস্ট তঁাদের সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।

বাস্তব জীবনে আমরা অনেকেই ক্যারিয়ার, ব্যস্ততা কিংবা নিজস্ব পরিবারের অজুহাতে বাবা-মাকে বোঝা মনে করতে শুরু করি। আধুনিকতার অন্ধ দৌড়ে আমরা ভুলে যাই, যে মানুষগুলো একসময় আমাদের হাত ধরে হঁাটতে শিখিয়েছিলেন, আজ তঁাদের বার্ধক্যে আমাদের হাতটার বড্ড প্রয়োজন। যখন তঁারা একটু কথা বলতে চান, তখন আমাদের হাতে সময় থাকে না। অথচ আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় করি ফেসবুকের ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বন্ধুদের সাথে চ্যাট করে। এই দ্বিচারিতা আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে।

আমরা ভাবি অবহেলা কিংবা বৃদ্ধাশ্রমের গল্পগুলো হয়তো কেবল অসচ্ছল বা অশিক্ষিত পরিবারের। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, উচ্চশিক্ষা আর সামাজিক প্রতিষ্ঠাও আজ সন্তানকে ‘মানুষ’ করতে পারছে না। এর বড় প্রমাণ আমাদের চারপাশের কিছু বাস্তব ও জীবন্ত উদাহরণÑ

অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আউয়াল : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দীর্ঘ ১৭ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ২০০৬ সালে অবসরে যাওয়ার পর, পারিবারিক ও সন্তানদের চরম অবহেলার শিকার হয়ে তিনি আগারগঁাওয়ের ‘প্রবীণ নিবাস’-এ জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে বাধ্য হন।

অধ্যাপক রেজাউল হারুন বাবু : সরকারি বাংলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজের মতো নামী তিনটি সরকারি কলেজের এই প্রাক্তন অধ্যাপকের শেষ ঠিকানা এখন এক চিলতে বৃদ্ধাশ্রমের ঘর।

আব্দুল হামীদ মোল্লা : লক্ষ্মীপুরের এই সংগ্রামী বাবা সন্তানদের মানুষ করার তাগিদে একসময় হোমিও ওষুধ বিক্রি করেছেন। নিজের তিন ছেলে, তিন মেয়েকে শিক্ষিত করার পাশাপাশি বিমান ও নৌবাহিনীতে কর্মরত ছোট দুই ভাইকে মানুষের মতো মানুষ করেছেন। অথচ আজ বুক ভরা আহাজারি আর চোখ ভরা কান্না নিয়ে দিন কাটছে বৃদ্ধাশ্রমে, তঁার এই শিক্ষিত পরিজনদের কেউ আজ তঁাকে দেখার সুযোগ পায় না।

এই মানুষগুলো সমাজকে আলো দিয়েছেন, সন্তানদের যোগ্য করেছেন, অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তঁারা নিজেরাই চরম অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। তঁাদের এই পরিণতি আমাদের তথাকথিত সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার গালে এক একটি চপেটাঘাত।

ভালোবাসা কোনো একদিনের প্রদর্শনী বা সস্তা লাইক-কমেন্টের বিষয় নয়, এটি প্রতিদিনের যাপন। বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটুক প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণে। অফিস থেকে ফিরে তঁাদের পাশে পঁাচ মিনিট বসা, তঁাদের ঔষধটা ঠিক সময়ে এনে দেওয়া, কিংবা শুধু কেমন আছো? বলে একটু খেঁাজ নেওয়া, এই সামান্য যত্নের মূল্য ফেসবুকে হাজারটা লাইক বা শেয়ারের চেয়ে অনেক বেশি।

আসুন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই মেকি দেয়াল ভেঙে আমরা বাস্তবে ফিরি। ভার্চুয়াল জগতের সস্তা মোহের চেয়ে বাবা-মায়ের জীবিতাবস্থায় তঁাদের উপযুক্ত সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়াটা অনেক বেশি জরুরি। আমাদের ঘরে ঘরে যেন প্রতিটি বাবা-মা শেষ বয়সে সন্তানের স্নেহে ও নিরাপদে থাকতে পারেন, কোনো বৃদ্ধাশ্রমে নয়। যেদিন আমরা ভার্চুয়াল ভালোবাসা টেক্সট ও স্ক্রিন থেকে বের করে বাস্তবে রূপ দিতে পারব, সেদিনই আমাদের সমাজ সত্যিকারের মানবিক ও সুন্দর হয়ে উঠবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়