প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০৭
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(পঞ্চাশতম পর্ব)
তুষারের দেশে রাশিয়ায় শেষে-২
দুহাজার দুই সালের দিকে তখনও অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন কিংবা ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জারের যুগ আসেনি। যারা মধ্যপ্রাচ্যে থাকতো তাদের জন্যে দেশের মানুষের ক্যাসেটে রেকর্ড করা কথামালাই ছিলো যোগাযোগ ও আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের ভালো মাধ্যম। আমরা যারা এ সময় রাশিয়ায় ছিলাম তাদের জন্যে একটা অন্য সুযোগ ছিলো। গভীর রাতে কিংবা রাত এগারোটার দিকে কখনও কখনও ওখানকার বি-লাইন ফ্রি পাওয়া যেত, যা দিয়ে অ্যানালগ মোবাইল ফোনে দেশে ঘন্টার পর ঘন্টা বিনামূল্যে কথা বলা যেতো। রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের সময় ব্যবধান ছিলো দু ঘন্টা। ওখানকার রাত বারোটা মানে বাংলাদেশে রাত দুটো। রাশিয়ায় মা-বাবা থেকে দূরে থাকা ছেলেমেয়েরা ওঁৎ পেতে থাকতো কখন এই বি-লাইন ফ্রি পাওয়া যায়। কেউ একজন পেলে সে চিৎকার করে সবাইকে জানিয়ে দিতো। সবাই তখন রাতদুপুরে কানে হাত দিয়ে যে যার মতো কথা বলতো অবিরাম। এ যেন এক কথা বলার উৎসব। এতো কথা বলা যায়! ম্যারাথন সে কথার উৎসব চলতো। কারও কারও রাত কেটে ভোর হয়ে যেতো, তবু কথার ঝাঁপি খালি হতো না৷ কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউ হেঁটে হেঁটে, কেউ শুয়ে শুয়ে কথা বলে চলেছে। মায়ের সাথে কথা বলা শেষ হলে বাবা ধরে। বাবা শেষ করে বোনকে দেয়। বোনের শেষ হলে ভাইকে দেয়। ভাই বলে শেষ হলে আবার মায়ের কাছে ফিরে যায় মোবাইল সেট। এভাবে বলতে বলতে একসময় মায়ের হাই উঠে, চোখের পাতা বটে আসে, কথার ফুলঝুরি স্তিমিত হয়। মা তখন ঘুমের দেশে নাম লেখায়। অগত্যা ছেলের কাছে মিনতি করে ফোন রাখতে হয়। ছেলে ফ্রি কথা বলার সুযোগ পেয়ে দু ঘন্টার বেশি তা এস্তেমাল করতে না পারার আফসোস নিয়ে বিছানায় যায়। তখন মনে পড়ে যায় সেই গেঞ্জির কথা। যা দীর্ঘদিন ব্যবহারে জীর্ণ হওয়ার পর নানা কিছু বানিয়ে শেষে পুড়িয়ে ছাই করা হলো। অবশেষে সে ছাই দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে কৃপণ মালিক মুখের ময়লা পিচিক করে ফেলতে ফেলতে বলে উঠে, গেঞ্জি কেনার বিশটা টাকা জলেই গেলো। দু ঘন্টা কথা শেষ করে রাত গভীরে দেশে আর কারও সাথে কথা বলার সুযোগ না পেয়ে ছেলেটাও শেষমেষ আফসোস করে বলতে হয়, শালার বি-লাইনে ফ্রি কথা বলার সুযোগটা বৃথাই নষ্ট হলো। এই ফ্রি কথা বলার সুযোগ অন্তত সপ্তাহে দু-তিনদিন পাওয়া যেতো। বেশিরভাগ পাওয়া যেতো উইকএন্ডে শনিবার রাতে। আহারে! কথা বলার সে কী মেলা! ভাত কী দিয়ে খেয়েছিস থেকে শুরু করে কাল সকালে কী খাবি দিয়ে শেষ করেও মনের আশ মিটতো না বাঙালির। এতো কথা বাঙালি বলতে পারে!
রাশিয়ায় যাওয়ার পর ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে পাসপোর্ট জমা দিতে হতো। তার বিপরীতে তারা একটা ছোট টুকরো কাগজ দিতো। একে ওখানকার স্থানীয় ভাষায় স্প্রাবকা বলতো। এই কাগজ দেখিয়েই রাস্তাঘাটে বিদেশি স্টুডেন্টদের চলতে হতো। স্প্রাবকা দেখতে পেলে পুলিশ আর কিছু বলতো না। রুশ ভাষা শিক্ষণ কোর্স চালু হলেও আমাদের হাতে প্রচুর সময় বেঁচে যেতো। এই অবসর কাটাতে গিয়ে খেলতে হতো কার্ড, অকারণ গপসপ মারতে হতো লোকেদের সাথে। না দরকার হলেও বাইরে বেরুতে হতো তুষারে। সময় যাপনের উৎকৃষ্ট কোনো উপায় আমাদের ছিলো না তখন। খুলনার চিরঞ্জীবদা এক মজার মানুষ ছিলেন। তিনি কেবল সুযোগ পেলেই রোলেদকা খেলতেন। হারতেন বেশি জিততেন কম। অনেক টাকা তার হারাতে হতো। কিন্তু তবুও সেটাই ছিলো তার সময় যাপনের মাধ্যম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আমাদের সাথে ছিলেন ব্রিজের সদস্য হয়ে। কুমিল্লার উল্লাস আমাদের অনেক আগেই রাশিয়ার যাত্রী। সে পথঘাট চিনতো। সে এসে মাঝে মাঝে আমার সাথে দাবা বা শাখমাত খেলতো। মালাদিয়ুস শব্দটি সে বেশি উচ্চারণ করতো যার অর্থ এক্সিলেন্ট। চট্টগ্রামের পটিয়ার কল্লোলদা ও বৌদ ছিলেন অনতিদূরে। কল্লোলদা পড়তে এসেছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং। এখানে এসেই প্রণয় ও পরিণীত হলেন। তিনি ছিলেন আমাদের ওমর ফারুকের পরিচিত। তার সুবাদে আমরা ওনার বাসাতে নেমন্তন্ন খেলাম। হাতছাড়া সেদ্ধ আলুকে ম্যাশ করার বিকল্প যন্ত্র মনে হয়ে ওখানেই প্রথম দেখলাম। তার বাসায় অমদির দ্রাক্ষারসেও আমাদের অকারণ হাসির ফোয়ারা বইছিলো। কল্লোলদা ওখানে ইঞ্জিনিয়ারিং পেশায় না থেকে ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতির ব্যবসা শুরু করেছিলেন। অধিকাংশ বাঙালিই তা করতো তখন।
মস্কোস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়েছিলাম দুবার। নাজিমউদ্দৌলা ছিলেন তখন রাষ্ট্রদূত। রমিজ সাহেবই নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের একজনের বাবার বন্ধু হাইকমিশনে চাকরি করতেন। রমিজ সাহেব ছিলেন টাঙ্গাইলের মানুষ। তিনি তার এককক্ষের হোস্টেল নিবাসে সংসার পেতেছিলেন। বাচ্চাও ছিলো একটা। বাংলাদেশ হাইকমিশনেই দেখা হয়েছিলো প্রখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার সাথে। তিনি পরে একুশে পদকে ভূষিত হন। তিনি আহ্বান করেছিলেন মাঝে মাঝে আড্ডা দিতে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়ার জন্যে। হাইকমিশনে যেতে যেতে একটা দৃশ্য দেখে মনে ভালো লাগা তৈরি হয়ে যায়। মেট্রোতে সব রাশানই একটা না একটা বই মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। তাদের পাঠমগ্নতা আমাকে আকৃষ্ট করেছে গভীরভাবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও একজন বাছবিচার না করা পড়ুয়া। আমাদের মতো পরচর্চায় বা পরনিন্দাতে তারা সময় কাটায়নি। মেট্রোর ঐ সময়টুকুও তারা নিজেদের আত্মিক নির্মাণে ব্যয় করেছে। আর এ কারণেই তারা এগিয়ে গিয়েছে সভ্যতায়। তখন অবশ্য তাদের অর্থনীতি দুর্বল ছিলো। পেরেস্ত্রোইকা পরবর্তী তাদের যে সংকট তৈরি হয় তা মোকাবেলায় তাদের বেশ ভালো সময় লেগেছে। রাষ্ট্র মালিকানাধীন কলকারখানার কারণে তাদের বেসরকারি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিল্প ও বাণিজ্য তখনও শক্তপোক্ত হয়ে উঠেনি। ফলে বেকারত্ব সে সময় রাশিয়াকে গ্রাস করেছিলো। রাশিয়ান নারীদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দিয়ে নিজেদের বিকিয়ে দিতো দিরহাম-দিনার-রিয়ালের দামে। গরমের ছুটিগুলো তাদের জন্যে ছিলো মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের পণ্য করে তোলার মোক্ষম সময়। দুবাইয়ের ভিলাগুলোতে একসময় রাশিয়ান রমণীদের আনাগোনা ছিলো খুব। রুশ রমণীরা যেমন দীঘল তেমনি শার্দুল নয়না। মুখে আপেলের আভা, গায়ের বর্ণে খেলে যায় গোধূলি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবেরদের কাছে তারা কাঙ্ক্ষিত ছিলো সবসময়।
বিদেশ বিভূঁইয়ে কখন যে কী খেতে মন চায় তা স্বয়ং স্রষ্টাই মালুম। দীর্ঘদিন স্বদেশ থেকে দূরে থাকার কারণে মনের মধ্যে লটিয়া মাছ খাওয়ার তীব্র বাসনা তৈরি হলো। গাজীপুরের সোহাগ একদিন খোঁজ দিলো, মস্কো মেট্রো স্টেশন থেকে পনর মিনিটের পথ মেট্রোরেলে। স্টেশনটির নাম ভেদেনখা। ওরা ইংরেজিতে লেখে ঠউঘশয.
এটা মস্কোর উত্তর-পূর্ব শহরতলী বলা যায়। এখানেই আছে মস্কোর মহাকাশজয়ী নভোচারীদের স্মরণে এক সমাধি। এটি প্রায় একশো সাত মিটার বা তিনশো একান্ন ফুট উঁচু। এর পাদদেশে আছে জাদুঘর। এখানেই আছে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম মহাকাশচারী নভোচর ইউরি গ্যাগারিনের ভাস্কর্য। তিনি ভস্টক-১ নভোযানে চরে মহাকাশে পাড়ি দেন। এটি ছিলো ঊনিশশো একষট্টি সালের বারো এপ্রিল। এর কাছেই প্রসপেক্ত মিরা বা শান্তি অ্যাভেনিউ। মাত্র চৌত্রিশ বছর আয়ু পাওয়া এ বিমানসেনা নভোচরের নামে মহাকাশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নামকরণ করা হয়। তার মৃত্যুর আগে এতে তিনি প্রশিক্ষক ছিলেন। এই ভেদেন খা-র নিকটে মহাকাশজয়ী নভোচরদের স্মৃতিসৌধের আশেপাশে থাকে অনেক বাঙালি, যারা ইলেকট্রনিকস জিনিসপত্রের ব্যবসায়ে জড়িত। তারা তাদের আহারের প্রয়োজনে এখানে খুলেছে বাঙালি ভাতের হোটেল। এ জায়গাতেই পাওয়া যায় রান্না করা লটিয়া মাছ। এখানে এসে রথও দেখা হলো কলাও বেচা হলো। নভোচরদের সম্মানও জানালাম আর মনভরে ঝাল ঝাল লটিয়া মাছও খেলাম গরম ভাতে। যারা চট্টগ্রামের বাইরের, তারা লটিয়া মাছ রাঁধতে হিমশিম খান। অনেকেই লটিয়া মাছের গন্ধকে দূর করতে পারেন না। কিন্তু ভেদেনখা-র বাঙালি রাঁধুনি বেশ কুশলতার সাথে লটিয়া মাছ রান্না করেছিলেন। আমার মনে হয়েছিলো আমি দেশেও এমন কুশলী লটিয়া মাছ রান্না খাইনি। আমাদের কাছ থেকে দামও কম রেখেছিলেন ঐ হোটেল মালিক।
আমাদের দেশে আমরা ফিলিস্তিনীদের নিয়ে খুব চিন্তা করি। এমনকি আমরা এখানে কোকাকোলাও বর্জন করি। কারণ আমরা মনে করি, কোকাকোলা বিক্রিত অর্থে ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনীদের ওপর বর্বর ও অন্যায্য হামলা চালায়। আমাদের সাথে মস্কো গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একদল ফিলিস্তিনী শিক্ষার্থী ছিলো। তাদের দেখে আমাদের মমত্ববোধ তৈরি হলো। আমরা আন্তরিকভাবে তাদের সাথে বন্ধুতা কামনা করলাম। তাদের পরিচয় হলো জাতীয়তায় আরবীয় কিন্তু নাগরিকত্বে ফিলিস্তিনী।তবে মস্কোতে দেখলাম, উইকএন্ডের রাতে তারা উদ্দাম হয়ে যায়। তারা কোকাকোলা পানে অবিরাম ও অবারিত। আমরা যা মনে করি কোকাকোলা নিয়ে, তারা তা মনে করে না মোটেই। আর ভদকা-বিয়ার এবং গানের তালে তালে নাচ তো আছেই। রজনী তাদের কাছে রঙিন হয়ে উঠে। আমাদের অনেকেই তাদের এ উদ্দামতা দেখে মনঃক্ষুণ্ন হয়। তাদের দেশে নিপীড়িত জনতার দুঃখ এসময় তাদের স্পর্শ করতে পারে না। আমাদের ওমর ফারুক তো বলেই ফেললো মনের কষ্টে : আমরা কাদের জন্যে কী করি!
রাশিয়াতে মনখুলে বিদেশিদের চলাফেরায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা হলো স্কিন হেড গ্যাং। এরা হলো মুণ্ডিত মস্তক বেকার যুবকদের এক একটা গ্যাং। অনেকটাই হাল আমলে আমাদের দেশের কিশোর গ্যাংয়ের মতো। একা থাকলে তারা ভীরু কাপুরুষ আর দলে থাকলে তারা বেপরোয়া। এরা খোদ রাশান অরিজিন। এদের ধারণা হলো, বিদেশিরা তাদের দেশে এসে তাদের বর্ণশুদ্ধতা নষ্ট করে দিচ্ছে। দেশে পুরুষ সংকটের সুযোগ নিয়ে বিদেশিরা তাদের নারীদের সাথে প্রণয় ও পরিণয়ের মাধ্যমে তাদের জীনগত শংকরায়ন ঘটিয়ে দিচ্ছে। ফলে খাঁটি রাশানের ঘাটতি তৈরি হয়ে যাচ্ছে। ব্যবহার ও বিশ্বাসে এই স্কিন হেড ডানপন্থী। তারা একদিকে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর যেমন চড়াও হয়, তেমনি ককেশিয়ানদের ওপরও তারা খড়গহস্ত। বিশেষত বিকেল হতে রাত অবধি তাদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। আমরা যখন ছিলাম তখন সারা রাশিয়াজুড়ে স্কিন হেড গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ছিলো প্রায় পঞ্চাশ হাজার। মস্কোর চেয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গে তাদের ঘনত্ব বেশি। তাদের হাতে তখনও পর্যন্ত চুয়াল্লিশজন বিদেশি নিহত হন এবং প্রায় তিন হাজার বিদেশি আহত হন মারাত্মকভাবে। আমাদের অবস্থানকালীন তারা মেরে ফেলে ঘানার রাষ্ট্রদূতকে এবং কুমিল্লার কামাল নামে একজনকে। আমাদের চোখের সামনেই সৌদি এক নাগরিককে তারা ধাওয়া করে হিংস্রভাবে। ঐ নাগরিকের রাশান বান্ধবী ছিলো বটে। ওরা যখন ধাওয়া দেয় তখন এশিয়ানরা এবং আফ্রিকানরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বরফের রাস্তায় দৌড়াতে গিয়ে অনেক সময় পা পিছলে পড়ে যায়। ফলে হাতে-পায়ে ফ্র্যাকচার তৈরি হয়। কখনও কখনও ভয়ে হার্ট অ্যাটাকও হয়ে যায় অনেকের। উল্লাস ভাই একদিন বলেছিলো, ওদের হেড কোয়ার্টার নাকি ইতালির তুলা শহরে। ওদের ভয়ে আমরা দল বেঁধে বাজার কিংবা ক্যাম্পাসে যেতাম। আমি মূলত রাশিয়া ছেড়ে দেশে ফিরে আসার বড়ো কারণ হলো এই স্কিন হেড গ্যাংয়ের আতঙ্ক।
রাশানরা প্রাঝনিক প্রবণ জাতি। প্রাঝনিক হলো উৎসব বা ফেস্টিভ্যাল। তুচ্ছ উপলক্ষকেও তারা ফেস্টিভ্যালে পরিণত করতে পারে। তাদের প্রধান উৎসব হলো নভিগদ ও ক্রিসমাস। নভিগদ হলো নববর্ষ। যে কোন বিষয়ে তারা পাদ্রোগ দিতে অভ্যস্ত। পাদ্রোগ হলো উপহার। অনেকে একে ঘুষ হিসেবেও আখ্যা দেয়। পেরেস্ত্রোইকা-উত্তর রাশিয়া খুবই দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলো। তাদের সংস্কৃতিতে বিনয়ের ব্যবহার প্রকট। কিছু জানতে চাইলে তারা বলে, ইজবিনিয়েতে পাজালুস্তা। মানে হলো এক্সিউজ মি। ক্ষুদ্র তাদের কাছে মালিঙ্কি আর বিশাল তাদের ভাষায় বালশই। বুড়ো মানে বাবুস্কা। কারও সৌন্দর্যের প্রশংসায় তারা বলে তাতিয়ানা। মানে সুন্দরী। গুড ডে বলে কুশল কামনা করতে গেলে তাদের বলতে হয়, দব্রে দিন। কারও সাথে দেখা হওয়ার প্রথম মুহূর্তে তারা বলে, দ্রাস্তোভিচে। এর মানে হলো আপনার মঙ্গল হোক। রাশিয়ায় থাকাকালীন ঘুরে এলাম আজকের সেন্ট পিটার্সবার্গ যা ঊনিশশো একানব্বই সালের আগে ছিলো লেনিনগ্রাদ। মস্কোর ক্রেমলিনে গিয়ে ছবি তোলার হিড়িক পড়ে গিয়েছিলো সবার মাঝে। ক্রেমলিনে গার্ডদের পালাবদলের দৃশ্য ছিলো অভূতপূর্ব। দুহাজার দুই সাল থেকে তারা প্রতি রোববারে ক্যাথেড্রাল গার্ডদের পালা বদল প্রদর্শন করে আসছে। মস্কোর ইজমেয়ালোভা স্টোন মার্কেটে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেললাম, কোনটা ছেড়ে কোনটা কিনি এই ভেবে। তুষারাবৃত বনের মাঝ দিয়ে অভিযাত্রীর মতো হেঁটে যেতাম সাইবারক্যাফেতে। এখনও মাঝে মাঝে সেই শ্বেতশুভ্র বন-বনানী হাতছানি দেয় ঊষর দুপুরে, উষ্ণ অপরাহ্ণে। (চলবে)





