মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   ১৬-২৫ মার্চ নদীতে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ থাকবে : নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ১০:১৬

খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(পঞ্চাশতম পর্ব)

তুষারের দেশে রাশিয়ায় শেষে-১

শিক্ষাজীবনের নানারঙের দিনগুলো পেরিয়ে, মেডিকেল কলেজের পাঠ চুকিয়ে, নগরীর ব্যস্ত ক্লিনিকে নিয়মিত ডিউটির পাশাপাশি মন খুঁজতে থাকে বাইরের দেশে পাড়ি দেওয়ার সুযোগ। পাঁচলাইশ পার হয়ে মির্জাপুল এলাকায় এডুকেয়ারের ছোট একটা অফিস নিয়ে বসেছিলেন মেসবাহ সাহেব, যিনি কোনো একটা কলেজে অধ্যাপনা করতেন এবং পাশাপাশি রাশিয়ায় ছাত্রছাত্রী পাঠাতেন স্টুডেন্ট ভিসায়। বড়দার পাঠানো দুলক্ষ টাকার শক্তিতে তার কাছে গিয়ে রাশিয়ায় ইমিউনোলজিতে পিএইচডি করার জন্যে পাড়ি দেই। দুহাজার দুই সালে ডিসেম্বরের আটাশ তারিখ উজবেক এয়ারলাইন্সে চড়ে মাঝরাতে শুরু হলো যাত্রা। মা আর মেঝ মামা গিয়েছিলেন তৎকালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে আমাকে এগিয়ে দিতে। অনভিজ্ঞতার দরুণ কাঁধের ব্যাগকে বই ঠেসে ভারী করে তুলি। এটাই ছিলো কুড়ি কেজি ওজনের। চল্লিশ কেজি ওজনের মূল স্যুটকেসটাকে বেলিতে দিয়ে কাঁধেরটাকে রাখলাম ওভারহেড বিনে। ওখানে ব্যাগটাকে ঢোকানোর বেশ কসরত করতে হয়েছে তখন। না পেলাম জানালার দিকের সিট না পেলাম করিডরে। সিট হলো মাঝখানে। উড়ে চলি বলাকার পিঠে। মাঝে মাঝে উঁকি দেই জানালার কাচে। কিন্তু মাঝরাতের আঁধার আর নিচের মৃত্তিকায় কৃত্রিম আলোকের ঝর্ণাধারায় চোখে রিমিঝিমি ছাড়া আর কোনো মনকাড়া দৃশ্য নজরে আসে না। বিমানবালিকারা সব উজবেক নারী। দীর্ঘাঙ্গী এবং সফেদ। মুখে পরিষ্কার ইংরেজি নেই, আছে রুশ-ইংরেজির মিশেল। তাদের দেওয়া আহারে টম্যাটো সসের ছড়াছড়ি। এটা পানীয় হিসেবেই পরিবেশিত হলো বলে মনে হয়। গ্রিসমুখী কতিপয় বাঙালি যাত্রী বিমানবালিকাদের বাহুলগ্ন হতে চেয়ে মুখের ঝামটায় সামলে নিয়েছে নিজেদের। মনে মনে ছবি আঁকি রাশিয়ার আর প্রতীক্ষায় থাকি, কখন কাঙ্ক্ষিত মাটিতে পা পড়বে বড় কোনো যাত্রার শুভলগ্ন হয়ে। ভোর না ফোটার আগে আগে উড়োজাহাজ তুষারের পেট চিরে নেমে গেলো উজবেক এয়ারপোর্টের বক্ষ বিদীর্ণ করে। বিমান বন্দরের লাউঞ্জে বসে আছি কখন ডাক পড়ে পরবর্তী যাত্রার। চোখ এড়ালো না, সেই লাউঞ্জের ভেতরেই উজবেক নিশিকন্যাদের আনাগোনা। দেখে বুঝলাম, তাদেরও অর্থনৈতিক রাত্রি জাগরণ ঘটেছে এবং সফল বাণিজ্য শেষে তারা তখন গৃহ অভিমুখী। কিছুক্ষণ সময় পাওয়া গেলো লাউঞ্জের আশেপাশে হেঁটে দেখার। কী আর দেখবো! যেদিকেই তাকাই, পৃথিবীর শুধু একটাই রং। সাদা আর সাদা। তুষার সাদা, বৃক্ষ সাদা, রাস্তার পিচও সাদা, তুষারের চাদরে ঢাকা। চোখের পলকে মনে পড়ে গেলো ওমর খৈয়ামের কথা, যিনি প্রেয়সী নারীর মুখের তিলের জন্যে সমরখন্দ আর বুখারা বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। পারস্যের খোরাসানের ছেলে ওমর খৈয়াম শিক্ষকতার কাজে কিছুদিন উজবেকিস্তানের শহর সমরখন্দ ও বুখারায় ছিলেন। ঘন্টা দুয়েক পরে আমাদের ডাক এলো পুনঃ উড্ডয়নের। বড় বাসে চেপে বসে রানওয়েতে গিয়ে উঠে বসলাম আরেক যান্ত্রিক বলাকায়। উড়োজাহাজে উড়লেই কবিগুরুর এ কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম অবধারিতভাবেই মনে পড়ে যায়। প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা উড়ে উজবেকের বিমানে চড়ে নামলাম লেনিনের দেশে। মূল শহর থেকে অনেক দূরে বিমান বন্দর। মস্কো শহরের উপপ্রান্তে চারটা বিমান বন্দর আছে। তার মধ্যে ডোমোদেদোভো লোমোনোস্কভ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরটি মস্কো শহর থেকে প্রায় বিয়াল্লিশ কিলোমিটার বা উনত্রিশ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাস ঠিক সময়ে আনতে গিয়েছিলো আমাকে। বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখালাম। লক্ষণীয় যে, তাদের বিমানবন্দর থেকে শুরু করে সব অফিস-আদালতে কেবল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আর নিরাপত্তারক্ষীই শুধু পুরুষ। বাকিরা সবাই নারী। সম্ভবত রাশিয়া পুরুষখরায় তখনও ভুগছিলো। কারণ তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত পুরুষের সংখ্যা কম নয়। ফলে অফিস-আদালতে কাজ করার মতো পুরুষের সংখ্যা কম ছিলো। তাদের জীবিত পুরুষদের অধিকাংশই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। আরও একটা বিষয় লক্ষ করার মতো। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়োজিত কর্মীদের মুখের ভাষা ছিলো রুশ। তারা বিদেশী যাত্রীদের সাথে ভুলেও এক অক্ষর ইংরেজি বলেনি। অথচ আমি নিশ্চিত ছিলাম ওরা ইংরেজি জানতো। তারা জানে, তাদের রুশ ভাষা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ভাষা। তারা নিজেদের গৌরব বিসর্জন দিয়ে ইংরেজিতে কথা বলতে অনীহ ছিলো। তাদের এই ভাষাপ্রেম, তাদের এই আত্মঅহংবোধের দ্রোহ আমাকে মুগ্ধ করেছিলো। এ অহংবোধ ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, এ অহংবোধ জাতিগত, এ অহংবোধ পৃথিবীর নেতৃত্বশীল চেতনা বিনির্মাণের অভিপ্রায়। আমাকে যতটা প্রশ্ন করা হলো ইমিগ্রেশনে তার সবটাই ছিলো রুশ ভাষায়। আমি তখন রুশ ভাষায় বকলম এবং দীর্ঘদিন পরে অনভ্যাসে এখনও বকলম। পরে কোনো তথ্য আদায় করতে না পেরে আমাকে একদিকে বসিয়ে রাখা হলো। কিছুক্ষণ পরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস নিয়ে লিয়াজোঁ অফিসার আসলে তারপর আমার অনুমতি মেলে। আমি বের হওয়ার আগেই আমার লাগেজ চলমান বেল্টের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত। দেখলাম কয়েকটা ব্যাগ পড়েও গেছে গতিজড়তায়। কিন্তু ইতর কাউকে দেখলাম না এ ব্যাগগুলো ঘাঁটতে বা নিজের বলে চালিয়ে দিয়ে নিয়ে যেতে। বিমানবন্দরে ঢুকেই আমার শিক্ষা শুরু হয়ে গেলো। বুঝলাম কেন সভ্য দেশগুলো সভ্য। তাদের দেশপ্রেম যেমন অপ্রতিরোধ্য তেমনি তাদের সাধারণ মানুষের সততাও অপ্রতিম। সবচেয়ে বড়ো শিক্ষাটা হলো তাদের শ্রমশীলতা। শ্রমে তাদের না নেই। তারা হেসে হেসে যতটুকু হাঁটে আমার মনে হয় ঐ দূরত্বে আমাদের এখানে ঘটা করে ম্যারাথন প্রতিযোগিতা হয়। গাড়িতে চড়ে প্রায় ঘন্টাখানেক পরে আমরা পৌঁছালাম আমাদের হোস্টেলে। পথে আসতে আসতে লিয়াজোঁ অফিসারের মুখে শুনলাম রাশিয়ার ইতিহাস। ঊনিশশো আঠারো সাল অব্দি তারা ছিলো রাশিয়ান সাম্রাজ্যের অংশ। পরে ঊনিশশো আঠারো সালে ফিনল্যান্ড স্বাধীন হয়ে যায় রুশ সাম্রাজ্য থেকে। তখন গঠিত হয় রুশ ফেডারেশন যার নাম হয় ইউএসএসআর। অর্থাৎ ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট সোভিয়েত রাশিয়া। প্রায় দু কোটি চব্বিশ লক্ষ দুহাজার দুশো বর্গমাইলের ওপরে তার আয়তন। তিনশো বছরের পুরোনো জারতন্ত্রের হাত থেকে ঊনিশশো সতের সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ সাম্রাজ্যের মুক্তি ঘটে এবং ঊনিশশো সতের সালের অক্টোবরে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সূচনা হয়। লেনিনের নেতৃত্বে পেট্রোগ্রাদে রক্তপাতহীন যে বিপ্লব হয়, পৃথিবী তাকেই রুশ বিপ্লব নামে জানে। সত্যিকার অর্থে ইউএসএসআরের যাত্রা শুরু হয় ঊনিশশো বাইশ সাল থেকে। সেই থেকে ঊনিশশো একানব্বইয়ের ডিসেম্বর অব্দি সোভিয়েত ইউনিয়নের একাত্মতা বজায় থাকে। কিন্তু মিখাইল গর্বাচেভের নেতৃত্বে গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকা কর্মসূচির কারণে দারিদ্র্যমুক্তির লক্ষ্যে রুশ ফেডারেশন ভেঙে যায়৷ ঊনিশশো একানব্বই সালের ডিসেম্বরের শুরুতে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুশের নেতারা বেলোভেশঝা চুক্তির মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির ঘোষণা দেন। সে সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বরিশ ইয়েৎসিন। সেভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়াসহ মোট পনেরটি দেশের জন্ম হয় যার মধ্যে বেলারুশ, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, উজবেকিস্তান, ইউক্রেন, জর্জিয়া উল্লেখযোগ্য।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্যে মস্কোতে যাই তার নাম রুসেস্কি ইনভারসিটেট দ্রগবা নারোদভ যা ইংরেজিতে পিপলস্ ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, রাশিয়া। একে বাংলায় বলা হয় রাশিয়া গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়। ঊনিশশো ষাট সালের পাঁচ ফেব্রুয়ারি এটি এই নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ঊনিশশো একষট্টি সালের বাইশে ফেব্রুয়ারি এটি কঙ্গোর বিপ্লবী প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও সাহিত্যিক পেত্রিস লুমুম্বার নামে নামকরণ করা হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো মূলত এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার শিক্ষার্থীদের জন্যে। আমি যখন যাই তখন এতে প্রায় তের হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলো। মিখলুকু মাখলায়া স্ট্রিটের ছয়-সাত নম্বর সড়কে আমাদের হোস্টেল বা ডর্মিটরি। এরকম চৌদ্দটা ভবন ছিলো ডর্মিটরি হিসেবে যাতে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টরা থাকতো। ডর্মিটরিগুলোকে দেখলেই বুঝা যায়, এগুলো এক একটা পার্ট আলাদা আলাদা বানিয়ে তারপর এক জায়গায় করে জোড়া লাগানো হয়েছে। রাশিয়ার অধিকাংশ সুউচ্চ ভবন এভাবেই নির্মিত। তারা অ্যাপার্টমেন্টকে নিজেদের ভাষায় বলে কাভার্তিরা। এগুলো ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে কৌশলে বানানো। আমাদের ডর্মিটরিগুলো সবুজ বৃক্ষ শোভিত হলেও আমি যখন যাই তখন ছিলো ঘোরতর শীত। ফলে তুষারের গার্মেন্ট গায়ে দিয়ে তরুকূল প্রতিকূলতায় দাঁড়িয়ে থাকতো দিনমান। যেন তারা তুষারের সৌধচূড়া। ডর্মিটরির যিনি সুপার বা তত্ত্বাবধায়ক তাকে বলা হতো আনাতোলি। প্রথম প্রথম মনে করেছিলাম এটা তার নাম। আসলে তা নয়। এটা তার পদের নাম। আমাদের আনাতোলির বয়স ষাটের ওপরেই ছিলো। তার মাথার কেশদাম কাঁধ অব্দি আনত ছিলো। তাই তিনি পনিটেল-এর মতো ঝুঁটি বাঁধতেন। আমাদের ডর্মিটরিতে আনাতোলি আসতেন প্রায় দিনই সন্ধ্যায়। এসে যার যার টাকাপয়সা লেনদেন বাকি ছিলো তাদের ডাকাতো। দেখে মনে হতো অর্থ আদায় করাই তার মুখ্য বিষয় ছিলো। কেউ কেউ হোস্টেল চার্জ দিতে দেরি করলে আনাতোলি ভয় লাগাতো, ব্যাগসহ বাইরে তুষারে রাত কাটাতে বাধ্য করার। তার গায়ে থাকতো কালো স্যুট আর সাদা শার্ট। সাদা রঙের প্রতি অধিকাংশ রুশদের পক্ষপাত আছে। তারা হাল্কা নীল জিনসের সাথে যেমন সাদা শার্ট বা স্কার্টের সাথে সাদা টপস্ গায়ে চাপাতো, তেমনি কালো স্যুট বা নৌ-নীল স্যুটের সাথে সাদা শার্ট গায়ে দিতো। পোশাকের এ শিষ্টতা চোখে এক ধরনের শান্তি দিতো। রুমের ভেতরে কোনো ফায়ার প্লেস ছিলো না। ঘোরতর শীতকালে লোহার বড় পাইপের ভেতর দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে রাখা গরম চুল্লি হতে গরম জলের প্রবাহ চালু রাখা হতো অবিরাম। এতে প্রবহমান উষ্ণ জল তাপ হারাতো রুমের ভেতর। সেই তাপে শীতকে মোকাবেলা করতো ডর্মিটরির অন্তেবাসীরা। কাচঘেরা জানালা দিয়ে বাইরে তুষারপাতের মনোরম দৃশ্য দেখা যেতো। প্রথম কয়েকদিন তুষার পতন দেখে রোমাঞ্চিত ছিলাম। পরে ধীরে ধীরে চোখে একঘেঁয়েমি তৈরি হয়। মনে হতো এ যেন এক শৃঙ্খল, আমার ও আমাদের স্বাধীনতার। যখন-তখন চাইলেই বের হওয়া যেত না এই তুষারশীতল আবহাওয়ার জন্যে।ডর্মিটরির কাচের দরোজা ঠেলে দু কদম বাইরে যেতে হলে প্রতিজন শিক্ষার্থীকে যেন নভোচারী হতে হয় পোশাকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়। টাইটস দিয়ে শুরু হতো স্তরবিন্যাস আর শেষ হতো পুরু ওভারকোট, উলের মাংকিটুপি এবং হাতের দস্তানা ও পায়ে বরফবৈরি জুতোর সমাহারে। অন্যভস্ত দেহে এতো ওজন টেনে কয়েক কদম গেলেই ক্ষুধার ইঁদুর ছুটতো ফাঁকা পাকস্থলিতে। যেদিন একটু ঠাণ্ডা হাওয়া বইতো সেদিন দাঁত কপাটি লেগে যেতো কাঁপতে কাঁপতে। আর বুকের খাঁচার দুই অংশ একত্রিত হয়ে যেন ভেঙে ফেলতো বার্লিন দেওয়ালের মতো স্টার্নাম। ভূমিকম্প মাটি টের পেতো না, টের পেতো আমার দুহাঁটু আর দু কনুইয়ের গিঁটগুলো। রেঁধে খেতে হতো গণপাকশালায়। চারটা চারটা করে স্লটে মোট বারোটা কি ষোলোটা বিদ্যুতের চুলা ছিলো। তাতেই রাঁধতে হতো নিজেদের খাবার। কাপড় কাঁচার জন্যে ছিলো ওয়াশিং মেশিন। কয়েন ঢোকালেই মেশিন চলতো। লন্ড্রীরুমের পরিসর ছিলো মোটামুটি। রান্নাঘরে মাছির দৌরাত্ম্য থেকে বাঁচতে ছাদ থেকে ঝুলানো ছিলো আঠালো টেপ। এতে মাছিরা আটকে আজীবন এবং মৃত্যুত্তোর যেন ফাঁসিতে লটকাতো। কত দিনের পর দিনে যেতো! কেউ তাদের খোঁজ রাখতো না। গণপাকশালা মৌ মৌ করতো এশিয়ান, আফ্রিকান আর দক্ষিণ আমেরিকান নানা ক্যুইজিনে। ডর্মিটরির স্নানঘর ছিলো গণ। ছেলেদের আলাদা, মেয়েদের আলাদা। টয়লেটগুলোর নিচের অংশে কোনো আবরক বা ঢাকনা ছিলো না। কাচের দরোজাগুলো পায়ের থোড় থেকে মাথা অব্দি কাভার করতো। শৌচ কর্মের জন্যে কোনো জল ব্যবস্থাপনা ছিলো না। দক্ষিণ এশিয়ানরা কোকাকোলার খালি বোতলে ভরে জল নিতো। আর বাকিরা টিস্যু দিয়ে নিজেদের পরিষ্কার করতো। অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন স্নান করতো না। তারা হয়তো সপ্তাহে তিন-চারদিন স্নানাগারে তসরিফ আনতো। বাকি দিনগুলো গায়ে কড়া পার্ফিউম দিয়েই চালিয়ে দিতো। অধিকাংশের খাবার তালিকায় ছিলো ফাস্টফুড বা জাংকফুড। হায়দ্রাবাদের ইমরান প্রায়দিনই বিরিয়ানি খেতো। দক্ষিণ ভারতের শিক্ষার্থীরা খেতো মিষ্টি বেশি। আমরা খেতাম ঝাল তরকারি। ওখানকার আলুগুলো পাথরপ্রতিমা যেন। অনেকক্ষণ সেদ্ধ করার পরেও ভয়ে ভয়ে থাকা লাগে, পাথর দয়া করে গললো কি না। তাদের কলার রং পাকা হলুদ কিন্তু হিমাগারে প্রতিপালিত হওয়ার কারণে শক্ত সবল। তাকে নরম করে আহার করতে গেলে আরও শক্তির অপচয় হতো। একটা কলা ছিলো পঁয়ত্রিশ রুবলের বিনিময়ে। তখন এক রুবলে দুটাকা লাগতো বাংলাদেশের। আমাদের ডর্মিটরির বাঙালি শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে বাজারে যেতাম। একবার মহা উৎসাহে নিয়ে এলাম টিনজাত ফরাস সিমের বিচি, যাকে আজকালকার ছেলেমেয়েরা বলে কিডনি বিন কিংবা আরেকটু ঝলমলে মানুষেরা বলে রাজমা। আমাদের চাটগেঁয়েরা বলি খাইস্যা। টিনজাত খাইস্যাকে গলাতে যে তাপের দরকার হয়েছিলো সেই তাপ দিয়ে আমাদের দেশে পাথর গলে জল হতো নির্ঘাৎ। তাদের দেশে সাদা রুটির মতো খাবার পাওয়া যেতো যাকে বলা হতো বুলকা। বাজারগুলোতে সত্তরোর্ধ্ব নারীকে দেখেছি একটা মাত্র মাছ নিয়ে তীর্থের কাক হয়ে বসে আছে ক্রেতার আশায় ঠাণ্ডা হাড় কাঁপানো হাওয়াকে উপেক্ষা করে। আমি নিশ্চিত, এ বয়সী নারী আমাদের দেশে খেটে খায় না, তারা মরণের প্রতীক্ষায় ঘরের এককোণে পড়ে থেকে দয়াদাক্ষিণ্যে দিন গোণে। বাঙালি যেখানেই যায় সেখানেই ঢেঁকি হয়ে যায়। আমাদের ইউনিভার্সিটি এবং ডর্মিটরিতেও তাই। সেখানে রাজনীতি আর দলাদলি নিয়ে বেশ শক্তির অপচয় করতে দেখেছি। পাশাপাশি একদলকে দেখেছি, উচ্চাভিলাষী লোকেদের লোভ দেখিয়ে ইউরোপের অন্য দেশ বিশেষ করে ইতালি-অস্ট্রিয়ায় পাচারের কূটকৌশল প্রয়োগ করে বড়ো অঙ্কের বাংলা টাকা হাতানোর ধান্ধায় ছোঁক ছোঁক করতে।

একদিন বিরাম দিয়ে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে। ডর্মিটরি হতে সকাল দশটা নাগাদ মেডিকেল সেন্টারে গিয়েই দিতে হলো নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন। যে স্বাস্থ্যকর্মী ভ্যাক্সিন দিলেন বাম বাহুর ঊর্ধ্ব অংশের বাইরের দিকে, তিনি বার বার হাত নেড়ে ব্যায়াম করার ওপর জোর দিচ্ছিলেন, যাতে ব্যথা কম লাগে। ভ্যাক্সিন নেওয়ার দুদিন পর থেকেই শুরু হলো রুশ ভাষা শিক্ষণের ক্লাস। আমরা পোস্ট গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট এবং মেডিকেল সায়েন্সের স্টুডেন্ট বিধায় আমাদের পরবর্তী কোর্স হওয়ার কথা ছিলো ইংরেজিতে। কিন্তু কমিউনিকেশন স্কিল বাড়ানোর জন্যে সবার সাথে আমাদেরও রুশ ভাষা শিক্ষণের ক্লাস করতে হলো। মি. ইভানভ ছিলেন আমাদের রুশ ভাষার শিক্ষক যিনি বেশ ভালোই আমাদের হাতেকলমে ভাষা শিক্ষার কাজটি চালিয়ে গেছেন। রাশিয়া যাত্রার প্রাক্কালে নীলক্ষেত থেকেই আমি রুশ ভাষা শেখার একটা বই জোগাড় করেছিলাম। ফলে কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলাম ভাষার বর্ণমালা শেখা ও লেখায়। ক্লাসে তা বেশ ভালোই কাজে দিলো। ক্লাস করতে করতে জানলাম, পুংলিঙ্গ নভ হলে স্ত্রীলিঙ্গ নোভা। যেমন : ইভানভ থেকে ইভানোভা। শারাপভ থেকে শারাপোভা। তৃতীয় পুরুষের সর্বনাম পুংলিঙ্গে অন। আর স্ত্রীলিঙ্গে আনা। যদি বলা হয়, আনা দোমা; তার মানে তিনি ( নারী) বাড়িতে আছেন। দোমা মানে এট হোম। তাতিয়ানা বলতে সুন্দরী বুঝায়। যেমন : আনা তাতিয়ানা। তিনি সুন্দরী। যদি বলা হয় ‘ আনা বালশই তাতিয়ানা’; তার মানে হলো তিনি অতিশয় সুন্দরী। বালশই মানে বড়ো বা অধিক। এর বিপরীত শব্দ হলো মালিঙ্কী। মালিঙ্কী মানে হলো ছোট বা ক্ষুদ্র। যদি বলে ‘আনা বালশই নিয়েৎ’; তার মানে হলো তিনি ( নারী) বড়ো নন। নিয়েৎ মানে না। শ্তো এতা? এ প্রশ্নে বুঝতে হয়, হোয়াট ইজ দিস্? এতা ভাদা। মানে হলো দিস্ ইজ ওয়াটার। এভাবেই চললো আমার ভাষা শিক্ষণ। মাঝে মাঝে বোর্ডে ডাক পড়ে। জয়নিং হাতের লেখা শেখা থাকায় বোর্ডে গিয়ে রুশ বর্ণমালা লেখা সহজ হয়ে যায়। ‘পাই’- এর মতো করে লিখতে হয় বড়ো হাতের এল। ইংরেজি বড়ো হাতের এইচ দিয়ে বুঝায় রুশ ভাষার এন। ইংরেজি বড়ো হাতের উল্টা এন দিয়ে রুশ ভাষার আইকে বুঝায়। ভাষা শিখতে শিখতে একসময় রুশ ভাষার সাথে প্রেম হয়ে গেলো। সারাক্ষণ আওড়াতে থাকি আদিন, দবা, থিরি, চিতিরি, প্যাৎ, সেস্ত, শেম, ভোসিম, দেভিৎ, দেসিৎ ইত্যাদি। অর্থাৎ এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়,দশ ইত্যাদি। ক্যাম্পাসকে ওরা বলে ক্রেস্ত। চল ক্যাম্পাসে যাই মানে হলো চল ক্রেস্তে যাই। ক্রেস্তে গিয়ে ক্যাফিটেরিয়ায় ঢুকলাম একবার। দুচামচ ভাত, দুটুকরো পরোটা, ডিম ভাজি, মিক্সড সব্জি আর রাশান সালাদ নিলাম। খেতে খেতে মনে পড়ে যায় দেশের পুঁই শাকের চচ্চড়ি আর লইট্যা মাছের ঝোলের কথা। মনটা উদাস হয়ে যায়। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়