সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৯

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হোক ডিজিটাল বৈষম্য নিরসন

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হোক ডিজিটাল বৈষম্য নিরসন

দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের পথে প্রযুক্তি আজ এক অবিচ্ছেদ্য শক্তি। কৃষি থেকে শিল্প, শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, প্রশাসন থেকে ব্যবসা প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ডিজিটাল লেনদেন, অনলাইন শিক্ষা, ই-গভর্নেন্স, স্মার্ট কৃষি ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা কার্যক্রম অর্থনীতিকে গতিশীল করছে। তবে এই অগ্রগতির মাঝেও একটি বড় বাস্তবতা হলো গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিদ্যমান ডিজিটাল বৈষম্য। শহরাঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট, আধুনিক ডিভাইস, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সহজলভ্য হলেও গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক মানুষ এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

ফলে দেশের একটি অংশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, আর অন্য অংশ পিছিয়ে পড়ছে। এই বৈষম্য শুধু সামাজিক অসাম্যই সৃষ্টি করছে না। বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকেও বাধাগ্রস্ত করছে। তাই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত গ্রাম-শহরের ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রতিটি নাগরিক প্রযুক্তির সুফল ভোগ করতে পারবে এবং জাতীয় অর্থনীতি হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী। ডিজিটাল বৈষম্যের মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, আর্থিক অক্ষমতা, শিক্ষার অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

শহরে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক, ফোরজি ও ফাইভজি সেবা, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও আইটি পার্ক থাকলেও গ্রামে অনেক সময় নির্ভর করতে হয় দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক বা সীমিত ইন্টারনেট সংযোগের ওপর। অনেক পরিবার স্মার্টফোন বা কম্পিউটার কিনতে সক্ষম নয়, আবার যারা কিনতে পারে, তারা অনেক সময় প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষিত নয়। এর ফলে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও আন্তর্জাতিক জ্ঞানভান্ডার থেকে বঞ্চিত হয়।

ডিজিটাল বৈষম্য নিরসনে কৃষক সমাজের জীবন, উৎপাদন ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক অবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। প্রথমত, তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা কৃষকদের জন্য কৃষি বিষয়ক জ্ঞান ও পরামর্শের দরজা খুলে দেবে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে তারা আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ফসলের রোগবালাই সংক্রান্ত সতর্কতা, উন্নত বীজ ও সার ব্যবহারের কৌশল, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং মাটির গুণাগুণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পেতে পারবে। এতে করে তারা সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, যা ফসলের ক্ষতি কমাবে এবং উৎপাদন বাড়াবে।

একই সঙ্গে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কৃষি প্রশিক্ষণ ভিডিও, অনলাইন সেমিনার এবং ভার্চুয়াল কৃষি ক্লাসের মাধ্যমে তারা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। ফলে প্রথাগত চাষাবাদের সীমা পেরিয়ে তারা আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই কৃষির পথে এগিয়ে যেতে পারবে। ডিজিটাল বৈষম্য কমলে কৃষকরা সরকারি ভর্তুকি, কৃষিঋণ, বীমা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তথ্যও সহজে পাবে, যা তাদের আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে। এভাবে তথ্যের সমান সুযোগ সৃষ্টি হলে কৃষক সমাজ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই পরিকল্পনা করতে পারবে। অত্যাধুনিক ডিভাইস ও যোগাযোগের অভাবে কৃষকরা বাজারদর, উন্নত বীজ ও চাষাবাদ পদ্ধতির তথ্য সময়মতো পায় না।

উদ্যোক্তারা ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং ও অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার সুযোগ নিতে পারে না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে যদি সরকার গ্রামীণ ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়ন, কমমূল্যে ডিভাইস সরবরাহ, ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি ও স্থানীয় প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দেয়, তবে এই বৈষম্য ধীরে ধীরে কমে আসবে। এতে করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও আধুনিক অর্থনীতির অংশীদার হতে পারবে।

দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বৈষম্য নিরসনের ফলে কৃষকদের আর্থিক ও বাজার ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব পড়বে। ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস, অনলাইন কৃষিপণ্য বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে। আগে যেখানে কৃষককে তার পণ্য ন্যায্য দামের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে হতো, এখন সেখানে অনলাইন মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তা বা বড় বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে এবং বাজারে স্বচ্ছতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ফলে লেনদেন হবে দ্রুত, নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।

সামাজিক দিক থেকেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ডিজিটাল সংযোগের মাধ্যমে কৃষক পরিবারের সন্তানরা অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও ভার্চুয়াল ক্লাসে অংশ নিতে পারবে, ফলে তাদের শিক্ষার মান বাড়বে এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগও বিস্তৃত হবে। নারীরাও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ, অনলাইন ব্যবসা এবং তথ্যভিত্তিক সেবায় যুক্ত হয়ে পরিবার ও সমাজে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে। এভাবে ডিজিটাল বৈষম্য নিরসন শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, পুরো গ্রামীণ সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলবে।

একটি সংযুক্ত, তথ্যসমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষক সমাজ গড়ে উঠলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও আরও সহজ হবে। তাই বলা যায়, ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা মানেই কৃষক সমাজকে শক্তিশালী করা, আর কৃষক সমাজকে শক্তিশালী করা মানেই জাতির ভবিষ্যৎকে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করা।

প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন শুধু যোগাযোগের গতি বাড়ায় না। বরং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করে। ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, অনলাইন ব্যবসা ও রিমোট কাজের মাধ্যমে আজ বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে আয় করা সম্ভব। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের তরুণরা প্রায়ই এই সুযোগগুলো থেকে বঞ্চিত থাকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও ইন্টারনেট সুবিধার অভাবে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে যদি প্রতিটি উপজেলায় আইটি ট্রেনিং সেন্টার, স্টার্টআপ ইনকিউবেশন হাব ও ফ্রিল্যান্সিং ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে গ্রামীণ যুবসমাজও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।

এতে শহরমুখী অভিবাসন কমবে, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন পথ তৈরি হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঘরে বসেই হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য বা সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলবে। ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইন কোর্স, ভার্চুয়াল ল্যাব ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাসামগ্রী সহজেই ব্যবহার করতে পারলেও গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা অনেক সময় মৌলিক ইন্টারনেট সুবিধা থেকেও বঞ্চিত।

নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে যদি প্রতিটি বিদ্যালয়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়, তবে শিক্ষার মানের পার্থক্য অনেকটাই কমে আসবে। একইভাবে টেলিমেডিসিন, অনলাইন স্বাস্থ্য পরামর্শ ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী উন্নত চিকিৎসাসেবা পেতে পারে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ শহরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যোগাযোগ করতে পারলে সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হবে। এই উদ্যোগগুলো শুধু মানবিক দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সুস্থ ও দক্ষ জনগোষ্ঠীই উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখে।

দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এখন আর কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ বা শ্রমশক্তির ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে জ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির ওপর। গ্রাম ও শহরের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য থাকলে এই উন্নয়ন কখনোই সম্পূর্ণ ও টেকসই হবে না। তাই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া সময়ের দাবি। অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল শিক্ষা, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সহায়তা ও ই-গভর্নেন্সের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষকে ডিজিটাল অর্থনীতির অংশীদার করা গেলে জাতীয় ঐক্য ও সমৃদ্ধি আরও সুদৃঢ় হবে। একটি এমন বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে, যেখানে গ্রামের একজন কৃষক যেমন প্রযুক্তির সুফল ভোগ করবে, তেমনি শহরের একজন উদ্যোক্তাও। এই সমতা ও অন্তর্ভুক্তিই হবে ভবিষ্যতের উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের ভিত্তি।

লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়