বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৯

দিনাজপুরের সৌন্দর্যে একদিন

পলাশ কুমার দে
দিনাজপুরের সৌন্দর্যে একদিন

জীবন চলার পথে সুস্থ থাকা প্রতিটি মানুষের জন্য জরুরি। সুস্থ থাকার বড় একটি উপায় হলো সময় বের করে ঘুরতে যাওয়া। কোথাও বেরিয়ে এলে শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকে। মন ফুরফুরে রাখার জন্য ভ্রমণ এক মহৌষধ বললেও ভুল হয় না।

তাই তো পৃথিবীর মানুষ বছরের একটি সময় এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরতে যায়। প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করে। সৌন্দর্যকে কাছ থেকে দেখে। সংস্কৃতি ও ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়। ফুল, পাহাড়, সমুদ্র, ফলমূল, পাখির সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অচেনা মানুষও একসময় বন্ধু হয়ে যায়। মনের গভীরে জমে থাকা দুঃখ-কষ্ট ও হাহাকার কিছু সময়ের জন্য দূরে সরে থাকে। বাস্তবতাকে নতুনভাবে জানা ও বোঝা যায়।

গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় চাঁদপুর শহর থেকে এবং বাবুরহাট থেকে আমরা কয়েকজন বাসে উঠে রওনা হই। গন্তব্য ছিল বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের প্রাচীন শহর দিনাজপুর জেলা শহর।

যাওয়ার কথা ছিল নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে। কিন্তু সে সময় দেশের পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় ভ্রমণ এক মাস পিছিয়ে যায়। অবশেষে ১১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নতুন জায়গা দেখার আনন্দ নিয়ে আমরা রওনা হই।

ঝামেলামুক্ত ও নিরাপদভাবে ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার সকাল প্রায় ৯টার দিকে পৌঁছে যাই দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী পার্ক স্বপ্নপুরীতে।

এর আগে মুন্সীগঞ্জের ভবেরচর এলাকায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে একটি খাবারের স্থানে প্রায় এক ঘণ্টা যাত্রাবিরতি হয়। সেখানে রাতের খাবার খাওয়া হয়।

রাত দুইটার দিকে সিরাজগঞ্জ জেলায় পৌঁছে মহাসড়কের পাশে ‘রূপসী বাংলা প্লাস’ নামে একটি স্থানে চা-বিরতি নেওয়া হয়। গভীর শীতের রাতে প্রয়োজনীয় বিরতির পর আমরা আবার বাসে উঠে পড়ি। একতা সার্ভিস বাসটি আমাদের নিয়ে নতুন করে উত্তরবঙ্গের দিকে ছুটে চলে।

দীর্ঘ যাত্রা হলেও বাস সার্ভিসটি ছিল আরামদায়ক। চালক ও স্টাফদের আচরণ ছিল শান্ত ও ভদ্র। পথে কোথাও বিরক্ত হতে হয়নি।

স্বপ্নপুরী পার্কে পৌঁছে দেখি গ্রামীণ অবকাঠামো আর সবুজ পরিবেশে ঘেরা এক অপূর্ব স্থান। পার্কে ঢুকেই গরম গরম পরোটার নাস্তা আমাদের সবাইকে বেশ তৃপ্ত করেছিল।

নাস্তার পর যার যার মতো করে পুরো পার্ক ঘুরে দেখা হয়। সময় যে কখন চলে গেল, টেরই পাইনি। দারুণ সময় কেটেছে সেখানে।

অনেক ভ্রমণপিপাসুকে দেখলাম আচার ও প্রসাধনী কিনছেন। আমিও বাদ থাকিনি। আমার সঙ্গে থাকা ছোট ভাই সঞ্জীব দে দুই ধরনের আচার কিনলেন। খেতে খুবই সুস্বাদু লেগেছে। পার্কের এক পাশে সারি সারি আচারের দোকান ছিল।

দোকানদারদের ব্যবহার ছিল সন্তোষজনক। একটি বিষয় বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। আমরা চাঁদপুর থেকে এসেছি শুনে তারা আচারের দাম তুলনামূলক কম রাখেন। যে দোকান থেকে আমরা আচার কিনি, সেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনই ছিলেন। কথার এক পর্যায়ে তারা সঞ্জীব দেকে বললেন, আপনাকে আমাদের আত্মীয় জামাইয়ের মতো লাগছে। আমি মজা করে বললাম, তাহলে আত্মীয় জামাই ভেবে একটু বেশি আচার দিন। এরপর তারা তিন ধরনের আচার খাওয়ান।

কথাবার্তায় চাঁদপুরের ইলিশ মাছ নিয়ে তাদের বেশ কৌতূহল ছিল। আমি বললাম, আপনারা যদি চাঁদপুর আসেন, ইলিশ খাওয়াব। তারা হেসে বললেন, আমাদের কি আর চাঁদপুর যাওয়া হবে!

স্বপ্নপুরী পার্কে ঘুরে ছবি ও ভিডিও ধারণ করি। পার্কের ভেতরে একটি সুন্দর স্থাপত্যশৈলীর মসজিদ রয়েছে, যা সত্যিই দৃষ্টিনন্দন।

প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পার্কে সময় কাটিয়ে আমরা বাসে উঠে দিনাজপুর শহরের জমিদারবাড়ির উদ্দেশে রওনা হই। প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দুপুর আড়াইটার দিকে সেখানে পৌঁছাই।

পথে বাসের জানালা দিয়ে সারি সারি লিচুবাগান দেখি। বিস্তীর্ণ ধানের জমি, কাটা ধানক্ষেত, গবাদিপশু আর দূরের বসতবাড়ি চোখ জুড়িয়ে দেয়।

শহরের দিকে যেতে যেতে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিকেএসপি প্রশিক্ষণ মাঠ, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসহ নানা সরকারি প্রতিষ্ঠান চোখে পড়ে।

জমিদারবাড়ির প্রবেশপথের প্রাচীন গেটটি খুবই আকর্ষণীয়। দুর্ভাগ্যবশত সময়মতো না পৌঁছানোর কারণে শ্রী শ্রী কালীমন্দির বন্ধ ছিল। ভেতরের দর্শন না পেলেও বাইরের কারুকাজ অসাধারণ লেগেছে।

এরপর ভেতরের গেট পেরিয়ে শ্রী শ্রী দুর্গামন্দিরের সামনে যাই। চারপাশের শৈল্পিক নকশা ও পরিবেশ মন ছুঁয়ে যায়।

জমিদারবাড়িতে কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীকে কালাই ও মুগ ডালের পাপড় বিক্রি করতে দেখি। এ সময় বাবুরহাট থেকে প্রদীপ দা ফোন করে পাপড় কিনে আনতে বলেন। আমরা সবাই পাপড় কিনি।

সেখানে প্রভাস কর্মকার নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, এই জমিদারের নাম ছিল জগদীশচন্দ্র রায় বাহাদুর। দুর্গামন্দিরটি প্রায় তিন থেকে চারশ বছর পুরোনো। বর্তমানে পুরো রাজবাড়িটি সরকারিভাবে দেখভাল করা হচ্ছে।

এরপর আমরা বাসে উঠে কান্তজিউ মন্দিরের উদ্দেশে রওনা হই। রাজবাড়ি থেকে প্রায় ৩০ মিনিটে সেখানে পৌঁছাই। বিকেল চারটা তখন।

বিশাল এলাকা জুড়ে কান্তজিউ মন্দির। কাছ থেকে স্থাপত্য দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে যাই। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত সেখানেই সময় কাটাই। বাংলাদেশ পাসপোর্ট ও ২০ টাকার নোটে দেখা মন্দিরটি সামনে দেখে অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

মন্দির চত্বরে প্রতিদিন নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের ভিড় থাকে। সেখানে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প ও ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন ছিল।

দিনাজপুর যাওয়ার ইচ্ছা আমার বহুদিনের। তাই দিনাজপুরের বাসিন্দা বাবুরহাটে কর্মরত তারেক ভাই ও শামীম ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডায় সে কথা বলতাম। হঠাৎ ব্যবসায়ী রতন চক্রবর্তী দাদা দিনাজপুর ভ্রমণের প্রস্তাব দেন। সুযোগ হাতছাড়া করিনি।

১২ ডিসেম্বর রাত ৮টায় আমরা চাঁদপুরের পথে ফিরি। পথে বগুড়ার সাতমাথায় নেমে ছবি তুলি ও বিখ্যাত দই খাই। পরে সিরাজগঞ্জে রাতের খাবার শেষে ভোরের দিকে চাঁদপুর পৌঁছাই।

এই ভ্রমণে যাদের অবদান, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে নন্দ গোপাল সাহা দাদা, যিনি দিনাজপুরে আমাদের গাইড ছিলেন এবং আপ্যায়ন করেছিলেন। এছাড়া চাঁদপুরের যারা উদ্যোক্তা তাদের প্রতিও অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। যাদের নাম না বললেই নয়, তারা হলেনÑরনি, অনুপ, শিপন, তুষার, সুব্রত দত্ত, মিল্টন চক্রবর্তী, লিটন সাহা, পিযুষ কর রবি, সুমন ধর প্রমুখ।

পরিচিত মানুষ থাকলে ভ্রমণের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায়। এ অভিজ্ঞতাও তার প্রমাণ।

সবশেষে বলি, দিনাজপুরের সৌন্দর্য, ইতিহাস আর মানুষের আন্তরিকতা আমার মনে চিরদিনের স্মৃতি হয়ে থাকবে।

পলাশ কুমার দে : সাহিত্য, সংস্কৃতি

ও সংবাদকর্মী, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়