প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০১
তিল্লার ঘর

কখনো কখনো সুখের মুহূর্তগুলো স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে ওঠে আচমকা। বাঙালির নানা উৎসবের একটি অন্যতম উৎসব পৌষ সংক্রান্তি। পৌষ সংক্রান্তি বা মকরসংক্রান্তি একটা ফসলি উৎসব যা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় পালিত হয়। ভারতে পৌষসংক্রান্তি নামেই, বাংলাদেশে এর নাম সাকরাইন, নেপালে এটা পরিচিত মাঘি নামে, থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি-মা-লাও, মায়ানমারে থিং-ইয়ান এবং কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে পরিচিত। বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাবে এটাকে আবার বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। সিলেট অঞ্চলে পৌষ সংক্রান্তি তিল্লা সংক্রান্তি নামেও অভিহিত। তিল্লা, কদমা আর বাতাসা পৌষ সংক্রান্তির অন্যতম অনুষঙ্গ। গ্রামে গ্রামে কীর্তন যায় বাড়িতে বাড়িতে। তখন তিল্লা, বাতাসা লুট দেয়া হয় হরির নামে। তবে সব ছাপিয়ে অনিমেষের স্মৃতিতে দারুণভাবে দাগ কাটে তিল্লার ঘরের স্মৃতি। তিল্লার ঘরে রাত্রি যাপন আর ভোরবেলা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে স্নান করা এবং স্নান সেরে তিল্লার ঘর পুড়িয়ে আগুন পোহানোর কথা আজকাল খুব মনে পড়ে অনিমেষের। ভাবে আবার যদি সে দিনগুলি ফিরে পাওয়া যেতো তাহলে কি মজাই না হত। অনিমেষের আজ খুব মনে পড়ছে দিগেন্দ্র, প্রশান্ত, ভুট্টো, অনুদের সাথে তিল্লার ঘর বানিয়ে রাত জাগার কথা। তিল্লা সংক্রান্তির আগের দিন বন্ধুরা মিলে চাঁদা তুলে যেতাম মার্কুলি বাজারে (কাদিরগঞ্জ বাজার)। তখন শাসখাই বাজার ছিল না। আশে পাশের এলাকার সবাই মার্কুলি বাজারে যেতো। অনিমেষ ও তার বন্ধুরা মিলে সকালবেলা সে বাজার থেকে সেমাই, মোরগ, বিস্কিট ইত্যাদি কিনে আনত। বিকেলবেলা তিল্লার ঘর বানানোর পালা। আগের দিন ডেটা (ধান কাটার পর ক্ষেতে ধান গাছের থেকে যাওয়া গোড়াসহ অবশিষ্ট অংশ)
কেটে আনত অনিমেষ ও তার বন্ধুরা মিলে। প্রত্যেকের বাড়ি থেকে পুরোনো বাঁশ যোগাড় করত ঘর বানানোর জন্য। অবশ্য মাঝে মাঝে অন্যের বাড়ি থেকে রাতের আঁধারে বাঁশ নিয়ে আসত মানে সোজা বাংলায় চুরি করে বাঁশ যোগাড় করত। তখন চুরি করে হাঁস খাওয়ার একটা একটা প্রচলন ছিল অনেকের মাঝে। অনিমেষ এখন বুঝতে পারে চুরি করে বাঁশ আনা অথবা হাঁস আনা মোটেও ঠিক নয়। বিকেল থেকে শুরু করে রাত নয়টা দশটা পর্যন্ত চলত ঘর বানানো। এর পর সেমাই রান্না করে খাওয়া, চা খাওয়া, মাংস খাওয়া শেষে কেউ ঘুমাত, কেউ জেগে গান শুনত। খুব সকালে উঠে নদীতে গোসল সেরে তিল্লার ঘরে আগুন জ্বালিয়ে আগুন পোহানো হতো। শেষে যে যার বাড়িতে গিয়ে তিল্লা কদমা নাড়ু মুড়ি খাওয়া হতো। সেসব দিনগুলো কতইনা মধুর ছিল। অনিমেষের এখন মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে, আবার যদি এমন করে তিল্লার ঘর বানিয়ে রাত্রিযাপন করতে পারত। কিন্তু সময় বদলে যায়। জীবনের চাওয়া পাওয়া বদলে যায়। সুখের মুহূর্ত গুলো স্মৃতি হয়ে থেকে যায় মনের মণিকোঠায়।








