মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৩

মাতৃহারা শৈশব থেকে কুমিল্লা আদালতের পরিচিত মুখ : সংগ্রাম, সাংবাদিকতা ও আইন পেশায় এক অনন্য পথচলা

পিতার স্বপ্ন পূরণে অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার

পিতার স্বপ্ন পূরণে অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : হাবিবুর রহমান খাঁন

মানুষের জীবনের কিছু গল্প শুধু সাফল্যের নয়; সেগুলো হয়ে ওঠে হারানোর বেদনা, সংগ্রাম এবং স্বপ্নপূরণের অনন্য দলিল। প্রতিকূলতাকে শক্তিতে পরিণত করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার তেমনই এক নাম অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার। শৈশবেই হারিয়েছেন মাকে। মাতৃস্নেহের শূন্যতা নিয়ে বেড়ে উঠেছেন মামা ও দিদিমার স্নেহে। চাঁদপুর থেকে এসএসসি পাসের পর কুমিল্লায় এসে শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়।

> তাঁর বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার ছিলেন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য। তাঁর স্বপ্ন ছিল—ছেলে একদিন আইনজীবী হবে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের ঠিক আগেই, ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি বাবা পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে। বাবার এই অসমাপ্ত স্বপ্নকে নিজের কাঁধে তুলে নেন তাপস। অবশেষে ২০১৬ সালের ১৪ মে বার কাউন্সিলের সনদ অর্জন করেন এবং ৯ জুন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগ দিয়ে আইন পেশা শুরু করেন।

> শৈশবের বেদনা, সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা, আইন পেশা এবং পিতৃস্বপ্ন পূরণের গল্প নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক **হাবিবুর রহমান খাঁন**-এর।

---

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** শুরুতে আপনার জন্ম ও শৈশবের পারিবারিক পরিচয় জানতে চাই।

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** ১৯৮০ সালের ৫ এপ্রিল আমার জন্ম। বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার এবং মা যোগমায়াশ্রী সরকার। খুব ছোটবেলায় মাকে হারাই। তখন হয়তো মাতৃস্নেহের সংজ্ঞা বুঝিনি, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শূন্যতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** মাকে হারানোর পর শৈশব কীভাবে কেটেছে?

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** আমার মামা ও দিদিমা পরম স্নেহে আমাকে বড় করেছেন। তাঁরা শুধু আশ্রয় দেননি; ভালোবাসা, শাসন আর শিক্ষার আলো দিয়ে আগলে রেখেছেন। মায়ের অভাব কেউ পূরণ করতে পারে না, তবে তাঁরা আমাকে কখনো ভালোবাসার কমতি বুঝতে দেননি।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** এই মাতৃহারা শৈশব আপনার ব্যক্তিত্বে কী প্রভাব ফেলেছে?

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** জীবনের শুরুতেই কিছু হারানোর অভিজ্ঞতা আমাকে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে। বুঝতে পেরেছি, কিছু শূন্যতা নিয়েই মানুষকে বাঁচতে হয়। এই বেদনা আমাকে দুর্বল করেনি, বরং মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে ও সহানুভূতিশীল হতে শিখিয়েছে।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** মামাবাড়িতে থেকে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৫ সালে এসএসসি পাস করি। এরপর কুমিল্লায় বাবার কাছে চলে আসি। এখান থেকেই আমার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু। ১৯৯৭ সালে কুমিল্লা অজিত গুহ মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি, ২০০০ সালে নিমসার জুনাব আলী ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক এবং পরবর্তীতে কুমিল্লা আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করি।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** আইন পেশাকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে বাবার অবদান কতটা?

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** আমার বাবা ছিলেন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির জ্যেষ্ঠ সদস্য। আদালত অঙ্গনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের স্মৃতি। তাঁর ইচ্ছা ছিল আমি যেন আইনজীবী হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াই। বাবার সেই স্বপ্নই একসময় আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** আইন পেশায় আসার আগে আপনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** সাংবাদিকতা আমার জীবনের অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি অধ্যায়। স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করার সুবাদে সমাজের নানাবর্গের মানুষের খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। মানুষের বঞ্চনা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের আকুতি সংবাদপত্রেই প্রথম কাছ থেকে দেখি। সাংবাদিকতা আমাকে মানুষের কথা মন দিয়ে শুনতে শিখিয়েছে, যা পরবর্তীতে আইন পেশায় দারুণ কাজে দিয়েছে।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** সাংবাদিকতা ছেড়ে পুরোদস্তুর আইন পেশায় কেন এলেন?

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** সাংবাদিক হিসেবে সমাজের অসংগতি ও অন্যায়ের কথা তুলে ধরা যায়। তবে আইনজীবী হিসেবে নিপীড়িত মানুষের আইনি অধিকার রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ বেশি। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা আর বাবার স্বপ্ন—এ দুটি বিষয়ই আমাকে শেষ পর্যন্ত আইন পেশায় নিয়ে এসেছে।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** কিন্তু আপনার পরমাকাঙ্ক্ষিত সেই সাফল্যের দিনে বাবাকে পাননি...

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** হ্যাঁ, এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আমি সনদ পাওয়ার কিছুদিন আগে, ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি বাবা মারা যান। যে মানুষটি আমাকে কালো গাউনে দেখার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিলেন, তিনি শেষ মুহূর্তে দেখে যেতে পারলেন না।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** বাবার মৃত্যুর পর নিজেকে কীভাবে সামলে নিয়েছিলেন?

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** শোককে শক্তিতে রূপান্তর করা ছাড়া উপায় ছিল না। মনে হয়েছিল, বাবা নেই কিন্তু তাঁর স্বপ্ন তো বেঁচে আছে। ২০১৬ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ পাই এবং ৯ জুন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগ দিই। সনদ হাতে পাওয়ার মুহূর্তে আনন্দ ছিল, কিন্তু বাবাকে পাশে না পাওয়ার কষ্টটাই বেশি ভারী হয়ে উঠেছিল।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** আজ যখন আদালতে দাঁড়ান, বাবাকে কীভাবে স্মরণ করেন?

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** প্রতিবার যখন পেশাগত পোশাক পরে আদালতে দাঁড়ায়, মনে হয় বাবা কোথাও থেকে আমাকে দেখছেন। আমার বিশ্বাস, ওপর থেকে তিনি হয়তো বলছেন—'তুই পেরেছিস।' এই অনুভূতি আমাকে অনেক শক্তি ও শান্তি দেয়।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** আপনার পারিবারিক ও স্থায়ী ঠিকানা সম্পর্কে জানতে চাই।

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** আমাদের পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার লামচরী উকিল বাড়ীতে। আর পেশাগত কারণে দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লা শহরের কালিয়াজুরী এলাকায় পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি। সহধর্মিণী রিতা রাণী মজুমদার, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে আমার সংসার। শৈশবে মা-বাবাকে হারিয়েছি বলেই পরিবারের গুরুত্ব আমার কাছে সবার ওপরে।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** নতুন প্রজন্মের প্রতি আপনার পরামর্শ বা বার্তা কী?

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** জীবনে প্রতিকূলতা আসবেই, তবে কখনো হাল ছাড়া যাবে না। নিজের ওপর বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম আর সততা থাকলে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব। আর মা-বাবার স্বপ্নের প্রতি অনুগত থাকা উচিত; কারণ মা-বাবার দোআই সন্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি।

**হাবিবুর রহমান খাঁন :** শেষ প্রশ্ন, আজ যদি আপনার বাবা সামনে থাকতেন, তবে তাঁকে কী বলতেন?

**অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার :** (সাস্নেহে) শুধু বলতাম—‘বাবা, তুমি আমার চোখে যে স্বপ্নটা এঁকে দিয়েছিলে, আমি তা ভুলিনি। আমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করেছি।’

> অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকারের জীবন কেবল একজন আইনজীবীর পেশাগত সাফল্যের বিবরণ নয়; এটি মাতৃহারা এক শিশুর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প, মামা-দিদিমার অকৃত্রিম ভালোবাসার নিদর্শন এবং পিতৃস্বপ্ন বাস্তবায়নের এক মানবিক দস্তাবেজ। মা-বাবার স্মৃতি আর অসমাপ্ত স্বপ্নকে বুকে ধারণ করেই প্রতিদিন কুমিল্লা আদালতের প্রাঙ্গণে ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়ে চলেছেন অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়