প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:৪৭
ধনাগোদা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গন
হুমকিতে বিষ্ণুপুরের জনপদ, দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি

চাঁদপুর সদর উপজেলার ১নং বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড জুড়ে বয়ে যাওয়া ধনাগোদা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গন এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যে এক দুঃসহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই নদী গিলে খাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনপদের অবকাঠামো। দীর্ঘদিন ধরেই এ ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলেও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম হতাশা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গন নতুন কোনো সমস্যা নয়, বরং যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষকে দুর্ভোগে ফেলে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভাঙ্গনের তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে প্রতিনিয়ত ভূমি ধসের ঘটনা ঘটছে। এতে বহু পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন, কেউবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ঠাঁই নিচ্ছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বারবার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আগুনে পুড়লে ঘরের কিছু অংশ অন্তত থাকে, কিন্তু নদীর ভাঙ্গনে সবকিছু মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে নদীর পাড় ভেঙ্গে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও নদীর স্রোত এতোটাই প্রবল যে, মুহূর্তেই মাটির স্তর ধসে পড়ছে। যে ব্রিজ দিয়ে একসময় শিক্ষার্থীরা কলেজে যাতায়াত করতো, সেটি এখন নদীর মাঝখানে ঝুলে পড়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। যে কোনো সময় এটি সম্পূর্ণভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
শুধু বসতবাড়িই নয়, নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে হুমকির মুখে রয়েছে বেশ ক'টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্থানীয় বাজার, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা । স্থানীয়দের দাবি, অন্তত এক হাজারের বেশি পরিবার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। একইসঙ্গে বিপন্ন হয়ে পড়েছে বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি, যা এলাকার কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্যে মারাত্মক হুমকি।
বিষ্ণুপুর ইউনিয়নেে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুমন পাটওয়ারী বলেন, আমার তিন পুরুষের ভিটা এই নদীতে চলে গেছে। এখন আমরা কোথায় যাবো বুঝতে পারছি না। প্রতিদিন ভয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছি—আজ না কাল আমাদের ঘরটাও নদীতে পড়ে যাবে।
একই এলাকার গৃহবধূ রহিমা বেগম জানান, আমরা রাতে ঘুমাতে পারি না। নদীর শব্দ শুনলেই মনে হয়, এই বুঝি ঘরটা ভেঙ্গে পড়বে। বাচ্চাদের নিয়ে খুব আতঙ্কে থাকি।
স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম মিজি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে। যে কোনো সময় নদী ভাঙ্গনে এটি বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চরমভাবে ব্যাহত হবে।
এদিকে, এলাকাবাসী তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, নির্বাচনের আগে এলাকার উন্নয়ন ও নদী ভাঙ্গন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয়রা মাননীয় সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাদের দাবি, নির্বাচনের পূর্বে তিনি এলাকাবাসীর কাছে ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময় এসেছে।
এলাকাবাসী বলেন, আমরা আমাদের এমপি মহোদয়ের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি—তিনি যেন দ্রুত এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেন। আমরা আর ভাঙ্গনের ভয় নিয়ে বাঁচতে চাই না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, অস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিয়ে এই ভাঙ্গন রোধ করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, অতিরিক্ত স্রোত এবং তীর সংরক্ষণে অবহেলার কারণে এই ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে। তারা দ্রুত জরিপ পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গন এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি একটি মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই মানুষ হারাচ্ছে তাদের শেকড়, স্মৃতি ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। তাই অবিলম্বে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে একটি বৃহৎ জনপদ সম্পূর্ণরূপে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চাঁদপুরের বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের মানুষ আজ এক কঠিন সময় পার করছে। তাদের একমাত্র দাবি—স্থায়ী সমাধান। দ্রুত বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গন রোধ করে এলাকাবাসীকে নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।








